রবীন্দ্রনাথের ‘মুসলমানীর গল্প’ তাঁর শেষ ইচ্ছার প্রতিফলন – রেহানা ফারম্নক

‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও, তারই রথ নিত্যই উধাও৷’ বাংলাকাব্যে রবীন্দ্রনাথ ও নজরম্নল স্বর্গের অনিন্দ্য কানত্মিতে যৌবনকে অভিষেক জানিয়েছেন৷ বৈষম্যপীড়িত সংকট উত্তরণে তাঁদের চ্যালেঞ্জ যৌবন বন্দনায় ছিল অনন্য৷

রবীন্দ্রনাথ জীবনের অতু্যজ্জ্বল আলোর পথ থেকে ক্রমেই যখন পশ্চিম গগনে ঢলে পড়ছেন তখন লিখলেন ‘মুসলমানীর গল্প’ আগেকার দিনে হিন্দু-মুসলিম বিরোধ থাকলেও সে বিরোধ বড় একটা শত্রম্ন নিধনযজ্ঞে নামেনি৷ এ দুই জাতির মধ্যে দৃশ্যমান বৈরিতা থাকা সত্ত্বেও মুসলমানদের জন্য আলাদা দেশের কথা কেউ ভাবতে পারেনি৷ কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের শেষ পাদে এসে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের দৃশ্যপট দ্রম্নত পাল্টে যেতে থাকে৷ যতই ধর্মীয় ন্যাশনবোধ চাঙ্গা হয়ে উঠতে থাকল; তাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি শুভ কামনা উঠে বিরোধের মাত্রা পেঁৗছল তুঙ্গে৷ আত্মঘাতী ধ্বংসের এই বিষাণ থেকে উদ্ধারকল্পে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির বাণী প্রচারে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন অনেক মনীষী৷

তাঁর অবিনাশী সৃষ্টি বহতা নদীর মতোই ছিল বেগবান৷ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর মুসলিম পাঠকের আকাঙৰা ক্রমেই বাড়তে থাকে৷ হিন্দু-মুসলিম হিংসাত্মক ও বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্কের অবসান ঘটাতে তার লেখনী হয়ে উঠেছিল বাঙময়৷ তিনি একচৰুবিশিষ্ট হরিণ সদৃশ্যদের বলতে চেয়েছেন অনেক দিক দিয়ে মুসলমান ধর্ম হিন্দু ধর্মের চেয়ে শ্রেয়তর, বিশেষ করে জাত-পাত ও ছোয়া-ছুঁয়ির ছুতমার্গ বিবেচনায়৷ এ কারণে ‘মুসলমানীর গল্প’ কালের সাৰী হয়ে আছে৷ গল্পটি অত্যনত্ম বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক প্রেৰাপটে রচিত৷

মুসলমানীর গল্পের নায়িকা ‘কমলা’ পিতৃহীন৷ তিন মহলস্নার তালুকদার বংশীয় ভাইঝি এই কমলা৷ ছোট বয়সেই বাবা-মাকে হারিয়ে সে মানুষ হয় কাকার আশীর্বাদপুষ্ট সংসারে৷ কমলার রূপের বিচ্ছুরণে কাকা-কাকি সদা আতঙ্কিত৷ নানান টানাপোড়নে লোকচৰুর অনত্মরালে রেখে তারা কমলাকে বড় করে৷ হিংস্র হায়েনার ভয়ে তাদের আরামের ঘুম হারাম হয়ে যায় মেয়েটির জন্য৷ বাড়নত্ম গড়নের কমলার ওপর নজর সবার৷ সমাজের নিয়মমাফিক এবার তাকে পাত্রস্থ করার পালা৷ লোকটি একই তালের বলে ধরা পড়ে যখন মোচাখালীর পরমানন্দ শেঠের মেজ পুত্রের সঙ্গে কমলার বিয়ের প্রসত্মাব আসে৷ কাকার সানত্ম্বনার কারণ ছিল বাবার অনেক আছে ধনে ও জনে৷ কাজেই মেয়েটির নিরাপত্তার অভাব হবে না৷ অযথা সময় ও শক্তি নষ্ট করেন না তিনি৷ ছেলেটির নিজের কিছু না থাকলেও বাবার অনেক আছে, এতেই সে বিমল আনন্দে মেরম্নদণ্ড সোজা করে গর্বিতভাবে চলে৷ স্বপ্নলোকচারী সময় কাটাত সে পরম আমোদ-আহ্লাদে৷ বিয়েও তার হয়েছে৷ তবুও পরম আরাধ্য মন ছিল নবীন বয়সী কোনো এক তিলোত্তমার জন্য৷ কমলার রূপে-গুণে সে মুগ্ধ, জিভ তার আগুনের শিখা হয়ে মনে মনে এমন একজনের ধান্ধাতেই সে ছিল৷ এবারে পণ করে কমলাকে তার চাই-ই চাই৷ দৃশ্যমান গর্ব ছিল ছেলের প্রচুর৷ অত্যনত্ম টেকসই অস্ত্র হিসেবে ভোজপুরি পালোয়া লাঠিয়ালের বদৌলতে তার সাহসেরও কোনো কমতি ছিল না৷

সব কিছু বাইপাস করে কমলার কাকা বংশীর চাওয়া-পাওয়া এবারে ষোল কলায় পূর্ণ হতে চলে৷ বংশী নিজে তার জামাইকে বলে : ‘বিবাহ অনুষ্ঠান পর্যনত্ম মেয়ের দায় আমাদের, তারপর মেয়ে এখন তোমার- তুমি ওকে নিরাপদে পেঁৗছানোর দায় নাও৷ আমরা এ দায় নেবার যোগ্য নই৷ আমরা দুর্বল৷’ ভাবতে অবাক লাগে কোন দুর্যোগের ঘনঘটায় রবীন্দ্রনাথ এ গল্প লিখেছেন৷ বিয়ের কথা শুনে কমলা তার কাকাকে বলল : ‘কাকামণি কোথায় আমাকে ভাসিয়ে দিচ্ছ৷’ ‘তোমাকে রৰা করবার শক্তি থাকলে চিরদিন তোমাকে বুকে করে রাখতুম জানো তো মা৷’ কাকার উত্তর ছিল এই৷ কমলার কষ্ট ও বেদনার ভগ্নাংশগুলো অশ্রম্ন হয়ে ঝরে পড়ল৷ অস্থিরতা, হতাশা-নিরাশায় তার স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে একেবারে বিকলাঙ্গ করে ফেলল৷ বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথেই নিরাপত্তাহীন হয়ে গেল সে৷ হিংস্র থেকে হিংস্রতর হয়ে ওঠা ডাকাত দলের সঙ্গে বরের ভোজপুরি লাঠিয়াল পেরে ওঠে না৷ যে নিরাপত্তার কারণে বংশী তার ভাইঝিকে উচ্ছৃঙ্খল ছেলেটির হাতে তুলে দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেনি; বিধ্বংসী ৰিপ্রতায় মুহূর্তেই সেই নিরাপত্তাও উধাও৷

যৌক্তিক কারণেই থরথর কম্পমান কমলা চতুর্দোলা ছেড়ে ত্বরিতগতিতে ঝোপের মধ্যে লুকাতে যাচ্ছিল৷ তখনই সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো বৃদ্ধ হবির খাঁ এসে দাঁড়ালেন৷ কমলার বিপদের ত্রাণকর্তা৷ তিনি সম্মানী মানুষ৷ ডাকাতের সাধ্য কি তাকে উপেৰা করে! আশ্চর্য ম্যাজিকের মতো দুর্যোগ কেটে গেল৷ হবির খাঁ তাকে নিজ ঘরে নিয়ে যেতে চাইলে কিছুতেই কমলার মন তাতে সায় দেয়নি৷ কাকার ঘর পর্যনত্ম পেঁৗছল- কাকিমা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলেন৷ মনুষ্যত্বের শাশ্বত অসত্মিত্বটুকুর রেশ পর্যনত্ম সেখানে নেই৷

আপদকালীন এই সময় হবির খাঁর ঘরেই তার পৰপুষ্টে ও আশ্রয়ে থাকার পাকা ব্যবস্থা হলো৷ রীতিমতো আলাদা ব্যবস্থায় পূজা-অর্চনা ও দাসদাসীসহ সে রানীর হালেই বহালতবিয়তে রয়ে গেল৷ বিশুদ্ধ ও নতুন রক্ত সঞ্চালনের তাগিদে এক পর্যায়ে হবির খাঁর ছেলের সঙ্গে তার প্রণয় এবং বিয়ে৷ সে হবির খাঁকে বলে : ‘বাবা, আমার ধর্ম নেই, আমি যাকে ভালোবাসি সেই ভাগ্যবানই আমার ধর্ম৷ যে ধর্ম আমাকে জীবনের সব ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেছে, অবজ্ঞার আসত্মাকুঁড়ের পাশে আমাকে ফেলে দিয়েছে; সে ধর্মের মধ্যে আমি তো দেবতার প্রসন্নতা পেলুম না৷ সেখানেও দেবতা আমাকে প্রতিদিন অপমানিত করেছে সে কথা আজও আমি ভুলতে পারিনি৷ আমি প্রথম ভালোবাসা পেলুম বাপজান তোমার ঘরে৷’

এখানে হবির খাঁর পরিবারের একটা বিশেষ ইতিহাস উলেস্নখযোগ্য৷ তার জীবনের যাত্রা সূচিত হয় মুসলমান পিতা ও রাজপুতানি মায়ের সনত্মান হিসেবে৷ ‘পূর্বকালের নবাব এনেছিলেন রাজপুতের মেয়েকে৷ তারপরও তার ওপর কোনো আধিপত্যের চাপ ছিল না৷ তাকে তার জাত বাঁচিয়ে আলাদাভাবে রেখেছিলেন৷ সে মনের উদ্ভূত তাগিদে পূজা করত, মাঝে মাঝে তীর্থ ভ্রমণেও যেত৷ তখনকার অভিজাত বংশীয় মুসলমানেরা উচ্চনৈতিকতাবোধে উজ্জীবিত হয়ে ধর্মনিষ্ঠ হিন্দুকে শ্রদ্ধা করত৷ সেই রাজপুতানি মহল থেকে যত হিন্দু বেগমদের আশ্রয় দিত, তাদের চর্চিত আচার-বিচার থাকত অৰুণ্ন৷ শোনা যায়, হবির খাঁ সেই রাজপুতানির পুত্র৷’ হবির খাঁর মেজ ছেলে করিম কমলাকে নতুন দিগনত্মের নতুন আলোর সন্ধান দিয়েছে৷ দু’চোখভরে দিয়েছে ভালোবাসার স্বপ্ন৷ তার নতুন নাম মেহেরজান৷ করিম তাকে এক বাগান থেকে তুলে ভালোবাসার সু-গন্ধি আলো বাতাসে নিজের ভুবনে রোপিত করল৷ কেননা ‘ভালোবাসার ধর্মই আত্মসমর্পণে- সুতরাং তার গৌরব তাহাতেই’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) প্রকৃত প্রসত্মাবে, ধর্মের ভেদবুদ্ধি নয়, ভালোবাসার মধ্যেই তিনি দেখেছিলেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপায়৷ রবীন্দ্রনাথ কখনো হিন্দু ধর্মের অচলাবস্থার দরজাতে আটকা পড়ে শ্বাসরম্নদ্ধকারী জীবনযাপনে বিশ্বাসী ছিলেন না৷ পালাবদলের পালায় তিনি মনের পরিবর্তন এবং আধুনিক যুগের জয়বার্তা ঘোষণা করতে চেয়েছেন৷ তিনি হিন্দু-মুসলমান শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘ইউরোপ সত্য সাধনা ও জ্ঞানের ব্যপ্তির ভেতর দিয়ে যেমন করে মধ্য যুগের ভেতর দিয়ে আধুনিক যুগে এসে পেঁৗছেছে, হিন্দু-মুসলমানকেও তেমনি গণ্ডির বাইরে যাত্রা করতে হবে৷ ধর্মকে কবরের মতো তৈরি করে তারই মধ্যে সমসত্ম জাতিকে ভূতকালের মধ্যে সর্বতোভাবে নিহিত করে রাখলে উন্নতির পথে চলবার উপায় নেই৷’

১৯৪১ সালের ২৫ জুন, মৃতু্যর মাত্র এক মাস ১১ দিন আগের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খল প্রেৰাপটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) লিখেছিলেন ‘মুসলমানীর গল্প’৷ ধরে নেয়া হয়, তিনি এনথিক বিদ্বেষে গর্জে ওঠা বিনাশ-উন্মুখ হিন্দু-মুসলিম জাতিকে শানত্ম করে মিলনের পেলব ছোঁয়ায় রাঙিয়ে দিতে চেয়েছিলেন৷ খু-উ-ব সম্ভব এটিই ছিল তার শেষ ইচ্ছা৷ অনেকের অভিযোগ, রবিরশ্মির প্রখর বলয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি তিনি ছিলেন উদাসীন, নিষ্প্রভ৷ অথচ তার দৈনন্দিন জীবনের চারপাশেই ছিল তাদের অবস্থান৷ মহান এ কথাশিল্পীর কাছে তত্‍কালীন মুসলিম সমাজ তাদের আরাধ্য পাওনায় তুষ্ট হতে পারেনি বলে তিনি যে একেবারেই তাদের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন তা নয়৷ নজরম্নল ভিন্ন সে সময় মুসলমানদের তেমন কোনো যোগ্য প্রতিনিধিও ছিল না৷ এক সম্প্রদায়ের কবির পৰে অন্য ধর্মের অনুভূতি নিয়ে সাহিত্য রচনা এক জটিল প্রক্রিয়া তা বলাই বাহুল্য৷ তারপরও রবীন্দ্র সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডারের কন্দরে কন্দরে লুকিয়ে রয়েছে হিন্দু-মুসলিমি মিলনের কাঙিৰত সেই পরম বাণী৷

পরে রবীন্দ্রনাথ যখন এ গল্পটি লেখেন তখন ব্রিটিশ কূটরাজনীতির চালে ক্রমাগত খোঁচাখুঁচিতে হিন্দু-মুসলিম পলিটিক্যাল কালচারে সর্বগ্রাসী বিকার দেখা দেয়৷

এই ভয়ঙ্কর গহ্বরটির তলদেশ থেকে উঠে আসার জন্য ধর্মীয় ভেদবুদ্ধির ওপরে উঠে হিন্দু-মুসলিমের ঐক্যবদ্ধ মোর্চার ভালোবাসারই জয়ের মশাল জ্বালালেন৷ ‘শানত্মির ললিতবাণী আর শোনাইবে না ব্যর্থ পরিহাস৷’ জনপ্রিয় স্রোতের বিরম্নদ্ধে অর্থাত্‍ হিন্দু ধর্মের ছুতমার্গের অচলাবস্থার দরজাতে সজোরে আঘাত হেনে বিশ্ব মানবতার বিশাল প্রেৰাপটে যৌবন অর্থাত্‍ আধুনিক যুগের কপালে জয়ের তিলক পরিয়েছেন৷ তিনি ‘চরকা’ প্রবন্ধে দুঃখ করে লিখেছেন : ‘ঃ আমাদের দেশে নিত্যধর্মের সঙ্গে আচার ধর্মকে মিলিয়ে দেয়ার দ্বারা এ রকম দুর্গতি কত যে ঘটছে, তা বলে শেষ করা যায় না৷’

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.