কালের মণীষা শওকত ওসমান – মৃতু্যবার্ষিকী শ্রদ্ধাঞ্জলি – ড. আবুল আজাদ

86065_1

১৪ মে ২০০৭ সোমবার মহান কথাশিল্পী শওকত ওসমানের ৯ম মৃতু্য বার্ষিকী৷ দেখতে দেখতেই তাঁর মহাপ্রয়াণের প্রায় একটি দশক পেরিয়ে গেলো৷ অথচ তাঁর রেখে যাওয়া শিল্প-সৃষ্টি ও স্মৃতি আমাদের অগ্রপশ্চাতে এমনভাবে বিচারণশীল হয়ে আছে যে, প্রাপ্তির গৌরবের কাছে হারানোর বেদনা পরাভূত৷ মৃতু্যর মাত্র সাড়ে তিন মাস আগে জাতির পৰ থেকে শওকত ওসমান জন্মদিন উত্‍সব পরিষদ ও রাইটার্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের যৌথভাবে দেয়া ৮২ তম জন্ম দিনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শওকত ওসমান তাই অকপটে “অনুজগণের প্রতি” উচ্চারণ করলেন,

এবার যেখানে যাবো

অসম্ভব ফিরে আসা

কাঁকড়ার মত অগ্রে-পশ্চাতে

জেনো বিচরণ-শীল

অনুজের প্রতি তার ভালবাসা৷

এই ভালবাসাই রয়ে গেলো তাঁর অনুজদের মাঝে৷ হারানোর বেদনা তাই পরাভূত প্রাপ্তির গৌরবের কাছে৷

২. বাংলা সাহিত্যে শওকত ওসমান এক অসামান্য প্রতিভা৷ কবিতা রচনার মধ্য দিয়ে সাহিত্যিক জীবনের হাতে খড়ি ঘটলেও কথাশিল্পী-ঔপন্যাসিক হিসেবেই তাঁর সর্বজন সমাদৃত প্রতিষ্ঠা৷ ১৯৩৪ সালে স্কুল ম্যাগাজিনে ছাপার অৰরে প্রথম তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়৷ পরবতর্ী দশ বছরের মধ্যে বিদগ্ধ সাহিত্যিক সমাজে শওকত ওসমান সুপরিচিত ও প্রতিশ্রম্নতিশীল লেখক৷ ১৯৪৪ সালে তাঁর পরপর তিনটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়৷ এগুলো হচ্ছে নাটক ‘তস্কর লস্কর’, শিশুতোষ গ্রন্থ ‘তারা দুই জন’ এবং ‘ওটেন সাহেবের বাংলো’৷ এরপর থেকে অব্যাহত-অবিশ্রানত্ম লিখে গেছেন শওকত ্ওসমান৷ প্রথম উপন্যাস ‘বনি আদম’ প্রকাশিত হয় ১৯৪৬ সালে৷ মৃতু্যর পূর্ব পর্যনত্ম শওকত ওসমানের প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ৯০৷ এর বাইরে তাঁর ‘জননী’ ও ‘রাজসাৰী’ উপন্যাসসহ ২৩টি ছোট গল্পের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে৷

শওকত ওসমানের গ্রন্থ তালিকাটি নিম্নরূপ, উপন্যাস ১৬টি, উলেস্নখযোগ্য-জননী, ক্রীতদাসের হাসি, আর্তনাদ, দুই সৈনিক৷ গল্পগ্রন্থ ১৪টি, উলেস্নখযোগ্য- জন্ম যদি তব বঙ্গে, পুরাতন খঞ্জর, হনত্মারক৷ প্রবন্ধ গ্রন্থ ৯টি, উলেস্নখযোগ্য- সমুদ্র নদী সমর্পিত, পূর্ণ স্বাধীনতা চূর্ণ স্বাধীনতা, ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী৷ কাব্যগ্রন্থ ৩টি- নিজস্ব সংবাদদাতা প্রেরিত, শেখের সম্বরা, (১ম ও ২য় খন্ড)৷ নাটক ৬টি, উলেস্নখযোগ্য- আমলার মামলা, জন্ম জন্মানত্মর, এতিমখানা৷ অনুবাদ ১০টি, উলেস্নখযোগ্য- স্পেনের ছোটগল্প, ডাক্তার আবদুলস্নার কারখানা, সনত্মানের স্বীকারোক্তি৷ শিশু সাহিত্য ১০টি, উলেস্নখযোগ্য- ওটেন সাহেবের বাংলো, ৰুদে সোসালিষ্ট, পঞ্চসঙ্গী৷ আত্মজৈবনিক রচনা ১১টি, উলেস্নখযোগ্য- স্বজন স্বগ্রাম, স্মৃতিখণ্ড মুজিবনগর, উত্তরপর্ব : মুজিবনগর, অসত্মিত্বের সঙ্গে সংলাপ, সোদরের খোঁজে স্বদেশের সন্ধানে, আর এক ধারা ভাষ্য৷ পাঁচ মিশালী গ্রন্থ ১টি, হপ্তম পঞ্চম৷ সম্পাদিত গ্রন্থ ২টি, উলেস্নখযোগ্য- প্রতিভা প্রজ্জ্বলিত নিমেষে নির্বাপিত৷ সমালোচনা গ্রন্থ ১টি, ঊুবষবংং রহ ঃযব ঁত্‍হ নু ঝধহলরন ফধঃুধ. এই বিশাল গ্রন্থ তালিকার বাইরে পত্র-পত্রিকা সাময়িকীতে তাঁর অগ্রন্থিত অজস্র রচনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে৷ এ ধরনের ৪টি উলেস্নখযোগ্য রচনা হচ্ছে, কিশোর রচনা ‘জুজুগগা’, উপন্যাস ‘যাত্রাবিন্দু’, বড়গল্প ‘অনাগত উপন্যাসের মুসাবিদা’ ও আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘রাহনামা’ (অসমাপ্ত)৷

কলেস্নাল গোষ্ঠী তিরিশের দশকে বাংলা সাহিত্যে যেমন এক বিশেষ চেতনা নিয়ে আবিভর্ূত হয়৷ তেমনি চলিস্নশ-পঞ্চাশের দুই দশকও বিশ্বযুদ্ধের পরিণাম থেকে উঠে আসা সভ্যতা রৰার তাগিদ, ঐতিহ্য প্রবণতা, নগরায়ন মানস ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার কারণে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতা বিকাশের বিশেষ কাল হিসেবে সমাদৃত৷ শওকত ওসমান একালের পথিকৃত্‍ লেখক এবং তাঁর সমসাময়িক সৈয়দ ওয়ালীউলস্নাহ, আবু রম্নশদ, শামসুদ্দীন আবুল কালাম ও আবু ইসহাকসহ অসংখ্য প্রগতিশীল চিনত্মা-চেতনার অধিকারী লেখক-শিল্পী মানসের প্রচেষ্টাই পঞ্চাশের দশকটি বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার ঐতিহ্য ও অলঙ্কারে সমৃদ্ধ হয়েছে৷ শওকত ওসমানের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কর্মগুলিও মোটামুটি এ কালেরই ফসল৷

শওকত ওসমানের সাহিত্যিক কর্মকাল অর্ধশতাব্দীরও অধিক সময়ের৷ অব্যাহত ভাবে লিখে গেছেন এই যশস্বী কথাশিল্পী৷ কিন্তু শিল্পী মন তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যনত্ম ছিল নিরীৰাধমর্ী-পরিব্রাজক৷ জীবন নিরীৰার মধ্যে অনত্মর্গত সত্য উদঘাটন প্রচেষ্টাই ছিল তাঁর এই বৈশিষ্ট্যের প্রধান লৰ্য৷ দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন তিনি৷ তবু তাঁর চলে যাওয়া জাতির জন্য অপূরনীয় ৰতি৷ যেনো শেষ নৰত্রের নির্গমন৷ তাঁকে চেনা যেতো ৷ তিনি যা বলতেন এবং করতেন, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেই তা বলতেন, প্রতিপালন করতেন৷ আর দশ জনের মতো কোন অস্পষ্টতা বা রাখঢাকের আশ্রয় নেননি কখনো৷ মেধা ও যোগ্যতায় প্রাপ্তির সর্বোচ্চ শিখরে পেঁৗছে যাওয়ার রাসত্মা তাঁর জন্য ছিল খুবই মসৃণ৷ কিন্তু সে পথে কখনো তিনি অগ্রসর হননি৷ কাজের মধ্যে লেখালেখি নিয়েই ডুবে ছিলেন৷ তারপরও আরাধ্য অনেক কাজ অসমাপ্ত রেখেই লোকানত্মরিত হলেন৷ রবীন্দ্রনাথের পর সর্বৰেত্রে খ্যাতিমান এমন দীর্ঘায়ু লাভকারী সৌভাগ্যবান লেখকের সংখ্যা আমাদের দেশে খবুই বিরল৷

৩. প্রতিবাদী চেতনার সংগ্রামী মানুষ ছিলেন শওকত ওসমান৷ তাই প্রতিভার কাজ লেখালেখি করেই কেবল দায় সম্পাদন করেন নি৷ দেশ ভাগোত্তর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কদর্য অভিশাপে ১৯৪৭ সালে তাঁকে হিন্দুসত্মান ছেড়ে তত্‍কালীন পূর্ব পাকিসত্মান তথা আজকের বাংলাদেশে চলে আসতে হয়৷ জীবনের প্রয়োজনে জন্মভূমি ত্যাগ করে এলেও এবং মুসলমান জাতীয়তার হাতছানি তাঁকে বাংলাদেশে অভিবাসিত হতে উত্‍সাহিত করলেও শুরম্ন থেকেই শওকত ওসমান ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের সমর্থক-মেধাবী কথাশিল্পী ও পরিশ্রমী সংগঠক৷ তাই দেখতে পাই ১৯৪৭ এর অক্টোবরে চট্টগ্রাম কমার্স কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েই স্থানীয় নানা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন শওকত ওসমান৷ সরকারি কলেজে চাকরি করা সত্বেও আটচলিস্নশ থেকে বায়ান্ন পর্যনত্ম ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি সত্মরেই তিনি সরকার বিরোধী তত্‍পরতায় সক্রিয় সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন৷ এ সময় পশ্চিম পাকিসত্মানের তথাকথিত মুসলমান ভাইদের অব্যাহত বৈমাত্রেয়সুলভ আচরণের ফলে বাঙালি বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের পাশাপাশি শওকত ওসমানেরও ‘মানসিক কুয়াশা’ অপসারিত হয়৷ তাঁর জাতিসত্তার চেতনা আরো প্রত্যৰ হয়ে ওঠে৷ শ্রেণী কৰে পাঠদানের বাইরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশে, সাংস্কৃতিক উত্‍সব-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে এসময় তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের পৰে অব্যাহত ভাবে প্রচার করতে থাকেন৷

১৯৫২ সালের আগস্টে পূর্ব পাকিসত্মান সাংস্কৃতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কুমিলস্নায়৷ শওকত ওসমান এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে গুরম্নত্বপূর্ণ বক্তব্য পেশ করেন৷ পরবতর্ী ৫ বছরের মধ্যে রাজনৈতিক মঞ্চেও শওকত ওসমান আবিভর্ূত হন৷ ১৯৫৭ সালে কাগমারিতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্মেলনে পঠিত তাঁর প্রবন্ধটি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শিরোনামায় উপস্থাপিত হলেও এর ভেতরকার বেশির ভাগ কথাবার্তাই ছিল বাঙালি জাতীয়তা বিকাশের প্রেরণা সঞ্চারক৷ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তাঁর বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশের স্বপ্নদ্রষ্টা নেতা-স্থপতি পুরম্নষ৷ তাই আইউব খানের মৌলিক গণতন্ত্র বিরোধী আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবের সকল সংগ্রাম-আন্দোলনে শওকত ওসমান ছিলেন প্রথম কাতারের সৈনিক৷

প্রতিবাদী চেতনার এই সংগ্রামী কথাশিল্পী জীবনে আপোষ করা তো দূরে থাক, ভোগ-বিলাস আর অর্থ-বিত্ত ও ৰমতার মোহে কখনো পরাভূত হননি৷ সরকারি চাকুরে হওয়া সত্বেও একাত্তরে সুবিধাভোগী সতীর্থ সহকমর্ীদের নিষেধ-উপদেশ উপেৰা করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য দেশ ত্যাগ করেন এবং মুজিবনগর সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন৷ তাঁর এইসব ভূমিকাই জাতির জনকের হত্যাকান্ডের ঘটনায় তাঁকে ভীষণ ৰুব্ধ করে৷ শওকত ওসমান বিশ্বের বিরল প্রতিভাধর সেইসব জাতীয়তাবাদী দুঃসাহসী লেখকদের অন্যতম, যিনি তাঁর নেতা জাতির জনক-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যার প্রতিবাদে দেশত্যাগের মাধ্যমে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে গিয়ে অসীম দুঃখ-কষ্টের দিন যাপনকে বরণ করে নিয়েছিলেন৷ প্রবাসের সেই নির্বাসনের দিনগুলিতে তাঁর থাকা-খাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা ছিলো না৷ কিন্তু এজন্য কখনোই তিনি আপেৰ করেন নি৷ প্রাপ্তির সকল দ্বার স্বেচ্ছায় রম্নদ্ধ করে রেখেছিলেন৷

নির্বাসন প্রত্যাগত শওকত ওসমানের মধ্যেও আদর্শগত কোনো পরিবর্তন লৰ্য করা গেল না৷ পূর্বানুরূপ কুসংস্কার-পশ্চাত্‍পদতা ও অশিৰা বিরোধী সকল সামাজিক আন্দোলন ও স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের পাশাপাশি মৌলবাদ বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনের এ পর্যায়েও তিনি সামনের কাতারেই থাকলেন৷ এমনকি জীবনের শেষ দিকে আশির কোঠায় পা দিয়েও স্বৈরাচারী সামরিক সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে মিছিলের একদম সম্মুখ ভাগেই ছিলেন তিনি৷ ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় বার হৃদরোগে আক্রানত্ম হয়ে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে চিকিত্‍সাধীন অবস্থায় ডাক্তার-নার্সদের ফাঁকি দিয়ে হাসপাতালের বেড থেকেই ছুটে গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মৌলবাদ বিরোধী সমাবেশে৷ আবার ফিরেও গিয়েছিলেন হাসপাতালের বেডে৷

বলতে কি সমাজ প্রগতির সংগ্রামে, স্বৈরাচার ও মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনে মাঠ পর্যায়ে তাঁর সমবয়সী দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না৷ যেনো চির তরম্নণ এক সর্ব বিপস্নবী৷ ঘরে-বাইরে অব্যাহত ভাবে কাজ করে গেছেন শওকত ওসমান৷ তাঁর ৰুরধার লেখনী-বিশেষ করে ‘শেখের সম্বরা’ ও ‘মিঞা কি গাজন’ শেষ দিকে চলমান রাজনৈতিক-সামাজিক ঘটনাবলীর জাতীয় বিবেকের পর্যালোচনা হিসেবে সমাদর লাভ করেছে৷

জীবদ্দশায় অনুষ্ঠিত শেষ (৮২তম) জন্ম দিনে জাতির পৰ থেকে তাঁকে ‘জাতির কথাশিল্পী’র মর্যাদায় ভূষিত করা হয়৷ ১৯৯৮ সালের ১৪ মে দেহত্যাগের পর মুক্তিযুদ্ধ চেতনার তত্‍কালীন গণতান্ত্রিক জাতীয় ঐকমত্যের সরকার সরকারি মর্যাদায় সমাহিত করে এই মহান কথাশিল্পীর প্রতি দেশ ও জাতির পৰ থেকে যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদর্শন করেন৷

বাঙালি জাতিসত্তার ঐতিহ্য অনুসারী গণতন্ত্রমনস্ক একটি প্রবল শিল্পচেতনার রূপকার হিসেবে প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ শওকত ওসমান ‘একুশে পদক’ ও ‘স্বাধীনতা পুরষ্কার’সহ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের গুরম্নত্বপূর্ণ প্রায় সবগুলি পুরস্কারই অর্জন করেন৷ কিন্তু এই প্রাপ্তি তাঁকে বিশ্রানত্ম করেনি৷ তিনি নিজে যেমন কাউকে বঞ্চিত করতেন না, তেমনি তাঁকে কেউ বঞ্চিত করতে চাইলে প্রতিবাদে জ্বলে উঠতেন৷ এমনই এক ঘটনা, ১৯৮৩ সালে ‘একুশে পদক’ লাভের পর ঐ রাষ্ট্রীয় পদকের ধাতবে ভেজাল আবিস্কার করে সংবাদ শিরোনাম হয়েছিলেন শওকত ওসমান৷ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই হীনমন্যতা উদঘাটনের জন্য তাঁকে একুশে পদকটি খন্ড-বিখন্ড করতে হয়৷ যা আর দশ জনের পৰে সম্ভব হয় নি৷ শওকত ওসমানের পৰে সম্ভব হয়েছিল, কারণ তিনি পদকের জন্য কখনো লেখেন নি৷ পদক প্রাপ্তি কখনোই তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিলো না৷

৪. আড়াই দশক আগে, ১৯৮২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যখন শওকত ওসমানের ওপর গবেষণা করছিলাম তখন তিনি সদ্য নির্বাসন প্রত্যাগত৷ একটি দীর্ঘ রাজনেতিক সংগ্রাম এবং সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরই তার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নির্মমভাবে হত্যার প্রতিবাদে শওকত ওসমানের নির্বাসনে গমনের ঘটনাটি ঐ সময় বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও তাদের প্রত্যৰ-পরোৰ দোসর তত্‍কালীন ৰমতাসীনদের কাছে ছিলো প্রবল দুশ্চিনত্মার কারণ৷ বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকান্ডের পর এদেশের একমাত্র প্রতিবাদী লেখক তিনি, দীর্ঘ অর্ধ দশক পর্যনত্ম যিনি নির্বাসন জারি রেখেছিলেন৷ ফলে সরকারের উচ্চ মহলে সেদিন এমন আলোচনাও হয়েছিল যে, তিনি দেশে ফিরে না এলে এবং বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিষয়ে বিদেশী প্রচার মাধ্যমে উচ্চবাচ্য করা বন্ধ না করলে এদেশে তাঁর সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে৷

নির্বাসনের দুর্বিসহ দীনতার পাশাপাশি সরকারি এই চাপাচাপি এসময় তাঁকে মানসিকভাবে বিব্রত করেছে৷ জীবনের এই নিরাশক্ততা, প্রমথনাথ বিশীর ভাষায় ‘বিবিক্ততা ও বিচ্ছিত্তি’ তাঁকে সাহিত্যে যে আত্মনিগুহণের দিকে ঠেলে দিয়েছিল- তাতে কখনো তিন জনবলস্নভ হননি৷ সমকালের পত্র-পত্রিকাগুলি বা প্রকাশকরাও এ সময় তাঁকে নিয়ে খুব একটা মাতামাতি করেনি৷ বলতে কি এড়িয়েই চলেছে৷

সত্তরের দশকের দ্বিতীয়ার্ধ এবং আশির দশকের কিছুকালের এ অবস্থার প্রধান কারণ, প্রচারমাধ্যম থেকে দূরে অবস্থান, স্বেচ্ছা নির্বাসন এবং সাহিত্যে বাঙালি জাতিসত্তার ঐতিহ্য অনুসারী বলিষ্ঠ ব্যতিক্রম ধারা সৃষ্টির মাধ্যমে সমসাময়িকদের ঈর্ষার উদ্রেক৷ তারসঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিকূলতা সজ্ঞাত যুগের উপেৰাও আলোচ্য সময়টিতে তাঁর ওপর পর্যাপ্ত আলোচনার ৰেত্র সৃষ্টি হতে দেয়নি৷ ১৯৮২ সালে রাজনৈতিক পালাবদলের ফলে শওকত ওসমান সম্পর্কে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে ধারণা যে পরিবর্তিত হয়, তার প্রমাণ লৰ্য করি ১৯৮৩ সালে তাঁর ‘একুশে পদক’ প্রাপ্তির মধ্যে৷ সরকারি উপেৰার কারণে প্রচার মাধ্যম ও প্রকাশকদের এড়িয়ে চলার প্রবণতাটিও তাঁর এই পদক প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে অনেকখানি ঘুচে যায়৷ ফলশ্রম্নতিতে পরবতর্ী ৩/৪ বছরের মধ্যে তাঁর প্রায় ২০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়৷

সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই শওকত ওসমান বিচরণ করেন৷ আগেই উলেস্নখ করা হয়েছে যে, কবিতা রচনার মধ্য দিয়ে লেখার জগতে হাতেখড়ি ঘটেছিল তাঁর৷ কিন্তু শেষ পর্যনত্ম প্রতিষ্ঠা ঘটেছে কথা সাহিত্যে৷ দু’টি কাব্যগ্রন্থ যথা নিজস্ব সংবাদদাতা প্রেরিত (১৯৮২) ও শেখের সম্বরা, ১ম ও ২য় খন্ড (১৯৯২) প্রকাশিত হলেও তার ৯০টি গ্রন্থের দীর্ঘ তালিকার প্রায় সবই কথা সাহিত্য৷ উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, অনুবাদ, শিশু সাহিত্য, আত্মজৈবনিক, পাঁচ মিশালী, সম্পাদনা ও সমালোচনা গ্রন্থগুলোর মধ্যে প্রবন্ধ, আত্মজৈবনিক, পাঁচমিশালী, সমালোচনা ও সম্পাদনামূলক গ্রন্থগুলিতে শওকত ওসমানের সমাজমনস্কতা জীবনধমর্ী৷ সমকালীন সমাজ, রাজনীতি ও সমাজনীতি উঠে এসেছে তাঁর এসব রচনায়৷ সমাজ নিয়ন্ত্রাদের তিনি এসব রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন সমাজের সমস্যার মধ্যে অনুপ্রবেশ করতে৷ প্রতিপাশ্বর্ের পরিচিত চরিত্রগুলি, জানা ঘটনা আর অভিজ্ঞতার রোমন্থনে এ পর্যায়ে তিনি হয়ে উঠেছেন কেবল লেখক নন, সমাজ নিরীৰকও৷

আত্মজৈবনিক রচনা ‘কালরাত্রি খন্ডচিত্র’ (১৯৮৬), ‘স্মৃতিখন্ড : মুজিবনগর’ (১৯৯৩) ও ‘উত্তরপর্ব : মুজিবনগর’ (১৯৯৪)-এ তাঁর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যৰ স্মৃতি উচ্চারিত-পর্যালোচিত হয়েছে৷ ঘটনার বেশ পরে, বলতে কি – দেড় থেকে দুই যুগের মাথায় এসব স্মৃতি জারিত হওয়ায় আবেগ অনেক খানি অপসৃত৷ রচনা হিসেবেও সার্থক৷ কিন্তু একই বিষয়ে অর্থাত্‍ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রেৰাপটে রচিত তাঁর উপন্যাসগুলি আবেগ তাড়িত হওয়ায় বর্তমান গ্রন্থগুলির ন্যায় সাফল্য লাভ করতে পারে নি৷ এই সব ব্যর্থতা-সাফল্যের পর্যালোচনা লৰ্য করি শওকত ওসমানের মধ্যে, ১৯৯০ সালে গণঅভু্যত্থানের বছর প্রকাশিত ‘পূর্ণ স্বাধীনতা চূর্ণ স্বাধীনতা’ শীর্ষক প্রবন্ধ গ্রন্থে৷ শওকত ওসমান এই গ্রন্থে বিস্ময়করভাবে বাঙালি জাতিসত্তার স্বাধীনতার বেদনাকে প্রতিধ্বনিত করেন৷ সামরিক স্বৈরাচারের বুটের তলায় গণতন্ত্রের বিপন্ন কান্না ঐ পঁচাত্তর বছর বয়সী শওকত ওসমানকেও প্রবল ভাবে আলোড়িত করেছিল৷ তাই ঐ গণঅভু্যত্থানের অব্যাবহিত কাল পূর্বে ঢাকায় কাফর্ুর মধ্যে মিছিলের নেতৃত্ব দিতে ছুটে গিয়েছিলেন৷

শওকত ওসমানকে অনায়াসেই স্মৃতি বিলাসী লেখক মনে হতে পারে৷ প্রবন্ধ, আত্মজৈবনিক রচনা, পাঁচ মিশালী বা সমালোচনা-সম্পাদনায় তিনি স্মৃতি বর্ণনা করেন অনায়াসে৷ প্রকৃতপৰে এই স্মৃতিচারণে সঞ্চিত অভিজ্ঞতার শিৰা তুলে ধরতেই পাঠকের সামনে নিজের ফেলে আসা অতীতকে টেনে আনেন৷ এর মধ্যে যে অনবদ্য মহিমাটি উচ্চকিত তা হচ্ছে তাঁর ঐতিহ্য প্রবণতা৷ স্মৃতিচারণের মাধ্যমে তিনি একই সঙ্গে ইতিহাস ও ঐতিহ্যাশ্রয়ী হয়েছেন৷

গল্প, নাটক এবং অনুবাদেও শওকত ওসমান সমাজ নিরীৰক৷ বিগতকালের গল্প (১৩৯৩), পুরাতন খঞ্জর (১৯৮৭) বা হনত্মারক (১৯৯১)-এ লেখক জাতিসত্তা বিকাশের মর্মমূলে উপনীত৷ বিশেষ করে ‘হনত্মারক’এ শওকত ওসমান মৌলবাদ বিরোধী প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্কট উত্তরণের তাগিদটিও তুলে ধরেছেন৷ তাঁর এ ধারার বৈশিষ্ট্যাবলীর চূড়ানত্ম বিকাশ ঘটেছে উপন্যাসে৷ সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় বিচরণ করলেও সাহিত্যের সর্বাধিক উলেস্নখযোগ্য অনবদ্য শিল্প মাধ্যম এই উপন্যাসকেই তিনি বিশেষ যত্ন ও গুরম্নত্বের সঙ্গে নিয়েছেন৷ তাই লৰ্য করি, ৯০টি গ্রন্থের দীর্ঘ তালিকার মধ্যে তাঁর উপন্যাসের সংখ্যাই বেশি৷ উপন্যাস সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধিটিও যথার্থ,

‘উপন্যাস শুধু কাহিনী নয়৷ কাহিনীর মাধ্যমে আরো জীবন ব্যঞ্জনা৷ গোটা মানুষকে সম্পূর্ণ রূপে দেখার এই শিল্পরীতি বণিক সভ্যতার অন্যতম অমর অবদান৷ অনত্মরের গুপ্ত ও সুপ্ত জগত্‍কে এমন ভাবে প্রকাশ্যমান করার সামর্থ অন্য শিল্পরীতির মাধ্যমে কোন দিন সম্ভব হয়নি৷’

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাস থাকলেও উপন্যাসের আবির্ভাব উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে৷ এর একশ বছর আগে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইউরোপে যে সাংস্কৃতিক বিপস্নব সংগঠিত হয়, বাংলা উপন্যাস তার পরোৰ প্রতিক্রিয়ার ফসল৷ ইউরোপের উপনিবেশগুলিতে ঐ সাংস্কৃতিক বিপস্নবের চেতনা সম্প্রসারিত হতে কিছুটা সময় লাগলেও এদেশে তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে সময় নিয়েছে ৭০ থেকে ৮০ বছর৷ ততদিনে ইউরোপ-আমেরিকার ঔপন্যাসিকগণ নিজ দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বসাহিত্যে আসন করে নিয়েছেন৷ ডিকেন্স, লরেন্স, জেমস জয়েস, ভার্জিনিয়া উলফ্, টলস্টয়, তুর্গেনিভ, দসত্ময়ভস্কি, প্রম্নসত্ম, টমাস ম্যান, ফ্রেঞ্চ কাফকা, কামু্য, আর্নেষ্ট হেমিংওয়ে প্রমুখ জগত্‍ বিখ্যাত ঔপন্যাসিকগণ এসময় বাংলা ভাষার পাঠক-সাহিত্যিক মহলেও সম্যক পরিচিত হয়ে উঠেছেন৷ পৰানত্মরে বাংলা সাহিত্যে তখন গদ্যের অনুপ্রবেশ ঘটছে মাত্র৷

উপন্যাসে শওকত ওসমান যেমন সংস্কার প্রবণ, প্রতিবাদ মনস্ক ও জীবন অন্বেষী তেমনি পরিব্রাজক শিল্পীও৷ জীবন, সত্য ও সৌন্দর্য নেশায় বারবার তিনি সমাজকে নিরীৰণ করেন বিভিন্ন ভাবে৷ তাই তাঁর সাফল্যও চূড়ানত্ম ভাবে কোথাও থমকে যায়নি৷ কোন একটি গ্রন্থ বা রচনাদ্বারা তাঁর ঔপন্যাসিক প্রতিভার মূল্যায়ন করাও সম্ভব নয়৷ সমগ্র শওকত ওসমানই একটি প্রতিভা৷

লৰ্য করলে দেখা যাবে, সব রচনাতেই শওকত ওসমান জীবনের সন্ধানে নিরীৰা প্রয়াসী৷ কাহিনী ও চরিত্রকে ভাংচুর করে নতুন ভাবে সাজিয়ে সত্যের দ্বার প্রানত্মে উপনীত হওয়ার প্রাণানত্মকর প্রচেষ্টা তাঁর৷ এ জন্য অনেক ৰেত্রে তাঁর মধ্যে কৃত্রিমতা এসেছে৷ রচনার আঙ্গিকে ও বিষয় বৈচিত্রে আসেনি কোন নতুন মেজাজ৷ ‘ক্রীতদাসের হাসি’র তাতারী, ‘রাজা উপাখ্যানে’র হরমুজ, ‘জলাংগী’র জামিরালি, ‘পতঙ্গ পিঞ্জরে’র গফুর আর ‘আর্তনাদে’র জাফর-এরা সকলেই একই চরিত্রের-শিল্পরূপ, ঔপন্যাসিকের মানসপুত্রও বটে৷ তাঁর আরো যে একটি বড়মাপের শিল্পসাফল্য লৰ্য করা যায়, তা হচ্ছে কাহিনীর সঙ্গে চরিত্রের এবং চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ভাষার ব্যবহার৷ এৰেত্রে উপন্যাসিক স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জল এবং নিজস্ব বাণীভঙ্গী নির্মাণেও সফল৷

শওকত ওসমানের উপন্যাসের বিষয় আবর্তিত হয়েছে সমাজের সাধারণ মানুষকে ঘিরে৷ যদিও তাঁর প্রায় সব উপন্যাসেই ধনী- উচ্চবিত্তরা উপস্থিত৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের পাশে সাধারণ নিম্নবিত্ত-খেটে খাওয়া অসহায় মানুষের চরিত্রগুলিই প্রাধান্য পেয়েছে৷ এটাকে লেখকের সাবেক ব্যক্তি জীবনের চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটের যন্ত্রণায় জর্জরিত চিত্ত-বিৰোভের প্রতিধ্বনি হিসেবেও গ্রহণ করা যেতে পারে৷ সমাজের সঙ্গে শওকত ওসমানের সম্পর্ক খুব নিবিড়৷ প্রতিটি উপন্যাসের পটভূমি ও কাহিনীর সামাজিক সমস্যা ও সংগ্রামের চিত্র এই তথ্যের স্বাৰরবাহী৷

জীবনের অলিগলি আর সামাজিক সমাচার রূপায়ণে লেখক জীবন ঘনিষ্ঠ এবং বসত্মুনিষ্ঠও৷ তাই তাঁর উপন্যাসের চরিত্ররা শ্রেণীপ্রীতি মনস্ক৷ এই শ্রেণী সচেতনতা শওকত ওসমানের উপন্যাসেও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়, ঐতিহ্যানুগ বিষয়ের মাধ্যমে এসেছে৷ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও সত্যেন সেন মার্কসবাদ চর্চা করে অধিত জ্ঞানের আলোকে বাংলা সাহিত্যে শ্রেণী সচেতনতা আমদানী করেন৷ শওকত ওসমান এদের চে ব্যতিক্রম৷ তাঁর উপকরণ মার্কসবাদ নয়-দেশজ সমাজ ও জীবন ঘনিষ্ঠ উপলব্ধি৷ বিশ-তিরিশ দশকের সমাজের অবৰয়, নিম্ন শ্রেণীর মানুষেরা দুর্দশা আর ব্যক্তি জীবনের অর্থনৈতিক দৈন্যের নির্মম দংশন থেকেই গড়ে উঠেছে তাঁর উপলব্ধির মানচিত্র৷

শওকত ওসমানের উপন্যাসের আরেকটি উলেস্নখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মিথুনাসক্তি৷ বাংলা সাহিত্যে এই শিল্পচেতনার অপ্রতিহত গতিধারাটি গড়ে ওঠে কলেস্নাল যুগেই৷ তাঁর ‘জননী’, ‘ক্রীতদাসের হাসি’, ‘চৌরসন্ধি’, ‘দুই সৈনিক’, ‘জলাংগী’, ‘রাজসাৰী’ ও ‘পিতৃপুরম্নষের পাপ’-এ যৌনচিত্র বা মিথুনাসক্তি লৰ্য করা যায়৷ তবে এৰেত্রেও অবিসংবাদিত সত্য হচ্ছে, বাংলা সাহিত্যে শ্রেণী সচেতনতা আমদানীতে শওকত ওসমান যেমন কোন দর্শনে প্রভাবিত না হয়ে দেশজ বিষয় বৈশিষ্ট্য থেকে উপকরণ নিয়েছেন, তেমনি টমাস হার্ডি বা ফ্রয়েডের ব্যাখ্যায় তাঁর উপন্যাসের যৌনতা বিশেস্নষিত হলেও, কোনো কোনো উপন্যাসে যৌন চরিত্রের আধিক্য থাকলেও (রাজসাৰী) অবাসত্মব বা অপ্রাকৃত কোন যৌনচিত্র তাঁর উপন্যাসে নেই৷ এমন সব চরিত্রে তিনি যৌনচারের চিত্র আরোপ করেছেন, যারা পরিস্থিতির শিকার৷ যেমন ‘জননী’র দরিয়া বিবি, ‘দুই সৈনিকে’র চামেলী-সাহেলী, ‘পিতৃপুরম্নষের পাপ’ এর লালবানু এবং ‘রাজসাৰী’র সবুরন৷ অর্থাত্‍ সমসাময়িক সমাজের ঘটনা অবলম্বনে কাহিনী ও চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্যে যতটুকু প্রয়োজন, স্বাভাবিকতার বিচারে শওকত ওসমানের উপন্যাসে ততটুকু যৌনতাই এসেছে৷ নারী দেহের যৌনাংশের বর্ণনা, সম্ভোগ দৃশ্যের কামাতুর আলেখ্য রচনার মতো চিত্রের নামে অনাচার নেই৷ তাই এৰেত্রে নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, শওকত ওসমান কলেস্নাল যুগের উত্তরাধিকার বহন করেন না৷

তবে, নর-নারীর এই আদিম প্রবৃত্তি রূপায়ণে শওকত ওসমান সরল ও শালীন পথে অগ্রসর হলেও বাংলা সাহিত্যে যৌনচেতনা বিকাশের এই ধারাটি তাঁর মননকে গভীর ভাবেই স্পর্শ করেছিল৷ তাই দেখা যায়, কলেস্নাল পূর্ববতর্ী মিথুনাসক্ত সাহিত্যের অন্যতম রূপকারদের একজন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘মা’র যুগমনস্ক পরিণতিই যেনো শওকত ওসমানের ‘জননী’৷ অথবা নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তের শুভার সঙ্গে শওকত ওসমানের ‘রাজসাৰী’র সবুরনের জীবন প্রবাহ যেনো একই সূত্রে গ্রথিত৷ পার্থক্য যে টুকু তাহচ্ছে, শুভা শিৰিতা৷ আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের জন্য সকল কুসংস্কার বন্ধনকে উপেৰা করে সে বহিমর্ুখী হয়েছে৷ তার কাছে বিশুদ্ধ সতীত্বের চেয়ে আর্থিক, সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মর্যাদা অনেক বেশি৷ পৰানত্মরে সবুরন অশিৰিতা-কিন্তু তার কাছেও ভালো খাওয়া পরা, আর্থিক স্বাবলম্বন ইত্যাদি অনেক বেশি মূল্যবান সম্ভ্রমের চেয়ে৷

৫. আগেই উলেস্নখ করা হয়েছে যে, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর বাঙালি মানসে স্বাজাত্যবোধ বিকাশের জন্য অপরিহার্য ছিল একটি সুনির্দিষ্ট তাগিদ৷ ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রম্নয়ারিতে ভাষা আন্দোলনের রক্তৰয়ী পরিসমাপ্তিটি তাদের সামনে সেই তাগিদ তুলে ধরে৷ এর ফলে বাঙালি লেখক-বুদ্ধিজীবী সমাজে প্রাণ সঞ্চারিত হয়৷ এ ধরনের একটি গণচেতনার মধ্য দিয়ে বিকশিত হবার ফলে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে উঠে এলেও, এমনকি উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা শওকত ওসমানের রচনায় উপস্থিত থাকলেও বিশাল সৃষ্টিকর্মের অভিযাত্রায় নিজেকে তিনি শামিল করেছেন সমাজের অসহায়, শোষিত, সম্বলহীন, ৰুধাকাতর, শ্রমজীবী নিরন্ন মানুষের কাতারে৷ তাঁর উপন্যাসের বিখ্যাত চরিত্ররা সব অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর নিম্নশ্রেণীরই মানুষ৷

এই সব অসহায় মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, নিরাপত্তা ও বাঙালি জাতির পরাধীনতার শৃঙ্খল লাঘবের সংগ্রামেও শওকত ওসমান ছিলেন প্রথম কাতারের সৈনিক৷ সর্বত্রই তাঁর একই চেতনা ক্রিয়াশীল-শক্তিমানের সঙ্গে শক্তিহীনের, ন্যায়ের সঙ্গে অন্যায়ের সংঘাত এবং তাঁর পরিণতি৷ সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী চোর, ডাকাত ও ভাড়াটে গুন্ডাদের জীবন চরিত্র বিশেস্নষণের মাধ্যমে সভ্য সমাজের অসভ্য ঘটনাবলীর কদাচার মুখোশ উন্মোচন করতেও আপোষহীন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন শওকত ওসমান৷

সাম্প্রদায়িক গোঁড়াদের স্বরূপ উন্মোচন, কুসংস্কার বিদ্বেষ, স্বৈরশাসন-নিপীড়নের প্রতিবাদ আর গণতান্ত্রিক চেতনাবোধের বিকাশেও তিনি অসামান্য প্রতিভার স্বাৰর রাখেন৷ আর এভাবেই শওকত ওসমান হয়ে ওঠেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম নৰত্র৷ তাঁর সূচনা ও সমাপ্তির মানসিক পরিব্রাজন নানা ঘাটে বিশ্রানত্ম, বিসত্মৃত ও সংঘাত ৰুব্ধ হলেও যথার্থ ভাবেই তিনি স্বসমাজকে উদ্বুদ্ধ করেন জাতিসত্তার শেকড় অন্বেষণে৷ বিশাল সাহিত্য কর্মের ভান্ডার সৃজন করেছেন শওকত ওসমান৷ কালকে ধারণ করে নির্মাণ করেছেন কালাতীত চেতনা৷ তেমনি বাঙালি সংস্কৃতির ভবিষ্যত্‍ যাত্রার উপাদেয় সব ঐতিহ্য-পাথেয় দ্বারা স্বসমাজ ও জাতিকে দিয়ে গেছেন পথের নির্দেশ৷ এভাবেই এই মহান কথাশিল্পী হয়ে উঠেছেন বাংলা সাহিত্যের পথিকৃত্‍-নৰত্র এবং সমকালীন সমাজ প্রগতির সংগ্রামের পুরোধ লেখক-ঋষি মনীষা৷ তাঁর নবম মৃতু্য বার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি৷ ০

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.