রহস্য ঘেরা মাদাগাস্কার

35958_1

বিজ্ঞানীরা বলেন সময় ভুলে যাওয়া দ্বীপ৷ কেন বলেন? আফ্রিাকার কাছে ভারত মহাসাগরে বিশাল এই দ্বীপের বহু প্রাণী আর গাছপালা রয়ে গেছে সেই ডাইনোসর আমলের মত৷ পৃথিবীর আর কোথাও এমনটি দেখা যায় না৷ মাদাগাস্কারের কিছু প্রাণী আর গাছ দেখলে মনে হবে, সময়টাই ভুলে বসে আছে তারা৷

জার্মান শেফার্ড কুকুরের মত দাঁত বের করা বিদঘুটে এই প্রাণীটার নাম ম্যাসিয়াকাসরাস৷ চেহারই বলে দেয়, স্বভাবটা কেমন৷ বদরাগী আর সারাৰণ খাই খাই ভাব৷ শাবসবজি তার একদম নাপছন্দ৷ মনমত জীবজন্তু পেলে টপাত করে গিলে ফেলতে ওসত্মাদ৷ গিলে ফেলা কথাটা বোধহয় ভুল হল৷ এত চমত্‍কার দাঁত থাকতে গিলতে যাবে কোন দুঃখে! চিবিয়ে চিবিয়ে বেশ মজা করেই মাংস খাওয়াই ওদের বেশি পছন্দ৷ দাঁতের গড়ন দেখলেই সেটা বেশ বোঝা যায়৷ খুব চটপটে আর বেজায়রকম দৌড়বাজ৷ কিন্তু তারপরও নিজেদের বাঁচাতে পারল না ওরা৷ দোতলা বাড়ির মত উঁচু উচুঁ মাংসখেকো দানব মাজুঙ্গাসরাস খেয়ে সাবাড় করে দিল ওদের৷ আজ থেকে ৭ কোটি বছর আগে আফ্রিকার কাছে ভারত মহাসাগরীয় বিশাল দ্বীপ মাদাগাস্কারের বাসিন্দা ছিল ওরা৷ ওরা না থাকলে কি হবে৷ ওদের জ্ঞাতি ভাই বোন এখনো দিবি্ব চরে বেড়াচ্ছে এই দ্বীপটিতে৷ তুমি যদি মাদাগাস্কার যাও, মনে হবে প্রাগৈতিহাসিক যুগে চলে এসেছ তুমি৷

মাদাগাস্কারে আছে লেমুর নামে এক রকম প্রাণী৷ বানর বা মানুষের জ্ঞাতি৷ চোখ দুটো বড় বড়৷ গাছে চড়তে ওসত্মাদ৷ পাঁচ রকমের লেমুরের দেখা মেলে মাদাগাস্কারে৷ এর মধ্যে একটা হল পিগমি মাউস লেমুর৷ কাঠবিড়ালীর চেয়ে বড় নয়৷ আরেকটার নাম ভারি সুন্দর৷ আয়ে-আয়ে লেমুর৷ রাতে ওদের চোখ যেন জ্বলতে থাকে৷ আমাদের দেশে বাদুড় যেমন, ওরাও তেমনি দিনের চেয়ে রাতে চোখে ভাল দেখতে পায়৷ সবচেয়ে বড়টার নাম ইন্দ্রি লেমুর৷ লেজসমেত আড়াই ফুট মত লম্বা হয়৷ ওজন আট-দশ কেজি৷ আগেই বলেছি, ওরা মানুষের জ্ঞাতি ভাই৷ আমরা যেমন মনে করি, মানুষ মরে ভূত হয়, মাদাগাস্কারের মানুষের ধারণা, মানুষ মরে গিয়ে ভূত হয় না, হয় লেমুর৷ লেমুরের অনেক আশ্চার্য ৰমতা আছে বলে ওদের বিশ্বাস৷ আবার কারো কারো ধারণা, অনেক আগে জঙ্গলে বাস করত দুই ভাই৷ এক ভাই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে চাষবাস শুরম্ন করল আর অন্য ভাই জঙ্গলেই রয়ে গেল৷ অনেকে মনে করে যে ভাই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল, সেই হল পৃথিবীর প্রথম মানুষ আর যে ভাই জঙ্গলে রয়ে গেল, সে হল লেমুর৷ মানুষের সাথে কিছুকিছু ব্যাপারে অভূত মিল আছে লেমুরের৷ প্রতিদিন ভোরবেলা লেমুরগুলো সূর্যের দিকে মুখ করে এনমভাবে বসে থাকে যে, দেখলে মনে হয় সূর্যের উপসনা করছে ওরা৷ হাতদুটো সামনে বাড়িয়ে দুই হাটুর ওপর রেখে, অর্ধমুদ্রিত চোখে ঠিক মুনি-ঋষিদের মত ওরা বসে থাকে দীর্ঘৰণ৷

মাদাগাস্কারে আছে অভূত দেখতে এক রকমের গাছ৷ নাম বাওবাব৷ এগাছগুলো দেখলে মনে হয় কেউ যেন এটাকে ধরে উল্টোকরে পুঁতে দিয়েছে মাটিতে৷ মজার উপকথাও আছে এনিয়ে৷ একবার নাকি ঈশ্বরের তাড়া খেয়ে শয়তান ছুটছিল প্রাণপনে৷ কোথাও পালানোর পথ না পেয়ে লুকাতে চাইল একটা বাওবাব গাছের আড়ালে৷ কিন্তু বাওবাব শয়তানকে আশ্রয় দিতে রাজি হল না৷ আর তাতেই বেজায় ৰেপে গেল শয়তান৷ সে একটানে গাছটা উপড়ে নিয়ে পুতে দিল উল্টো করে৷ ব্যস, সেই থেকে বাওবাবের এই দশা৷ এর যে ফল, তার নামটাও বেশ মজার৷ মাঙ্কি ব্রেড বা বানরের রম্নটি৷ টক স্বাদের এই ফল বানরের ভারি পছন্দ বলেই এমন নাম৷ আমাদের দেশে অনেকে শখ করে বাগানে যে ‘পান্থপাদপ’ বা ‘ট্রাভেলার্স ট্রি’ লাগায় তারও আদিনিবাস কিন্তু এই মাদাগাস্কারই! কলার পাতার মত দুই দিকে দুইসারি পাতা মাটি ফুড়ে বেরিয়েছে যেন৷ শিশির বা বৃষ্টির পানি এই পাতার গোড়ার দিকে জমে থাকে৷

তৃষ্ণার্ত পথিক অনেক সময় এই পানি দিয়ে তেষ্টা মেটায়৷ তাই একে বলে পান্থপাদপ বা ট্রাভেলার্স ট্রি৷ সেই ডাইনোসরের যুগে, তারমানে আজ থেকে কম করে হলেও ৭কোটি বছর আগে মাদাগাস্কার আফ্রিকা মহাদেশ থেকে ভেঙ্গে টুকরো হয়ে ভারত মহাসাগরের একটা দ্বীপে পরিণত হয়৷ বিশাল দ্বীপ অবশ্য৷ আকারের দিক দিয়ে বিশ্বের বড় দ্বীপগুলোর মধ্যে এটা ৫ নম্বরে৷ কিন্তু সে কারণে নয়, এর গাছপালা, কীট-পতঙ্গ, জীব-জন্তুর বৈচিত্র এত বিশাল যে মাদাগাস্কারকে বলা হয় ভিন্ন পৃথিবী বা ভেঙে যাওযা বিশ্ব৷ হাজার হাজার বছর ধরে এটা ছিল শুধুই জঙ্গল৷ মানুষ এখানে পা রেখেছে মাত্র কয়েক শ’ বছর আগে৷ তাই তারা এর পরিবেশ এখনও ততটা নষ্ট করতে পারেনি, যেমনটা করেছে পৃথিবীর অন্য এলাকায়৷ 

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.