অতীশ দীপঙ্করের জ্ঞানের আলো

ব্রজযোগিনী থেকে তিব্বতের রাজদরবার : অতীশ দীপঙ্করের জ্ঞানের আলো

মুন্সিগঞ্জের ব্রজযোগিনী গ্রামের সাথে জড়িত আছে এক জ্ঞানতাপসের নাম৷ তিনি শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর৷ সেই গ্রামে দীপঙ্করের কিংবা তার পরিবারের কোন চিহ্ন আজ আর নেই৷ তবু ব্রজযোগিনীর পন্ডিতের ভিটা বলতে অতীশ দীপঙ্করের বাড়ী বুঝানো হয়৷ সেই ভিটায় একটি নামফলক স্থাপন করা হয় ১৯৮২ সালে৷ পরে একটি অডিটরিয়াম৷ এই নিয়ে পণ্ডিতের ভিটা৷ এখানে সহস্র বছর আগে পায়ের চিহ্ন পড়েছিলো অতীশ দীপঙ্করের৷ অতীশ শব্দের অর্থ মহামানব৷ এটি তিব্বতীয় ভাষার একটি শব্দ৷ অতীশ পন্ডিত দীপংকরের উপাধী৷ বিক্রমপুরের বাঙালী দীপংকর জ্ঞানের আলো নিয়ে গিয়েছিলেন সুদূর তিব্বতে সেখানকার রাজার সবিনয় আমন্ত্রণে৷ তিব্বতের রাজা পণ্ডিত দীপঙ্করের প্রতি এতটাই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন যে, এই নামটি উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে তিনি সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেন এবং করজোরে প্রণাম নিবেদন করতেন৷ শ্রদ্ধাবনত সেই রাজার নাম জে সে হো৷

শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর আনুমানিক ৯৮০ মতানত্মরে ৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন৷ জন্মস্থান বাংলাদেশের বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রাম৷ প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ পাগ্-সাম্-জন-জাঙ্গ-এর মতে ‘অতীশ দীপঙ্করের জন্মভূমি বিক্রমপুর বজ্রাসনের পূর্বদিকে অবস্থিত’৷ দীপঙ্করের পিতার নাম কল্যাণশ্রী৷ আর মাতা প্রভাবতী৷ বাল্যকালে জেতারি নামের এক শিৰকের নিকট দীপঙ্কর প্রাথমিক শিৰা লাভ করেন৷ দীপঙ্করের প্রখর জ্ঞানের প্রকাশ ঘটে বাল্যকালেই এবং তা তত্‍কালীন ভারতবর্ষের সর্বত্র প্রচারিত হয়ে যায়৷ ২৫ বছর বয়সে দীপঙ্কর সে যুগের অপ্রতিদ্বন্দ্বী পণ্ডিত নৈয়ায়িক ব্রাহ্মণকে তর্কযুদ্ধে পরাজিত করেন৷ এ ঘটনার পরেই দীপঙ্কর ওদনত্মপুরীর বৌদ্ধাচার্য শীলরৰিতের নিকট হতে ‘শ্রীজ্ঞান’ উপাধী লাভ করেন৷ অতীশ দীপঙ্কর ৩১ বছর বয়সে ব্রহ্মদেশ সফর করেন বৌদ্ধধর্ম প্রচার ও জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে৷ নৌকাযোগে যাত্রা করে ১৩ মাস সময় ব্যয়ে দীপঙ্কর ব্রহ্মদেশের (বার্মা) উপকূলে উপনীত হন৷

জ্ঞান তাপস অতীশ দীপঙ্কর ভিৰু আশ্রমের শ্রেষ্ঠ সম্মান লাভ করেন মাত্র ৩১ বছর বয়সে৷ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতি নিকটে দীপনগর নামে একটি গ্রাম এখনো বিদ্যমান, যে গ্রামের নাম রাখা হয়েছিল অতীশ দীপঙ্করের নামানুসারে৷ দীপঙ্কর ভিৰু হওয়ার পর বিক্রমশীলা বিহারে আশ্রয় গ্রহণ করেন৷ বিক্রমশীলা বিহার হতে অতীশ দীপঙ্কর বৌদ্ধধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ব্রহ্মদেশে গমণ করেন৷

দীপঙ্করের জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে পালবংশীয় নরপতি মহীপাল (৯৮০-১০৩০ খ্রিঃ) তাঁকে বিক্রমশীলা বিহারে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে যান এবং এ বিহারের অধ্যৰের দায়িত্ব দেন৷ মহীপালের মৃতু্যর পর তার পুত্র ন্যায়পালও দীপঙ্করকে বিক্রমশীলা বিহারে অধ্যৰের পদে বহাল রাখেন৷ দীপঙ্কর যুগে মুন্সীগঞ্জ এলাকায় বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ শিৰা কেন্দ্র গড়ে ওঠে৷ এর মধ্যে কেওয়ার এলাকায় ক্বহোরী বজ্রাসন, জগদ্দল বিহার প্রভৃতি সবিশেষ উলেস্নখযোগ্য৷ এছাড়া মুন্সীগঞ্জে কেওয়ার দেউল, জোড়ার দেউল, সোনারঙ্গ দেউল, নাটেশ্বর দেউল, পুরাপাড়া দেউল, দেউল বাড়ী, নারায়ণগঞ্জ দেউলপাড়া, দেউল ভোগ ও তারেশ্বরে বৌদ্ধ বিদ্যানিকেতন গড়ে ওঠে৷

দীপঙ্করের সুনাম যখন ভারত ছাড়িয়ে চীন, তিব্বত, নেপাল, ব্রহ্মদেশে ছড়িয়ে পড়ে তখন তিব্বত রাজা জেসে তাঁকে সেদেশে আমন্ত্রণ করেন৷ উলেস্নখ্য, সে সময় তিব্বতের সামাজিক অবস্থা ছিলো খুবই খারাপ৷ মানুষ ভুলে গিয়েছিলো গৌতমবৌদ্ধের মহানশিৰা৷ শঠতা, হিংসা, হানাহানিতে ভরে গিয়েছিলো দেশ৷ এই অবস্থা থেকে পরিত্রানের আশায় রাজা দীপঙ্করের সাহায্য প্রার্থনা করেন৷ রাজার আমন্ত্রণে দীপঙ্কর তিব্বত যাত্রা করেন৷ দীপঙ্কর ১০৪২ খ্রি. ৫৯ বছর বয়সে তিব্বত গমন করেন৷ দীপঙ্কর তাঁর তিব্বত যাত্রায় ৫ জন সফর সঙ্গী নিলেন৷ এরা হলেন-ভূমিসঙ্গ, বীর্যচন্দ্র, নাগছো, গ্যায়ত্‍সোদেব প্রমুখ৷ তিব্বত যাত্রা পথে দীপঙ্কর নেপাল রাজা অননত্মকীর্তিকে একটি হাতি উপহার দেন৷ আর একটি বিহার নির্মাণের নির্দেশ দেন৷ পরে অবশ্য অননত্মকর্ীর্তির ছেলে পদ্ম প্রভ ‘নেপালে’ ‘থান-বিহার’ নির্মাণ করেন৷ এই পদ্ম প্রভই ভারতের বাইরে দীপঙ্করের প্রথম শিষ্য৷ নেপালে অবস্থানকালে দীপঙ্কর বাংলার রাজা ন্যায়পালকে একটি পত্র লেখেন৷ সে পত্রখানি ‘বিমল রত্নলেখ’ নামে ইতিহাসে পরিচিত৷ বৌদ্ধ ধর্মগুরম্ন দীপঙ্কর তিব্বতে প্রবেশ করলে একশ’ অশ্বারোহী সৈন্য তাঁকে স্বাগত জানায়৷ জানা যায়, রাজদরবারে দীপঙ্করকে সর্বপ্রথম উষ্ণ চা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়৷

শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর বহুগ্রন্থের প্রণেতা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থগুলো হলো-বোধিপথ, প্রদীপ, চর্য্যা সংগ্রহ, প্রদীপ্ত মধ্যমোপদেশ, মহাযান পথ সাধন, বর্ণসংগ্রহ, বর্ণবিভঙ্গ, সপ্তক বিধি, গুরম্নক্রিয়াক্রম৷ তিব্বতেও অতীশ দীপঙ্করকে নিয়ে বহুগ্রন্থ লেখা হয়েছে৷ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাক্তন অধ্যাপক লামা দাউসনদুপের নিকট তিব্বতীয় ভাষায় ৬০০ পৃষ্ঠার একটি ‘দীপঙ্কর জীবন চরিত’ রৰিত ছিল৷ কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো উলেস্নখিত বইগুলো এখন খুঁজে পাওয়া যায় না৷ অতীশ দীপঙ্কর হাজার বছরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালী৷ সেই সুদূর অতীতে দীপঙ্করই প্রথম বাংলাদেশকে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচিতি এনে দেন৷

শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে যাওয়ার পর বেঁচে ছিলেন ১২ বছর৷ এই বার বছর বৌদ্ধধর্ম প্রসারে দীপঙ্কর নিজেকে নিয়োজিত রাখেন৷ ধর্মপ্রচার ছাড়াও দীপংকর আত্মনিয়োগ করেন আর্তমানবতার সেবায়৷ তিব্বতের এক জনপদ হতে তিনি ছুটে গিয়েছেন অন্য জনপদে মানুষের কল্যাণে৷ যখনই তিনি শুনতে পেতেন মানুষের দুঃখ দুর্গতির কথা, তখনই তিনি ছুটে যেতেন৷ অতপর অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতের লাখার নিকটবতর্ী ন্যাথ্যাং নামক স্থানে ১০৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ৭৩ বছর বয়সে মারা যান৷ দীপঙ্করের মৃতু্যর পর তার চিতাভস্ম ছড়িয়ে দেওয়া হয় তিব্বতের নানা স্থানে৷ সেইসূত্রে নানা জায়গায় গড়ে ওঠে দীপঙ্করের স্মৃতিসৌধ৷ যেসবের কোনো কোনটি এখনও বিদ্যমান রয়েছে৷

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s