কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফ অনূদিত ফেরদৌসী’র শাহনামা – মোহাম্মদ আবদুল হাই

5985_1

ইরান শব্দটি আভেসত্মায় উলিস্নখিত ইধরহটভট শটণনট শব্দ দুটির সরল ও সংৰেপ রূপ৷ এর অর্থ হলো আর্য জাতির আদি বাসভূমি৷ আর পারস্য শব্দটি গ্রহণ করা হয়েছে ‘পারসা’ (কীলকাকৃতি উত্‍কীর্ণলিপিতে প্রাপ্ত) শব্দের গ্রিক রূপ পারসিস শব্দ থেকে৷ এর অর্থ হলো ফার্স প্রদেশ৷ অ্যাকিমিনীয় রাজশক্তির প্রথম উত্থান এ ফারস্ প্রদেশ থেকেই৷ এ প্রদেশেই তাদের রাজধানী ছিল বলে পারস্য শব্দটি একটু ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং সমগ্র দেশকেই বোঝায়৷ বিশ্ব সাহিত্য সভায় ইরানি বা পারসীয় সাহিত্যের স্থান অতি উচ্চে৷ এ সাহিত্যের রূপ-মাধুর্য বিশ্বের সাহিত্য পিপাসুদের জন্য এক চিরনত্মন উত্‍সধারারূপে বিরাজ করছে৷ বিশেষত সাদী, হাফিজ, রম্নমী, জামী, ফেরদৌসী খৈয়ামের কাব্যকীর্তি যখন অনুবাদের মাধ্যমে পাশ্চাত্য জগতে পরিবেশিত হলো, তখন জগত্‍ বিমোহিত হয়ে গেল৷ আর তাঁরা হলেন বিশ্ববরণ্য অমর কবি বলে স্বীকৃত৷

২.

ফারসি সাহিত্যের গৌরবময় যুগের সময়কাল প্রায় ৩০০’ বছর৷ এই ৩০০’ বছরে বিশ্ব সাহিত্যে অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন এমন কবি-সাহিত্যিকের সংখ্যায়ও ফারসি সাহিত্যে নগণ্য নয়৷ গৌরবময় যুগের কবিদের মধ্যে সর্বাগ্রে যাঁর নাম করতে হয় তিনি হলেন ইরানের মহাকবি হাকিম আবুল কাসেম ফেরদৌসী৷ তিনি বিখ্যাত কথাশিল্পী ও ইরানের গৌরবের প্রতীক৷ ফেরদৌসীর জন্ম হয় খোরাসানের তুস নগরের নিশাপুরে ৯৪১ খ্রিস্টাব্দে৷ তাঁর জীবনী সম্পর্কে প্রাচীনতম উত্‍স হিসেবে ইতিহাসবিদেরা যে-গ্রন্থটির কথা উলেস্নখ করেন সেটি হচ্ছে নিযামি আরম্নযির তাযকেরায়ে চাহার মাকালে (১১৫৫ খ্রি.)৷ এটি রচিত হয় ফেরদৌসীর মৃতু্যর ১৫০’ বছর পর (৫৫০ হিজরি)৷ সাসানীয় শেষ সম্রাট ইয়াজদির্জাদ (৯১৪-৯৪৩ খ্রি.) পারস্যের রাজা-বাদশাহর কাহিনী, জনশ্রম্নতি, ঘটনা ইত্যাদি সংগ্রহ করে সিয়ারম্নল মুলুক অথবা বোসত্মান নামা নামে অভিহিত করেন৷ দশম শতাব্দীতে সামানীয় সম্রাট আবু মনসুর সিয়ারম্নল মুলুক অথবা বোসত্মাননামা সংশোধন করে ‘শাহনামা’য় রূপ দেয়ার জন্য দেশের বিভিন্ন পণ্ডিত ব্যক্তিদের নিযুক্ত করেন৷ কয়েক বছরে গ্রন্থটি সমাপ্ত হলে আল-মোরি নামক জনৈক ঐতিহাসিক দ্বারা সম্পাদনা করে তা গদ্যে লিখিয়ে নেন৷ কবি দাকিকির ওপর ন্যসত্ম করা হয় এর কাব্যরূপ দেয়া৷ কিন্তু দাকিকি তাঁর কৃতদাসের হাতে নিহত হলে এই দুরূহ কাজ অসমাপ্ত থেকে যায়৷ কারণ মাত্র দুই হাজার লাইন সমাপ্ত করার পর পরই তাঁর মৃতু্য ঘটে৷ তখন এই দায়িত্ব অর্পণ করা হয় কবি উনসুরির ওপর৷ উনসুরি যখন নিজস্ব ইচ্ছায় ফেরদৌসীকে সুলতান মাহমুদের কাছে হাজির করলেন এবং তাঁর কাব্য-প্রতিভা সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন তখন সুলতান মাহমুদ সম্পূর্ণ শাহনামার কাব্যরূপ দেয়ার ভার অর্পণ করলেন ফেরদৌসীকে৷

ফেরদৌসীর শাহনামা রচনা সমাপ্ত হয় ১০০৯ খ্রিস্টাব্দে৷ ফারসি গদ্যের প্রথম পদৰেপ শাহনামা৷ দশম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ফারসি গদ্যের উত্‍কর্ষ সাধিত হয় শাহনামার সংস্কার সাধন কেন্দ্র করে৷ ফেরদৌসির সমকালীন কবিদের মধ্যে বাংলাদেশে কোনো কবির সাহিত্য প্রতিভার নিদর্শন আমরা খুঁজে পাই না৷ জঙ্গনামা কাব্য (১৭২৩ খ্রি.) রচয়িতা কবি হেয়াত মামুদের আবির্ভাব ঘটে শাহনামা রচনার ৭০০’ বছর পর৷ তবে বৌদ্ধ পণ্ডিত শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর (৯৮২-১০৫৩) ছিলেন ফেরদৌসির সমসাময়িক৷

৩.

কৃত্তিবাস ওঝার (১৩৮১-১৪৬১) রামায়ণ অনুবাদের মধ্য দিয়ে বাংলায় মহাকাব্য অনুবাদের সূত্রপাত ঘটে৷ বাঙালির আবেগ, অনুভূতি ও রম্নচির দিক লৰ্য রেখে সর্বজনবোধ্য পদ্যে মূল সংস্কৃত রামায়ণের ভাবানুবাদ করায় কৃত্তিবাসী রামায়ণ ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে৷ শ্রীরামপুরের খ্রিস্টান মিশনারিদের কতর্ৃক এটি প্রথম মুদ্রিত হয় ১৮০২-১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে৷ এরপর সতেরো শতকে কাশীরাম দাসের (১৬২২-১৭৬০) অনূদিত সংস্কৃত মহাকাব্য মহাভারত বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে আরও এক অসাধারণ কীর্তি৷ কাশীরামের এই মহাভারতও শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে প্রথম ছাপা হয় অনুবাদকের মৃতু্যর পর ১৮০১-০৩ খ্রিস্টাব্দে৷ এই দুই অনুবাদকের পর বাংলায় মহাকাব্য অনুবাদের ইতিহাসে, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে যিনি এই ধারায় ঐতিহাসিক স্থান অধিকার করে নিয়েছেন তিনি কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফ (১৯১৯-১৯৮৭)৷

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে সংস্কৃত ভাষায় বাল্মীকি রচিত ২৪ হাজার শেস্নাক সমন্বিত রামায়ণ গার্হস্থ্য জীবনচিত্রের মহাকাব্য আর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস রচিত ২৬ হাজার শেস্নাক সমন্বিত মহাভারত বহিরঙ্গচারী জীবনচিত্রের মহাকাব্য৷ গ্রিক কবি হোমার রচিত ইলিয়াড ও অডিসি নিয়তিনির্ভর মানবগাথা৷ কিন্তু শাহনামা ইরানি জাতীয়তার উজ্জীবনের মহাকাব্য৷ বাল্মীকির রামায়ণ, কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের মহাভারত আর হোমারের ইলিয়ড ও অডিসি- চারখানি প্রাচীনতম মৌলিক মহাকাব্যের অন্যতম৷ জাতীয় মহাকাব্য রচনার জগতে ফেরদৌসী সর্বকনিষ্ঠ হলেও সর্বাধুনিক৷ হাজার বছর আগে রচিত ৬০ হাজার শেস্নাক সমন্বিত ফেরদৌসীর মহত্‍ সৃষ্টি শাহনামা বিশ্ব সাহিত্যে এক অসাধারণ মহাকাব্য৷

বিগত একশ’ (১৯০০-২০০০) বছরের অনুসন্ধানে আমরা আরবি, উদর্ু, হিন্দি, চীনা, জাপানিজ, ইন্দোনেশিয়ান, মালয়েশিয়ান, ফরাসি, গ্রিক, জার্মান ও ইংরেজিসহ বিশ্বের প্রায় ৩৫টি ভাষায় শাহনামা অনুবাদের সন্ধান পেয়েছি৷ এসব অনুবাদ অধিকাংশই অপূর্ণাঙ্গ; খণ্ডিত বা নির্বাচিত অংশবিশেষ৷ ইরানের বাইরে ইউরোপীয়দের মধ্যে ইংরেজি ভাষায় শাহনামার পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করেছেন অধ্যাপক রম্নবেন লেভি৷ লন্ডন থেকে প্রকাশিত চবত্‍ংরধহ ঐবত্‍রঃধমব-এর অনত্মভর্ুক্ত অধ্যাপক লেভি অনূদিত ঞযব ঊঢ়রপ ড়ভ ঃযব শরহমং সমগ্র পাশ্চাত্য জগতে পাঠকের কাছে সুপরিচিত৷ অধ্যাপক লেভির অনুবাদ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে৷ উলেস্নখ্য কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফ অনূদিত পূর্ণাঙ্গ বাংলা শাহনামা প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে৷ কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফের বাংলা অনুবাদ প্রকাশের ১০ বছর পূর্বে অধ্যাপক লেভির ইংরেজ অনুবাদ প্রকাশিত হয়৷

শাহনামার ভাষা ক্ল্যাসিকাল ফারসি৷ অধ্যাপক রম্নবেন লেভি এই ক্ল্যাসিকাল ফারসি থেকেই ইংরেজি অনুবাদ করেন৷ কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফও বাংলায় তাই করেছেন৷ উভয়েই অনুবাদ করেছেন গদ্যে৷ বাংলা অনুবাদক কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফ শাহনামার ভূমিকায় বলেছেন : ‘অনুবাদকের জন্য আমি শাহনামার ইরানি সংস্করণটি ব্যবহার করেছি৷ তবে যেখানে সংশয় দেখা দিয়েছে সেখানে ভারতীয় সংস্করণ আলোচনা করে উপকৃত হয়েছি৷’ ভাষানত্মরে গাম্ভীর্য রৰার প্রয়োজনে অনুবাদক প্রচুর তত্‍সম শব্দ ব্যবহার করেছেন৷ ফলে বীররস প্রধান এই বিশ্ব-বিশ্রম্নত মহাকাব্যের বাংলা অনুবাদেও আমরা পাই ছন্দ-মাধুর্যের অনুপম শিহরণ৷ এরপরেও অনুবাদক দীর্ঘ ৪০ পৃষ্ঠার ভূমিকায় পাঠকের কাছে শাহনামার মূল উপজীব্য, ইতিহাস ও কিংবদনত্মি উপস্থাপন করেছেন যা এই বৃহত্‍ অনুবাদ গ্রন্থের সর্বাধিক আকর্ষণীয় অংশ৷ ফেরদৌসী শাহনামা রচনা শুরম্ন করেছিলেন ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে৷ শাহনামা রচনা যখন শেষ হয় তখন ফেরদৌসীর বয়স ৮০ বছর৷ ৩০ বছর ধরে তিনি শাহনামা রচনায় ব্যাপৃত ছিলেন৷

কোন মহত্‍ স্রষ্টার সৃষ্টি কত বিরাট, মহত্‍ গভীরতাচারী তা উপলব্ধি ও অনুভব করার সবচেয়ে নিবিড় সুযোগ লাভ করেন তার অনুবাদক৷ বাঙালি সমাজের মধ্যে মনিরউদ্দীন ইউসুফই সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি যিনি শাহনামার মতো এক কালজয়ী সৃষ্টিকে আদানত্ম আতুস্থ করার সুযোগ লাভ করেছেন৷ বাঙালি পাঠকের কাছে শাহনামা কোনো দূরশ্রম্নত নাম নয়৷ ইরানের জাতীয় মহাকবি ফেরদৌসীও (৯৪১-১০২৫) নন কোনো অপরিচিত কবি৷ সোহরাব-রম্নসত্মমের কাহিনী, সর্পস্কন্ধ জোহাকের কাহিনী কিংবা শাহনামা রচনার পর সুলতান মাহমুদ কতর্ৃক কবির পুরস্কৃত না হওয়ার কাহিনী এ দেশের স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুসত্মকে চিরকাল সমাদৃত৷ তাই শাহনামা ও মহাকবি ফেরদৌসী বাঙালি পাঠকেরও দুটি প্রিয় প্রসঙ্গ৷

কিংবদনত্মিনির্ভর শাহনামার আখ্যানভাগে কখনো কোনো রাজা হাজার বছর রাজত্ব করেন কিংবা ৩০০ বছর ধরে মহাবীর রম্নসত্মম ইরানকে শক্রমুক্ত রাখেন৷ তাঁদের এই আয়ুসীমা কাল্পনিক সন্দেহ নেই; কিন্তু তাঁদের জয় বা পরাজয়ে হাত নেই কোন অলৌকিক শক্তির৷ এই কারণে শাহনামা ইহলৌকিক মহাকাব্য৷ শাহনামা আরো ইহলৌকিক মহাকাব্য এজন্য যে, চরিত্র চিত্রণ, ব্যাপ্তি, সমুত্থিত বিবরণ, শৌর্য-বীর্যের প্রকাশ, বুকভাঙা বেদনা, ঔদার্য ও করম্নণার মানবিক উদ্ভাসনে এই কাব্য এমন এক বিরাট চিত্রশালার দ্বারোন্মুক্ত করে যার অনুরূপ যে কোনো দেশের সাহিত্যে দুর্লভ৷

মনিরউদ্দীন ইউসুফ বাংলায় শাহনামার অনুবাদ করেছেন গদ্যে৷ গদ্যে অনুবাদ করতে গিয়েও তিনি নিষ্ঠাবান থেকেছেন কাব্যের কাব্যিক সৌকর্যের প্রতি৷ সাধারণ গদ্য এ নয়; যদিও অনত্ম্যমিল বা ব্যাকরণসিদ্ধ প্রথাগত ছন্দরীতি ব্যবহৃত হয়নি তাঁর বাকস্কন্দে৷ শাহনামার দুই ‘মিসরা’ বা চরণের শেস্নাকে যে নির্দিষ্ট ছন্দ বা মাত্রারীতি, বাংলা অনুবাদে তার কোনোরূপ অনুসরণের প্রশ্ন নেই৷ দুই চরণের একটি বয়েত্‍ বা শেস্নাকের বাংলা অনুবাদ তিনি দুই চরণের মধ্যেই সীমিত রেখেছেন প্রায় সর্বৰেত্রে; অল্প ৰেত্রে অনধিক চার চরণ পর্যনত্ম তা প্রসারিত হয়েছে৷ কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা, মুক্ত কবিতা বা ফ্রি ভার্সের ছন্দোময় প্রবাহ তিনি সঞ্চার করেছেন তাঁর বাক্বিন্যাসে৷ তাই এই অনুবাদকে তিনি টানা গদ্যের মত না সাজিয়ে সাজিয়েছেন অসম চরণে৷

শাহনামা প্রধানত বীররসপ্রধান৷ তবে নিসর্গ বর্ণনা, প্রেম কাহিনীতে বা ঈশ্বর বন্দনায় অপূর্ব কাব্যরসে ঝঙ্কৃত৷ কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফের অনুবাদে আমরা এ সব ভিন্ন দেশীয় কাব্যরস উপভোগ করি৷ মূল ফারসির সঙ্গে তুলনায় সাধ্য ও সুযোগ না থাকলেও পাঠক হিসাবে আমরা ফেরদৌসীর কল্পলোকের কাছাকাছি উপস্থিত হই! মনিরউদ্দীন ইউসুফ আমাদের বাঙালি সমাজকে এই কল্পলোকে পেঁৗছতে ও তৃপ্তি পেতে সাহায্য করে অবিস্মরণীয় হয়েছেন৷ তাঁর অনুবাদ কৃতিত্ব আর স্বীকৃতির অপেৰা রাখে না৷ কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফের অনুবাদ কতটা আৰরিক, মূল থেকে কতটা সরে গেছেন বা যাননি, ভাবটি ঠিকমতো ধরা পড়েছে কি না- এসব বিবেচনা গুরম্নত্ব না দিয়ে শাহনামার মতো বৃহদাকার এপিক প্রাচীন ভাষা থেকে অনুবাদের মাধ্যমেই বাংলার অঙ্গনে এলো এটাই পরম লাভ ও সন্তুষ্টির কথা৷ কবি মনিরউদ্দীনের ‘শাহনামা’র অনুবাদ সম্পর্কে বাংলা একাডেমীর মনত্মব্য- ‘বিপুল ভাণ্ডার থেকে এই অতি বৃহত্‍ মহাকাব্যের চির দেদীপ্যমান মানিকটিকে বাংলার ঘরে ঘরে পেঁৗছে দেয়ার মহাকীর্তি রেখে গেছেন৷’

শাহনামার রচনার কিংবদনত্মিরূপে আমরা জানি, ফেরদৌসী গজনীর অধিপতি সুলতান মাহমুদের ফরমায়েশে তাঁর এই মহাকাব্য রচনায় হাত দিয়েছিলেন৷ গ্রন্থেরমধ্যে বহুবার সুলতানের প্রশংসা কীর্তিত হয়েছে৷ বলাও হয়েছে, কবি সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতায় নিরাপত্তার মধ্যে সানন্দে কালযাপন করেছেন, তবুও গ্রন্থখানি যে সুলতান মাহমুদের ফরমায়েশে রচিত হয়নি তার প্রমাণ গ্রন্থেরমধ্যেই রয়েছে৷ বলা হয়েছে, কবি শাহনামা রচনা শুরম্ন করার পর তাঁর এক বন্ধু তাঁকে উপদেশস্থলে বলেছিলেন, রাজ-রাজড়াদের এই কাহিনী কোনো নরপতিকে উত্‍সর্গ করাই শোভা পায়৷ বন্ধুর উপদেশ কবি শিরোধার্য করেছিলেন৷ ইতিহাসও বলে, সুলতান মাহমুদের সভায় ফেরদৌসি সাদরে গৃহীত হয়েছিলেন৷ অনুবাদক মনিরউদ্দীন ইউসুফ এ প্রসঙ্গে মনত্মব্য করেন :

‘এ সংবাদ আমাদের এ বিষয়ে নিশ্চয়তা দান করতে পারে না যে, ফেরদৌসি সুলতান মাহমুদেরই আদেশে শাহনামা রচনা করেছিলেন৷ তবে আমরা এতটুকু বুঝতে পারি যে, সুলতানের রাজসভায় একজন বিশিষ্ট কবিরূপে ফেরদৌসী মাহমুদের হাত থেকে প্রচুর পারিতোষিকের আশা করেছিলেন৷ কিন্তু আশানুরূপ পারিতোষিক তিনি পাননি’ (শাহনামা : ভূমিকা)৷

তাই দেখা যায়, মহাকবি ফেরদৌসীর এই আশাভঙ্গের অনুতাপ ও তীব্র ৰোভ শাহনামার শুরম্নতেই সঞ্চারিত হয়েছে৷ ফেরদৌসী গভীর আতুপ্রত্যয় নিয়ে বলছেন:

‘দুনিয়া যতদিন থাকবে ও তাতে অবস্থান করবেন নরপতিগণ,/ আমার বাণী তাঁদের কাছে পর্যনত্ম গিয়ে পেঁৗছবে৷/ তাঁরা বলবেন, তুস নগরের অধিবাসী অভিজাত ফেরদৌসী/ এই ‘শাহনামা’ মাহমুদের নামে উত্‍সর্গ করেননি৷/ জেনে রাখ, নবী ও আলীর নামেই উত্‍সর্গ করেছি এই ‘নামা’/ বহু অর্থময় বাণীর মুক্তা আমি এতে গ্রথিত করেছি৷/ যদি পৃথিবীতে ফেরদৌসীর জন্ম না হতো,/ তবে তরম্নতে উদ্গত হোত না বদান্যতার কিশলয়৷/ যদি এই কাহিনীর দিকে আমি দৃষ্টিপাত না করতাম,/ তবে তা মিথ্যাবাদীদের দ্বারা অন্যপথে পরিচালিত হতো৷

শাহনামা সম্পর্কে মহাকবি ফেরদৌসী আরও বলছেন :

‘এই কাহিনীতে আমি ত্রিশ হাজার/ শেস্নাকের পানপাত্র আবর্তিত করেছি/ তাতে কীর্তিত হয়েছে রণৰেত্রের রীতি-নীতি/ আমি এতে বর্ণনা করেছি তীরধনুক ও পাশের কথা/ প্রহরণ ও তরবারির কার্যকারিতার কথা এতে ব্যক্ত হয়েছে/ এতে আছে, বর্ম, অনুত্রাচ, ও শিরস্ত্রাণ

আছে, অরণ্য ও সমুদ্র, আছে মরম্নভূমি ও বহতা নদী;/ নেকড়ে, সিংহ, হসত্মী ও ব্যাঘ্রের কথাও এখানে রয়েছে/ দৈত্য, আজদাহা ও নক্রের রূপকথাও স্থান পেয়েছে এতে৷’

শাহনামায় বিবৃত হয়েছে চার হাজার বছরের ইরানের কথা- কিংবদনত্মি, লোকবিশ্বাস এবং ইতিহাস৷ ঊনচলিস্নশ রাজা, শতাধিক মহত্‍ বীর এবং সহস্রাধিক মানব-মানবী শাহনামা কাব্যের উজ্জ্বল চরিত্র৷ শাহনামা কেবল রাজা বাদশাদের কথা নয়, কেবল বীরের৷

যুদ্ধপ্রানত্মরের বিবরণ নয়, দেও-দৈত্য সংহারের কাব্য নয়- শাহনামা বিচিত্র মানব-মানবীর কামনা-বাসনা, আনন্দ-বেদনা আর অশ্রম্নধারার মহান কাহিনী৷ যাঁরা প্রধান তাঁরা যেমন শাহনামাতে সমুজ্জ্বল হয়ে আছেন, তেমনি অপ্রধান তাদেরও কর্মকাণ্ডে মুখরিত হয়ে আছে এই কাব্য৷ মহাকবি ফেরদৌসী বলেছেন, ‘দীর্ঘ ৩০ বছর সাধনা করে এ পারসি কাব্যের মাধ্যমে আমি ইরানকে পুনরম্নজ্জীবিত করে গেলাম৷ অনেক অর্থময় বাণীর মণিমাণিক্য দিয়ে শাহনামা রচনা করেছি আমি৷’ এমনি করে অশেষ শ্রমশীলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফও ইরানের মহাকবি ফেরদৌসী ও তাঁর শাহনামাকে বাঙালির হৃদয়-মানসে নিত্যপিপাসু করে তুললেন দীর্ঘ ১৭ বছরের নিবিষ্ট সাধনায়৷ কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফের এই অনুবাদ কীর্তির মাধ্যমেই বাঙালি পাঠক সমাজ লাভ করল বিশ্ব সাহিত্যের অমর মহাকাব্যের আস্বাদন৷

কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফ তাঁর অনূদিত শাহনামার ভূমিকায় বলেছেন :

‘জীবন ও জগত্‍ ব্যাপকাকারে চিত্রিত হলেও হোমারের ইলিয়ড-অডিসি কিংবা রামায়ণ-মহাভারত যে ধরনের মহাকাব্য, শাহনামা সে ধরনের মহাকাব্য নয়৷ ইলিয়ড-অডিসি ও রামায়ণ মহাভারত-এর নিয়ামকশক্তি কাল নয় স্থান; সেখানে গ্রিস ও ট্রয়, অযোধ্যা ও লঙ্কা,

হসত্মিনাপুর ও কুরম্নৰেত্রকে কেন্দ্র করেই ঘটনা আবর্তিত হয়েছে৷ একের পতনে অন্যের মহিমা সেখানে ভাস্বর৷ অন্যপৰে শাহনামাকে নিয়ন্ত্রিত করছে মহাকাল৷ যে কালের বহমান স্রোতে ঘটনা ও স্থান মুহূর্তের জন্য উদ্ভাসিত হয়ে বিলীন হয়ে যায় সেখানে রাজা ও রাজবংশের উত্থান-পতন, বীরের শৌর্য ও সম্রাটদের মহানুভবতায় এক মূল্যবোধের উদ্ভব ঘটেছে এবং শেষ পর্যনত্ম তা মানুষের হাতে আসছে উত্তরাধিকার সূত্রে ইতিহাসেরই শিৰা হয়ে৷

জানা যায় যে, কবি যৌবনেই তাঁর জন্মভূমিতে ইরানের প্রাচীন রাজাবাদশাহের এক কাহিনী লিখতে শুরম্ন করেন গদ্যে এবং সম্ভবত তা সম্পূর্ণও করেন৷ তারপর কবি দাকিকির অনুবর্তিতায় ফেরদৌসী তাঁর কাহিনীকে ছন্দোবদ্ধ করার অনুপ্রেরণা লাভ করেন৷ দাকিকির শাহনামা অধিক দূর অগ্রসর হওয়ার পূর্বে যৌবনেই তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হন৷ ফেরদৌসী যে শাহনামা গদ্যে রচনা করেছিলেন অথবা তার খসড়া তৈরি করেছিলেন তা সম্ভবত আলেফলায়লার (আরব্যোপন্যাস) ছাঁচে পরিকল্পিত হয়েছিল৷ সুতরাং দাকিকির থেকে ‘আলো লাভ করে’ কবি স্বীয় জন্মভূমিতে বসেই বর্তমান ‘শাহনামা’ রচনায় হাত দেন একথা নিশ্চিত বলে ধরে নেয়া যায় এবং কেবল প্রবীণ বয়সেই সুলতান মাহমুদের উজির হাসান মৈমুন্দির সহায়তায় কবি গজনীর রাজসভায় গৃহীত হন৷ বলা আবশ্যক সুলতান মাহমুদের রাজসভা গুণীজন দ্বারা অলকৃত ছিল৷ মহাপণ্ডিত আল বেরম্ননী ছিলেন সুলতানের সভার মহত্তম মণি, আস্জাদী, ফররম্নখী, উনসুরি নামে আরো কয়েকজন কবিও সুলতানের সভা আলো করে রেখেছিলেন৷

সুলতান মাহমুদের ওপর ফেরদৌসীর লেখা একটি নিন্দামূলক কবিতাকে ঘিরে অনেক মুখরোচক কাহিনীর উদ্ভব হয়েছে৷ এই কবিতাটি বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে খুবই পরিচিত৷ শাহনামার শুরম্নতে সুলতান মাহমুদের অপবাদসূচক এই কবিতাটি বেশ দীর্ঘ৷ পাঠক এখানেও পেতে পারেন কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফের সমগ্র শাহনামার মনোজ্ঞ অনুবাদের স্বাদ৷ কবিতাটির অংশবিশেষ এখানে উদ্ধৃত করছি :

‘হায়, রাজ্যজয়ী মাহমুদ, তোমার জন্য দুঃখ হয়/ মানুষকে যদি ভয় নাই কর, তবে অনত্মতঃ খোদাকে তো ডরাও৷/ তোমার পূর্বেও দুনিয়ায় রাজত্ব করে গেছেন বহু বাদশা,/ তাঁরা সবই ছিলেন রাজ্যাধিপতি ও মুকুটধারী৷/ তাঁরা মর্যাদায় নিঃসন্দেহে তোমার চাইতে উচ্চতর ছিলেন,/ সম্পদ, সৈন্য, মুকুট সিংহাসন তাঁদের মহত্তর ছিল৷/ তাঁদের কর্ম কল্যাণ ও সততাকে আশ্রয় করেই বিরাজ করতো,/ নীচতা ও ৰুদ্রতা তাঁদের ব্যক্তিত্বকে খর্ব করেনি৷/ অনুগত জনকে তারা বদান্যতার দ্বারা তুষ্ট করতেন,/ পবিত্র বিশ্ব-প্রভুর উপাসনা ছিল তাঁদের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য৷/ কালের মধ্যে তাঁরা যশঃ ও সুনামের সন্ধানী ছিলেন,/ এবং সেই অনুসন্ধানের পরিমাণ ছিল মঙ্গলময়৷/ অপরপৰে যে নরপতি স্বর্ণমুদ্রার লালসায় বন্দী ছিল,/ জ্ঞানীজনের কাছে তাকে হতে হয়েছে অবজ্ঞার পাত্র৷/ হে সুলতান! যদিও ধরিত্রী এখন তোমরাই শাসনাধীন,/ তবুও, জিজ্ঞাসা করছি, এই নির্লজ্জ বাক্য কেন তুমি উচ্চারণ করলে?/ আমার প্রখর ব্যক্তিত্ব কি তোমার চোখে পড়েনি?/ আর সেই সঙ্গে তুমি কি ভেবে দেখনি, আমার রক্ত-পিপাসু/ তরবারির কথা?

উদ্ধৃত অনুবাদে পাঠক হৃদয়ে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে এক তেজদীপ্ত চিত্রপট৷ যেখানে কবির প্রাণৈশ্বর্যের অপরিমেয় আতুশক্তির দার্ঢ্য কীভাবে সুলতানের দুর্লঙ্ঘ ৰমতাকে তুচ্ছজ্ঞান করে৷ কবির কাব্য-ঐশ্বর্যের কাছে রাজশক্তির দৌরাতু্য কতটা মস্নান হয়ে যেতে পারে তার উত্‍কৃষ্ট দৃষ্টানত্ম এই অনূদিত পঙ্ক্তিমালা৷ 

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.