আজ ২২শে শ্রাবণ

7748_1

আজ বাইশে শ্রাবণ৷ বিশ্ব কবি সম্রাট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৬৬তম মহাপ্রয়াণ দিবস৷ ১৯৪১ সালের এই দিনে বর্ষণসিক্ত পরিবেশে কবির দেহাবসান ঘটে৷ শ্রাবণের বর্ষণধারা সেদিন শোকবিহ্বল বাঙ্গালীর অশ্রম্নধারা হয়েই বুঝিবা ঝরে পড়েছিল৷ রবীন্দ্র-প্রয়াণে শোকার্ত বিদ্রোহী কবি কাজী নজরম্নল ইসলাম বিশ্বকবির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অসত্মপারের কোলে/ বাংলার কবি, শ্যামবাংলার হৃদয়ের ছবি তুমি চলে যাবে বলে/ শ্রাবণের মেঘ ছুটে এলো দলে দলে৷’


রবীন্দ্রনাথের তিরোধানের মধ্য দিয়ে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের সবচেয়ে প্রদীপ্ত নৰত্রটি খসে পড়ে সেদিন৷ বিধাতা-পুরম্নষ এ যাবত্‍কাল যত বাঙ্গালী সৃষ্টি করেছেন তাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথকে অনায়াসেই শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন করা চলে৷ গান-কবিতা-ছোটগল্প-উপন্যাসসহ সাহিত্যের সকল শাখাতেই তিনি অবাধে এবং প্রচণ্ড দাপটের সঙ্গে বিচরণ করেছেন৷ তাছাড়া চিত্রকলা ও বিভিন্ন দেশ হিতৈষণামূলক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন তিনি৷ বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে তিনি মহিমান্বিত করেছেন, গৌরবের শীর্ষদেশে পৌঁছে দিয়েছেন৷ বলতে গেলে তার একক প্রচেষ্টায় বাংলাসাহিত্য বিশ্বসাহিত্য সভায় মূল্যবান আসন লাভ করতে পেরেছিল৷ আশ্চর্য বৈচিত্র্যময়তায় উদ্ভাসিত করেছেন তিনি আমাদের ভাষা ও সাহিত্যকে৷ মাইকেল মধুসূদন ৰুরের দাপটে মেদিনী কাঁপিয়ে বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে একদিন জলাবদ্ধরূপ থেকে মুক্তি দিয়ে তাকে এক বহমান স্রোতস্বিনীতে রূপানত্মরের প্রতিশ্রম্নতিতে ভরপুর করে তুলেছিলেন৷ রবীন্দ্রনাথই এতে দামোদরের খরস্রোত এবং বেগবতীরূপ সঞ্চার করেন৷ তিনিই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে অতন্দ্র তরঙ্গমালার ন্যায় কলমন্দ্রমুখর করে তোলেন৷ রবীন্দ্র সাহিত্য তাই শুধু বিচিত্রগামীই নয়, সর্বত্রগামীও হয়ে উঠতে পেরেছিল৷ বাঙ্গালীর চিনত্মা-চেতনায় আধুনিকতার বোধতো বটেই এমনকি সুরম্নচি, ঔচিত্যবোধ সঞ্চার এবং মানবিক বোধে বাঙ্গালীকে উচ্চকিত করতে রবীন্দ্রনাথ নিরনত্মর প্রয়াস-প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন৷ আমাদেরকে প্রকৃতির প্রতি চোখ মেলে তাকাতে শিখিয়েছেন তিনি৷ চোখ-কান, হৃদয়-মন উজাড় করে প্রকৃতির প্রতি সমর্পণের মাধ্যমে মানবহৃদয়কে শানত্ম-সমাহিত এবং আনন্দে উদ্বেল করে তোলার শিৰা দেন কবি৷ তিনি বললেন, ‘আমি চোখ মেললুম আকাশে, জ্বলে উঠল আলো৷’ আরও বললেন, ‘আমার চেতনার রঙ্গে পান্না হোল সবুজ চুনি উঠল রাঙ্গা হয়ে৷’

মানুষে মানুষে অসাম্য ভেদ-জ্ঞান ও ৰুদ্রতা-সংকীর্ণতা দূর করে অনত্মরে অনাবিল শানত্মি ও আলোকিত রূপ-মাধুর্য ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন তিনি৷ রবীন্দ্রনাথ সারাটা জীবন একজন সাধকের বেশে মানবাত্মার উন্নত মহিমার জয়গান গেয়ে ফিরেছেন৷ তিনি তার সমগ্র চৈতন্যে উপলব্ধি করেছেন, এ বিশ্ব চরাচরের সবকিছুই একই সূত্রে গাঁথা আর অননত্ম-অপার রহস্যময় এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সকল কর্মকাণ্ড৷

এসব কর্মকাণ্ড যে বিশ্বকর্মার ইচ্ছায় চলছে তাকে খুঁজে ফিরেছেন তিনি জীবনের প্রতি প্রভাতে, প্রতি সন্ধ্যায়৷ মানুষের হৃদয়ের আকুতিতে, প্রকৃতির বৈচিত্র্যময়তায় আর জীবন-নদীর বাঁকে বাঁকে তিনি এক জীবন-দেবতার অদৃশ্য আনাগোনা লৰ্য করে গেছেন৷ তাই জীবন-মৃতু্যকে তিনি অলৰ্যে কর্মরত সেই জীবন-দেবতার বিপুল রহস্যময় বিষয় বলে মনে করেন৷ তিনি বলেন, ‘তাই তোমার আনন্দ আমার পর তুমি তাই এসেছ নীচে/ আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর তোমার প্রেম হোত যে মিছে৷’ স্রষ্টা বা ঈশ্বর তার নিজের আনন্দেই সর্বত্রই রহস্যময়রূপে বিচরণ করে ফিরছেন৷ রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর/ আমার মাঝে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর৷’ রবীন্দ্র চেতনায় এই দার্শনিক ভাব-ভাবনা বাঙ্গালী চিত্তে সঞ্চার করেছে ঈশ্বরে-মানুষে মহামিলনের আকুতি৷

জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের চৌদ্দ ভাইবোনের মধ্যে কনিষ্ঠতম ছিলেন কবি৷ অতি উন্নত সাংস্কৃতিক আবহে এবং জীবনের গভীরতম বোধের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন তিনি৷ ১৮৬১ সালে জন্মগ্রহণকারী কবি ১৯৪১-এ ৮০ বছর বয়সে মৃতু্যবরণ করেন৷ এই সুদীর্ঘ জীবন পরিক্রমায় কবি দুই হাতে অকৃপণভাবে বাঙ্গালীকে কেবল দিয়েই গেছেন৷ তাই আমাদের প্রতিদিনের চিনত্মায় চেতনায় ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ সদা দেদীপ্যমান৷ হুমায়ুন আজাদের ভাষায়-‘রবীন্দ্রনাথই আমাদের সব’৷ ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির মধ্য দিয়েই কবি বাঙ্গালীকে বিশ্ব সভায় গৌরবান্বিত করেছিলেন৷

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.