দখলবাজি, কমিশনবাজি, ঠিকাদারি সন্ত্রাসের অপর নাম কাদের সিদ্দিকী

106177_1

দখলবাজি, কমিশনবাজি, ঠিকাদারি সন্ত্রাসের অপর নাম কাদের সিদ্দিকী

সাবেক সাংসদ, কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি আবদুল কাদের সিদ্দিকীর (বীরউত্তম) অবৈধ দখলে থাকা ২১ একর সরকারি জমি গত ১৩ মার্চ উদ্ধারের পর বেরিয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে তার একের পর এক জমি দখলের কাহিনী৷ শুধু কাদের সিদ্দিকী নয়, তার অন্য ভাইদের বিরুদ্ধেও টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন স্থানে ভূমি দস্যুতার ও লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে৷ এছাড়া চাঁদাবাজি তথা বলপূর্বক অর্থ আদায় এবং টেন্ডারবাজি তথা ঠিকাদারি সন্ত্রাসের এনত্মার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে৷ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সুত্রে এসব তথ্য জানা গেছে৷ গত ১৩ মার্চ সখীপুর উপজেলার ছিলিমপুর গ্রামে কাদের সিদ্দিকীর দখলে থাকা ২১ একর সরকারি জমির ওপর নির্মিত বাগানবাড়িটি সখীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদুল হকের নেতৃত্বে যৌথবাহিনী উদ্ধার করে৷ দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা ধরে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় জমিটি৷ জমিতে নির্মিত ৪টি টিনের ঘর ভেঙে থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় লোকজন বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে আনন্দ মিছিল করে এবং ভগ্নসত্মূপে লাল নিশান উড়িয়ে দেয়৷ জানা যায়, বিগত জোট সরকারের আমলে ২০০২ সালে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কাদের সিদ্দিকী ৩টি বিশাল পুকুর ও প্রচুর গাছপালাসহ বাড়িটি দখলে নেয়৷ জনৈক সুবল বর্মণের ফেলে যাওয়া পরিত্যক্ত এ বাড়িটি স্থানীয় হায়েত আলী নামে এক ব্যক্তি নিজের বলে দাবি করে ২০০২ সালের আগে পর্যনত্ম রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছিল৷ কাদের সিদ্দিকী হায়েত আলীকে উচ্ছেদ করেই জমিটি দখলে নেন৷ অবশ্য হায়েত আলীর বসবাসেরও বহু আগে সরকার জমিটিকে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করে৷ এটা জানার পরই কাদের সিদ্দিকী জমিটি দখলে নিয়ে নিজের বাগানবাড়ি তৈরি করেন৷ জমিটি দখলের সময় স্থানীয়দের সঙ্গে বিরোধ দেখা দিলে কাদের সিদ্দিকী তা কঠোর হসত্মে দমন করেন৷ ২১ একরের এই জমিটি উদ্ধারের পর এখন স্থানীয়দের দাবি, কাদের সিদ্দিকীর অবৈধ দখলে থাকা সখীপুরের সমসত্ম জমিই উদ্ধার করতে হবে৷

ভূমি দসু্যতা, করফাঁকি
টাঙ্গাইল শহরে পাকিসত্মান আমলের ‘মোক্তার বার’-এর পাকা ভবনসহ পুরো জায়গা দখল করে দ্বিতল আলিশান বাড়ি নির্মাণ করেছেন কাদের সিদ্দিকী৷ সরকার জমিটি বার সমিতিকে লিজ দিয়েছে কিন\’ কোন এখতিয়ার বলে কাদের সিদ্দিকী জমিটি দীর্ঘদিন ধরে দখল করে আছেন, এই প্রশ্নটি স্থানীয়দের মধ্যে সবসময় ঘুরপাক খাচ্ছে৷
এছাড়া কাদের সিদ্দিকী টাঙ্গাইল শহরের শানত্মিকুঞ্জ মোড়ে জাহাঙ্গীর স্মৃতি সেবাশ্রমের নামে বিশাল ভূসম্পত্তি দখল করে তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সোনার বাংলা প্রকৌশল সংস্থা’র অফিস বানিয়েছেন৷
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সখীপুর-ঢাকা রোডের নতুন বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন রাজ্জাক দারোগার কাছ থেকে কাদের সিদ্দিকী সাত সতাংশ জমি কিনেন৷ কিন\’ জমিটি মেইন রোড থেকে একটু ভিতরে হওয়ায় মাঝে অবস্থিত শাহ আলম নামে এক দরিদ্র ব্যবসায়ীর দোকানসহ জায়গাটি কাদের সিদ্দিকী কিনতে চান৷ শাহ আলম তার জায়গাসহ দোকানটি বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানালে কাদের সিদ্দিকী তার দলের স্থানীয় পৌরসভার চেয়ারম্যান ছানোয়ার হোসেনকে দিয়ে রাতের অাঁধারে ঐ দোকান ঘর ভেঙে ফেলেন৷ এর বিরুদ্ধে সখীপুর বাজার বণিক সমিতি বিক্ষোভ মিছিলসহ প্রতিবাদ করে৷ এক পর্যায়ে এলাকার এমপি থাকা অবস্থায়ও তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়৷ শাহ আলম তার জায়গাটি এখনো নিজের দখলে নিতে পারেননি৷
জানা যায়, উপজেলার তক্তারচালার ছামান পাগলার মাজার নির্মাণের উদ্দেশ্যে কাদের সিদ্দিকী স্থানীয় ব্যবসায়ী নবীনের কাছ থেকে ৭ শতাংশ জমি দান হিসেবে গ্রহণ করেন৷ পরে তার কাছ থেকে আরো ৬০ শতাংশ জায়গা বলপূর্বক দখলে নেন কাদের সিদ্দিকী৷ এছাড়া মাজার সংলগ্ন জয়নাল নামের এক ইট ব্যবসায়ীকে চাপ সৃষ্টি করে কাদের সিদ্দিকী দেড় একর জায়গা কিনে নেন, কিন\’ কর ফাঁকি দিয়ে মূল্য কম দেখিয়ে দলিল করেন৷
সখীপুর পৌরসভা এলাকার আলী আসগরের কাছ থেকে ১ একর জমি কেনেন কাদের সিদ্দিকী, কিন\’ কর ফাঁকির জন্য অল্প মূল্যে দলিল করেন৷ উপজেলার কচুয়া গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান জমশের শিকদারের কাছ থেকে পঞ্চাশ শতাংশ জমি কেনেন ঐ একই রকম কর ফাঁকি দিয়ে৷ এছাড়াও তার দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইদ্রিস সিকদারের কাছ থেকে ৫০ শতাংশ, কচুয়া গ্রামের কাণ্ঠু সরকারের কাছ থেকে ১০ শতাংশ জমি তিনি স্থানীয় দামের চেয়ে অনেক কম দাম দেখিয়ে তার স্ত্রীর নামে দলিল করেছেন৷ এছাড়া উপজেলার আন্দি গ্রামের একটি সরকারি খাস পুকুর সরকারি গমের টাকায় সংস্কার করে তার নিজের দখলে নেন৷

টেন্ডারবাজি, ঠিকাদারি সন্ত্রাস
সখীপুর উপজেলায় এডিপির ঠিকাদারির কোনো কাজে স্থানীয় বা বাইরের কোনো ঠিকাদার দরপত্র দাখিল করতে পারেন না৷ কাদের সিদ্দিকী নিজেই তার ‘সোনার বাংলা প্রকৌশলী সংস্থা’ এবং অন্য ৩/৪টি ডামি প্রতিষ্ঠানের নামে দরপত্র কিনে সকল কাজ নিজেই বাগিয়ে নেন৷ সমপ্রতি সখীপুর-গোড়াই সড়কে তিনি মেরামত ও সংস্কারের জন্য ২ কোটি টাকার কাজ পান৷ ১ বছরের অধিক সময় ধরে রাসত্মাটির আগের কার্পেটিং উপড়ে ফেলা হলেও নতুন কার্পেটিঙের কাজ চলছে অত্যনত্ম ঢিমেতালে এবং অতি নিম্নমানে৷ রাসত্মায় চলতে যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে৷ সখীপুর-বাশাইলের সাবেক সাংসদ হওয়ার দরুনই তিনি এই দুই উপজেলায় সকল ঠিকাদারির কাজ বিভিন্ন চাপ ও কৌশলের মাধ্যমে হাতিয়ে নেন৷ সখীপুর উপজেলার বড়ো বড়ো নির্মাণ কাজ সবই কাদের সিদ্দিকীর নিজের ও তার ভাইদের কুক্ষিগত৷ আর কোনো কাজ তারা নিজেরা যদি নাও করেন, তাদেরকে বখরা না দিয়ে সে সব কাজ অন্য কেউ পেতে পারেন না৷
গোড়াই-সখীপুর রাসত্মা সংস্কারের ২ কোটি টাকার কাজ কাদের সিদ্দিকী নিজেই করছেন৷ পৌরসভার ভিতর ২ কোটি ৯০ লাখ টাকার রাসত্মা নির্মাণের কাজ করছেন কাদের সিদ্দিকীর ছোটভাই মুরাদ সিদ্দিকী (বর্তমানে যৌথবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে)৷ সখীপুর থেকে কালিহাতীর বল্লা পর্যনত্ম ২ কোটি টাকার রাসত্মা নির্মাণ কাজ করছেন কাদের সিদ্দিকীর আরেক ছোটভাই আজাদ সিদ্দিকী ( তিনিও বর্তমানে যৌথবাহিনীর হাতে আটক হয়ে কারাগারে আছেন)৷ ফলে, সখীপুর উপজেলার বর্তমানে চলতে থাকা বড়ো তিনটি কাজ তারা নিজেরাই করছেন, অন্য কোনো ঠিকাদারকে কাছে ঘেঁষতেও দেননি৷
কাদের সিদ্দিকী এবং তার ভাইরা শুধু তার নির্বাচনী এলাকায় নয়, টাঙ্গাইলের বিভিন্ন জায়গার ঠিকাদারির বড়ো বড়ো কাজ টেন্ডারবাজির মাধ্যমে বাগিয়ে নেন৷ ভোরের কাগজ, প্রথম আলো, যুগানত্মর, সমকালসহ বড়ো বড়ো কয়টি জাতীয় দৈনিকেই কাদের সিদ্দিকীর জমি দখল ও টেন্ডারবাজির খবর ছাপা হয়েছে৷ কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুরসহ বহু জায়গায় কাদের সিদ্দিকীর ‘সোনার বাংলা’ ঠিকাদারি সংস্থার কাজ বছরের পর বছর ধরে অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে৷ অথচ অভিযোগ রয়েছে, ঐ সমসত্ম কাজের ৮৫% টাকা সরকারের ফান্ড থেকে উঠিয়ে ফেলা হয়েছে৷ টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সঙ্গে ভুয়াপুর উপজেলার একটি সংযোগ সেতুর কাজ কাদের সিদ্দিকী দীর্ঘ ১৫ বছরেও শেষ করেননি৷ অথচ ঐ প্রকল্পের সিংহ ভাগ টাকাই তিনি তুলে নিয়েছেন৷ এভাবেই তিনি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শত শত কোটি টাকা আত্মসাত্‍ করেছেন৷

দুই রত্ন দুই ভাই
কাদের সিদ্দিকীর ভাই মুরাদ সিদ্দিকী ও আজাদ সিদ্দিকীর মূল আয়ের জায়গা হচ্ছে টাঙ্গাইলে এলজিইডি ভবন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিদু্যত্‍ উন্নয়ন বোর্ড৷ এসব জায়গা থেকে সরকারিভাবে যতো কাজ ঠিকাদারির মাধ্যমে দেওয়া হয়, তার উল্লেখযোগ্য একটি পারসেন্টেজ যায় আজাদ-মুরাদের পকেটে৷ এ দুই ভাইকে বখরা না দিয়ে কোনোভাবেই ঠিকাদারির কাজ পাওয়া সম্ভব নয় স্থানীয় কোনো ঠিকাদারের৷ আজাদ-মুরাদের রয়েছে বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী৷ ঠিকাদারির কাজগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সন্ত্রাসী বাহিনীর লোকজনদেরই দেওয়া হয়৷ অনেককে আবার মাসিক হিসেবে থোক টাকাও প্রদান করা হয়৷ নামে-বেনামে এদের রয়েছে অঢেল সম্পত্তি৷ প্রত্যেক ভাইয়ের পাজেরো, ল্যান্ড ক্রুজারের মতো দামি গাড়ি রয়েছে একাধিক৷ স্থানীয় কোনো লোকজন তাদের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটিও করতে পারে না৷ আজাদ-মুরাদ দুজনের নামেই রয়েছে একাধিক হত্যা মামলা৷ বিভিন্ন মামলায় এরা বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার হলেও সচরাচর অল্প সময়ের মধ্যে আইনের ফাঁক গলিয়ে বের হয়ে আসে৷ তবে এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে যৌথবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ায় খুব সহজে তারা জেল থেকে বের হতে পারবে না বলে স্থানীয় লোকজনের বিশ্বাস৷

জোট আমল ছিল স্বর্ণ যুগ
সাবেক বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমল ছিল কাদের সিদ্দিকী ও তার ভাইদের দখল বাণিজ্য ও ঠিকাদারি সন্ত্রাসের স্বর্ণযুগ৷ এ আমলে তিনি ও তার ভাইরা যা কামিয়েছেন, অন্য কোনো আমলেই সে সুযোগ পাননি৷ জোট আমলে নিজের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে টাঙ্গাইল ও তার আশপাশের জেলার ঠিকাদারির অনেক কাজ ২০ থেকে ২৫ ভাগ করেই ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ কাজের বিল উঠিয়ে নেন৷
অভিযোগ রয়েছে, মুক্তিযুদ্ধকাল থেকেই কাদের সিদ্দিকী সুবিধাবাদী, ক্ষমতালিপ্সূ৷ নিজ বাহিনীতে কখনই কাউকে মাথা তুলতে দেননি৷ ‘৯৬-এর নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে তাকে মন্ত্রিত্ব না দেওয়ার তিনি আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করে উপনির্বাচন করেন, কিন\’ পরাজিত হন৷ ২০০১-এর সাধারণ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হয়ে তিনি তার নির্বাচনী এলাকা সখীপুর-বাশাইলে ঠিকাদারির আধিপত্য বিসত্মার ছাড়া আর কিছুই করেননি৷ বিএনপি-জামাতের নীলনকশা অনুযায়ী গত ২২ জানুয়ারি যে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল তা দেশ-বিদেশে সকলের কাছেই অগ্রহণযোগ্য থাকলেও এ নির্বাচনে কাদের সিদ্দিকী অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন৷

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.