কচি লেবুর পাতার মত নরম সবুজ পাতায় সবুজ আসে কেমন করে

কচি লেবুর পাতার মত নরম সবুজ পাতায় সবুজ আসে কেমন করে

বাংলার নিসর্গ এখন বসনত্ম সমীরণে দোলায়িত৷ গাছের তলায়, উদ্যানে-অরণ্যে এখনও জীর্ণপাতার মর্মর৷ অন্যদিকে, ন্যাড়াবৃৰের ডালেডালে কিশলয়ের উদ্ভাস৷ আমের বোলের ঘ্রাণে পাগল করে মন৷ সি্নগ্ধ ভোরে কিংবা নিদাঘ মধ্যাহ্নে ঘুঘুর ডাকে ব্যাকুল ভাবুক হৃদয়৷ বসনত্মের প্রকৃতি আরো সুন্দর, আরো প্রাণবনত্ম হয়ে উঠবে আর কটা দিন পরে৷ বসনত্মের শেষে, চৈতালি দিনে সবুজ পাতায় ভরে যাবে সব গাছ৷ একটুখানি বৃষ্টির ছোয়া পেলে নতুন পাতার সবুজ হয়ে উঠবে ঘনগভীর৷ সবুজের সমারোহ চোখ জুড়িযে যাবে৷ সবুজের মত এমন চোখ জুড়ানো সি্নগ্ধ যেন আর হয় না৷ সবুজের দিকে তাকালে চোখের তারায় ঝিলমিল করে ওঠে দৃষ্টির আলো৷ বুকের ভেতর বয়ে যায় অনাবিল প্রশানত্মি৷ কচি লেবু পাতার সবুজ দেখে মুগ্ধ কবি জীবনানন্দ দাশ৷ তার সে আনন্দের প্রকাশ এরকম, ‘কচি লেবু পাতার মত নরম সবুজ আলোয়/ পৃথিবী ভরে গিয়েছে এই ভোরের বেলা৷’

প্রকৃতি অরূপ সুন্দর৷ তার এই রূপময়তার সবটা জুড়েই রয়েছে শ্যামলিমা৷ যাকে আমরা সহজ কথায় বলি সবুজ৷ নিসর্গের বুকজুড়ে এত সবুজ কে দেয়? সবুজের আনন্দ বয়ে আনে ঘাস আর গাছের পাতা৷ আমাদের চারপাশে কতরকমের গাছ! আর কত যে বাহারি পাতা! নানা বর্ণের, নানান আকৃতির পত্রপলস্নব আমাদের চৰু শীতল করে৷ বিরামহীনভাবে বিলিয়ে যায় অক্সিজেন৷ কোনো কোনো গাছের পাতা লাল, কোনটি হলুদ৷ কোনো কোনোটি আবার নানা রঙে চিত্রময়৷ সেগুলোকে আমরা বলি পাতাবাহার৷ সোহাগ করে সেসব গাছ এনে টবে কিংবা বাগানে লাগিয়ে আমরা উপভোগ করি সৌন্দর্য৷ তবে বেশিরভাগ গাছের পাতার রং সবুজ৷ সব পাতার সবুজ অবশ্য এক রকম নয়৷ কচি কলাপাতার সবুজ আর কাঠালপত্রের সবুজের মধ্যে তফাত্‍ আছে বেশ৷ গোলাপ পাতার সবুজ যেন একটুখানি সুরমা মাখানো৷ কিন্তু নিমপাতার সবুজ গাঢ়-গভীর৷ আবার দেখুন, বৃৰশাখার কঠিনতা ভেদ করে যখন আমের নতুন পাতা বেরোয়, তখন রংটা থাকে হলদেটে৷ ক্রমান্বয়ে ধারণ করে চকচকে খয়েরি রং৷ তারপর আসত্মে আসত্মে হয়ে ওঠে প্রাণমাতনো সবুজ৷ সেই পাতাটিই ঝরে যাবার আগে আবারও ধারণ করে হলুদ বর্ণ৷ এই হলুদ তার মৃতু্যর পরোয়ানা৷ নতুন পাতার জন্য তাকে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে৷

পাতা কেন সবুজ হয়? কেনইবা হয় হলুদবরণ? আমরা যে বর্ণ দেখতে পাই তা বাইরের৷ বাইরের হলেও এমন নয় যে, পাতার শরীর জুড়ে রং মাখিয়ে দেয়া হয়েছে৷ আসলে এই সবুজটা পাতার অনত্মরের রং৷ পাতার ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোষে কোষে সঞ্চিত রয়েছে সবুজের ভান্ড৷ আর, সেই সবুজের বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে ক্লোরোফিল৷ সূর্যের আলো পড়লে পাতার কোষের ভেতর সুপ্ত সবুজ বা ক্লোরোফিল জেগে ওঠে৷ সে রঙ ছড়িয়ে দেয় তার শরীর জুড়ে৷ অবশ্য এজন্যে সূর্যের আলো ছাড়াও পানি ও বাতাসেরও সাহায্য দরকার পত্রপলস্নবের৷ গাছ পানি গ্রহণ করে শিকড়ের সাহায্যে৷ সেই পানি পাতার বোটা দিয়ে পাতার ভিতরে পৌছে যায় সহজেই৷ আর প্রকৃতির মধ্যে বাতাস তো আছেই অবারিত৷

যেখানে যথেষ্ট সূর্যের আলো পেঁৗছায় না অথবা যেখানে বাতাস নির্মল ও অবারিত নয়, সেখানে গাছ হয় না৷ হলেও পাতার রং হয়ে যায় ফ্যাকাশে, বিবর্ণ৷ কারণ, পাতার কোষে জমে থাকা ক্লোরিফিল কোষেই বন্দী হয়ে থাকে, স্পন্দনহীন৷ একই কারণে ঘাসও সবুজ৷ কচি পাতার রং প্রায়শ সবুজ হয় না৷ এর কারণ আর কিছু নয়৷ বীজ বা বৃৰের ভেতর সে যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন দরকার মত সূর্যরশ্মি এবং বাতাস সে গ্রহণ করতে পারে না৷ ফলে কিশলয় অবস্থায় রংটা তার অতোটা সবুজ হয় না৷ এমনকি তখন ভিন্ন কোনো রং-এর প্রাধান্যও দেখা যেতে পারে৷ ঠিক যেমনটি দেখা যায় আমের কচিপাতার ৰেত্রে৷ আবার পাতার যখন বয়স হয়ে যায়, কোষগুরো যখন শুকিয়ে যায়, তখন ক্লোরিফিলও কমে যায়৷ সূর্যের আলো পড়লেও, বাতাস পাতায় দোলা দিয়ে গেলেও সবুজ জাগে না৷ ফলে পাতা বিবর্ণ হয়ে যায়৷ এমনিতেই বোটা আলগা হয়ে পাতা ঝরে পড়ে৷

প্রশ্ন কিন্তু আরেকটা থেকে গেলো! কোনো কোনো গাছের পাতার রং একেবারেই অন্যরকম কেন হয়? তারও কারণ কিন্তু পাতার ভিতর সুপ্ত রং-এর অজস্রভান্ডার৷ আমরাতো জানি রং অবিমিশ্র নয়৷ এক রং-এর সাথে আরেকটি মিশে অন্য রং তৈয়ার হয়৷ পাতার কোষে সবুজ ছাড়াও জমা থাকে নানা রং-এর উপাদান৷ যেমন জেনথোফিল৷ এ দ্বারা তৈরি হয় হলুদ রং৷ আছে ক্যারোটিন৷ যা থেকে পাওয়া যায় কমলা রং৷ যে গাছের পাতায় জেনথোফিলের আধিক্য এবং ক্লোরিফিলের পরিমাণ কম, সে পাতা হলুদ হয়৷ কখনো কখনো হলুদের মাঝে ফোটা ফোটা সবুজও দেখা যায়৷ একইভাবে ক্যারোটিন বেশি থাকলে পাতার বর্ণ হবে কমলা৷ একই পাতার ভিতরে বহুবর্ণের উপাদান জমা থাকতে পারে৷ আছেও সেরকম৷ সে পাতাগুলো হয় বহুবর্ণের৷ সেগুলো বাহারি পাতা৷ সব পাতাই সুন্দর, মনোহর৷ গাছের একেকটি পাতা আসলে একেকটির রং-এর কারখানা৷ আর সেই রং আমাদের চোখ জুড়ায়, ভরিয়ে দেয় মন৷

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.