মুক্তিযোদ্ধার একাল ও সেকাল – বি প্র দা শ ব ড় ু য়া

মোন্নাফের একটি কিডনি মুক্তিযুদ্ধের সময় নষ্ট হয়ে গেছে৷ সে সময় সে টেরই পায়নি৷ করতোয়া নদীর ওপারে মীরগড় সীমানত্ম৷ নদীর ওপারের ঘাটে একদল রাজাকার এবং পাক হানাদার সৈন্য এসে জড়ো হয়েছে৷ নদী পার হওয়ার উপায় খুঁজছে মনে হল৷ মুক্তিযোদ্ধা মোন্নাফ দৌড়ে এসে বাজারের পাশে মুক্তিযোদ্ধাদের হাইড আউটে খবরটা পেঁৗছে দেয়৷ পাক বাহিনীর কাউকে সে দেখতে পায়নি৷

সকাল আটটার মতো সময়৷ সঙ্গে সঙ্গে তরম্নণ মোন্নাফ আবার দৌড়ে নদীর এপারে গিয়ে দাঁড়ায়৷ তার মনে হল, শত্রম্নবাহিনী এসেছে সারেন্ডার করতে৷ দু’ দিন ধরে এই কথাটি শোনা যাচ্ছিল যে, একদল রাজাকার অস্ত্রসহ মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্যে এসেছে৷ এটা যে তারা চালাকি করে চাউর করে দিয়েছে তা সন্দেহ হলেও মেনে নিতে পারেনি৷

মোন্নাফ তখন চিত্‍কার করে তাদের বলতে থাকে, আসেন ভায়েরা, আমরা আপনাদের জন্য অপেৰা করে আছি৷

কিন্তু ওপার থেকে কেউ সাড়া দিল না৷ সে তখন আরও জোরে চিত্‍কার করে বলতে লাগল, আমরাও বাঙ্গালি, আপনারাও বাঙালি৷ বাংলাদেশ আমাদের সবার৷ আসুন সবাই মিলে জয় বাংলাকে স্বাধীন করিঃ৷ আসুন, আসুন৷ মনের মধ্যে কোনো কিন্তু ও সন্দেহ রাখবেন না ঃ৷

তার উত্তরে ছুটে এলো এক ঝাঁক গুলি৷ মোন্নাফ ভ্যাবাচাকা খেয়ে কিছুৰণ দাঁড়িয়ে রইল৷ আবার ছুটে এলো হনত্মারক গুলি৷ একটি গুলি বুকে বা মাথায় না লেগে বাঁ উরম্নতে একপাশ দিয়ে বিঁধে বেরিয়ে গেল৷ অমনি সে ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্রলিং করে নিরাপদ জায়গায়৷ হাইড আউটে ফিরে আসতে আসতে সকলকে অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলে৷

শুরম্ন হয়ে গেল লড়াই৷ শত্রম্নদের কোনো মতে নদী পার হতে দেয়া যাবে না৷ যে যেখানে আছে পজিশন নিয়ে লড়াই শুরম্ন করল৷ শত্রম্নরা মনে করেছিল নদীর এপারে মুক্তিযোদ্ধারা নেই, তাই তারা নদী পার হয়ে আচমকা হানা দিতে চেয়েছিল৷ শুরম্ন হয়ে গেল তুমুল লড়াই, অল্পৰণের মধ্যে গোটা এলাকা যুদ্ধৰেত্রে পরিণত হলো৷ শত্রম্নদের নদী পার হওয়া রম্নখে দিয়ে মোন্নাফেরা পাঁচ জন ফিরে এলো ক্যাম্পে৷

দশ দিনের মধ্যে সীমানত্মের অস্থায়ী কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতালে থেকে মোন্নাফ ভালো হয়ে উঠল; কিন্তু একটি মূত্রগ্রন্থি কী করে নষ্ট হয়ে গেল সে নয় মাসের যুদ্ধে টের পায়নি৷ ক্যাপটেন সিং-ও ডাক্তারের পরামর্শ মতো আরও দু’ সপ্তাহ বিশ্রামের নির্দেশ দিয়ে সবাই যুদ্ধৰেত্রের প্রাত্যহিক কাজে ডুবে গেলেন৷ মোন্নাফ কাজের মানুষ, বসে বসে তার কি ভালো লাগে! তার বদলে নতুন আসা জব্বার ও মহিনকে মোন্নাফের জায়গায় রিক্রুট করে দিল৷ ঝড়ের মতো দিনগুলো বয়ে যেতে লাগল৷ হানাদার কবলিত বাংলাদেশ থেকে লুকিয়ে পালিয়ে আসতে লাগল শরণাথর্ী, মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সাহায্য করে ভারতের শরণাথর্ী ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিতে লাগল৷

এসময় দেবীগঞ্জ থেকে বহু পথ ঘুরে তিন দিন তিন রাত পথে পার করে লাইলি তার মা-বাবা ও চাচা-চাচীর সঙ্গে শরণাথর্ী হয়ে এসে পেঁৗছল মীরগড়৷ বিশ্রামরত মোন্নাফের উপর দায়িত্ব পড়ল তাদের ঠিকমতো শরণাথর্ী ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়ার জন্যে৷ মোন্নাফও একটা কাজ পেয়ে উদ্যোগী হয়ে উঠল৷ তখন বর্ষাকাল, প্রায় সারা দিন উত্তরবঙ্গের বিখ্যাত ঝিরিঝিরি বৃষ্টি চলছে থেমে থেমে৷ শরণাথর্ীরা ছাতা মাথায়, ভিজে, কেউবা মাথায় বসত্মার এক কোণা মাপ মতো ঢুকিয়ে দিয়ে পিঠে ঝুলিয়ে দিয়েছে৷ হাতে কাপড়ের পুঁটলি বা ছোট একটি টিনের বাক্স৷ লাইলিরা অবরম্নদ্ধ এলাকায় বড় একটি দেবদারম্ন গাছের তলায় জড়ো হয়েছে৷ তখন সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে৷ গ্রামের পথপ্রদর্শক হাফিজুল সামনের গ্রামটির জন্য ভয় পাচ্ছে৷ সেখানে রাজাকারদের উত্‍পাত চলছে কয়দিন ধরে৷ মোন্নাফদের দলে খবর নিয়ে এলো মুক্তিযোদ্ধাদের খবর সরবরাহকারী৷ মারেয়া, সাকোয়া, শালডাঙ্গা ও দেবীগঞ্জের ওদিকে ডোমার৷ এলাকাটা পুরো শত্রম্ন কবলিত৷ লাইলিদের এই এলাকা পার করে দেয়া খুব বিপজ্জনক৷ বিপজ্জনক হলেও পার করে দিতে হবে৷ মোন্নাফের সঙ্গে আরও তিনজনকে দেয়া হল৷ ওরা নিয়মিত যোদ্ধা নয়৷ তাদের একজনের রাইফেল আছে৷ দু’জনকে দেওয়া হল তিনটি করে গ্রেনেড৷ মোন্নাফকে অটোমেটিক রাইফেল বরাদ্দ করল মুক্তিযোদ্ধা মন্টুর নির্দেশে৷ মোন্নাফ ছাড়া তিন জন মুক্তিবাহিনীর হাইড আউটে নিয়মিত সহযোগিতা করে চৌকশ হয়ে উঠেছে৷ একটা ফিটনেস পরীৰা দিলেই ওরা নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাবে৷ মন্টু তার দলের পরিচালিত ট্রানজিট ক্যাম্পের মাধ্যমে তাদের মুক্তিযোদ্ধা করে নেয়ার কাজ প্রায় সেরে এনেছে৷

মোন্নাফ দেবদারম্ন ও তিন-চারটি শালগাছের ঝোপে গোধূলি সময়ে ভেজা চকচকে লাইলিকে দেখে সম্মোহিতের মতো এগিয়ে গেল৷ অলিউল, তপন ও বাদশা তার পিছে পিছে চলল৷ অস্ত্র সজ্জিত মোন্নাফদের দেখে লাইলির বাবা বেঁকে বসল৷

লাইলির বাবা আলাউদ্দিন বলে দিল, বাবারা, আমরা ভারতের শরণাথর্ী ক্যাম্পে যাব না৷ আমাদের এদিকে কোথাও থাকতে দাও৷ অবস্থা একটু শানত্ম হলেই ঘরে ফিরে যাব৷

মোন্নাফ গর্জে উঠল, কী! আপনি কী জানেন! রাজাকারের দলের হাতে পড়লে আপনাদের ছিঁড়ে খুঁড়ে খাবে৷ তাছাড়া আপনার মেয়েটিকে ঃ৷ মোন্নাফ আর বলতে পারল না৷

লাইলির মা তখন মেয়েকে বুকে ধরে বলল, বাবা আলস্নাহর পরে তোমরা রৰাকর্তা, আলস্না তোমাদের হাতে ধরে পাঠিয়ে দিয়েছে৷ তোমার কথা আমরা শুনব৷

আলাউদ্দিন মিয়া গাইঁগুই করতে লাগল তবু৷ তার চাষবাস, হালের বলদ জোড়া রেখে এসেছে শানত্মি কমিটির মেম্বারের কাছে৷ বকবক করেই চলল৷

লাইলি তখন মায়ের গায়ের থেকে আলাদা হয়ে ঝলমল ও বিস্ময়ের চোখে মোন্নাফকে দেখছে, যেন সাত জন্মের চেনা, যেন রূপকথার বীরপুরম্নষকে মাটি ফুঁড়ে উঠতে দেখল এই প্রথম৷ আর সত্যিই সে প্রথম এক জীবনত্ম মুক্তিযোদ্ধাকে দেখল আজ৷ দেখে দেখে তার আশ মেটে না, জীবনের অনেক কঠিন রহস্যের যেন কিনারা খুঁজে পেল এই মাত্র৷ আলাউদ্দিন মিয়া তখন তার টাকা ও সোনা হারানো নিয়ে কী যেন বলতে যাচ্ছিল৷

মোন্নাফ তৰুণি একটা কাণ্ড করে বসল৷ সোজা লাইলির কাছে গিয়ে হাত ধরে বলল, এই মেয়েকে নিয়ে আপনি রাজাকারদের সামনে যাবেন? তারপর খারাপ একটা গালি কোনো মতে চেপে রেখে বলল, এই অলি, এই তপন, লোকটাকে দুরমুশ করে বুঝিয়ে দে রাজাকারেরা শরণাথর্ীদের পেলে কী করে!

মোন্নাফের অজানত্মে তার হাতের শক্ত চাপ খেয়ে লাইলি বলে দিল, আপনি আব্বার কথায় কিছু মনে করবেন না, আমরা শরণাথর্ী ক্যাম্পেই যাব৷

লাইলির মা এবং চাচিও একসঙ্গে মেয়েকে সমর্থন করল৷ অলি ও তপন ততৰণে তরম্নণ শালগাছের ঘন ছায়ার নিচে আলাউদ্দিনের কাছে চলে গেছে৷ একটা ছোট নাইটজার পাখি মায়াবিভ্রম স্বরে ডেকে উঠল, চুক-চুক-চুক-চুকুর-র-র-র৷ যেন উঁচু দাঁড়া থেকে পাখিটি পাথুরে গলায় সাবধান বাণী ঘোষণা করছে৷

লাইলির বাবা কোনো মতেই চাইছিল না শরণাথর্ী কাম্পে যাবে৷ মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে তার মনে হয়েছে এদের কাছাকাছি থেকে বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে, যেন তার গোলার তিরিশ-পঁয়ত্রিশ আড়ি ধান এখন গোলায় অৰত আছে এবং সুযোগ বুঝে সেগুলো বেচে বা বিলি ব্যবস্থা করে আসবে এ যেন হানাদার বাহিনী তার ন্যায় ধর্মের কথা শুনে গলে যাবে৷

মোন্নাফ সংবিত ফিরে পেয়ে লাইলির হাত ছেড়ে দিল৷ লাইলি হাতের ব্যথাটাকে মধুর বেদনা হিসাবে কুমারীত্ব দিয়ে ঢেকে দিতে লাগল৷ ওর বুকের ওপর এবং শরীরের অজানা কোনো গহবরে যেন এক অচেনা পাখিটির প্রতিধ্বনি ঠেলে ঢুকে পড়ছে৷ এমন সময় দূরে কোথায় মর্টারের গর্জন শোনা গেল৷ সঙ্গে সঙ্গে তার জবাবও দিতে লাগল উল্টোদিক থেকে৷ মোন্নাফরা জানে সীমানত্মে নিত্যদিনের মতো ভারতীয় ও পাকিসত্মানিদের গোলাবর্ষণ শুরম্ন হয়ে গেছে৷ সঙ্গে সঙ্গে শরণাথর্ী দলের দশ-বারো জন প্রায় একসঙ্গে হাউমাউ করে উঠল৷ মোন্নাফ চাপা এক গর্জন দিয়ে তাদের থামিয়ে দিল৷

তারপর সানত্ম্বনা দেয়ার ভঙ্গিতে মোন্নাফ লাইলির মা-বাবাকে অল্প কথায় সীমানত্মের পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিল৷ কিন্তু লাইলির হাত তাকে আবার মজনু করে তুলতে লাগল অপার্থিব প্রায় নাইটজার পাখির ডাকে৷ উত্তরবঙ্গের ঝিরি ঝিরি চৈতি হাওয়ার মতো আবার বৃষ্টি শুরম্ন হওয়ার সময় তখন৷ রেকি করে ফিরতি পথে মন্টুর দুই মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে ওদের দেখা হয়ে গেল৷

বৃষ্টি শুরম্নর আগে অন্ধকার পথে ওরা শরণার্থী ক্যাম্পের দিকে রওনা দিল৷ দূরে একটির পর আরও তিনটি শেয়াল ডাক দিল৷ ভারী বৃষ্টি এক সময় লাইলি ও মোন্নাফকে একটি মানকচু পাতার আশ্রয়ে গনত্মব্যের দিকে নিয়ে চলল৷

সেই মোন্নাফ রাজশাহীর মোন্নাফের মোড়ে একটি চায়ের দোকান দিয়েছিল৷ ওটা এক সময় মুক্তিযোদ্ধাদের অড্ডার জায়গা ছিল৷ লোকজনের ভিড় লেগেই থাকত৷ রাজাকার সরকার ৰমতায় আসার পর আসত্মে-আসত্মে দোকানে বেচাবিক্রি কমে যেতে লাগল৷

আমি রাজশাহীর লিচু দেখতে গেলে মোন্নাফের মোড়ের খবর পাই৷ খুঁজতে খুঁজতে ওর বাড়ি বের করে নেই৷ সেই লাইলি এখন প্রায় আমার বয়েসী, বছর পাঁচেক ছোট হবে, হিসেব করে নিলাম৷ নিবু নিবু অগি্নশিখার মতো লাইলি সব কথা বলতে শুরম্ন করল৷ ওর অদম্য ভালোবাসার পাবকশিখার অবশেষ দেখাল ওর কথা৷

অবশেষে পটুয়াখালীর গলাচিপায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে এক রাজাকারের নামে শহরের প্রধান সড়কটির নামকরণ করতে পারেনি স্বাধীনতা-বিরোধী একটি মহল৷ বরং গলাচিপার মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকমর্ীরা সম্মিলিতভাবে সেখানে ওই সড়কটিকে ‘জয়বাংলা মুক্তিযোদ্ধা’ সড়ক নামকরণ করেছেন৷

অনেক পীড়াপীড়ির পর লাইলি মুক্তিযোদ্ধা স্বামী মোন্নাফের কথা বলল৷ হঁ্যা, একজন মুক্তিযোদ্ধা৷ কিন্তু কোনো সার্টিফিকেট নেই৷ সার্টিফিকেটের জন্যে কিছুদিন চেষ্টা করে শেষে হতাশ হয়ে ৰানত্ম দিয়েছে৷ জীবিকার জন্যে চায়ের দোকান দিয়েছে৷ দোকানটা চালু হল, আয় বাড়তে লাগল৷ এমনকি ওর নামে মোড়টির নাম হয়ে গেল মোন্নাফের মোড়৷ যেমন ইয়াসমিন যেখানে খুন হয়েছে তার নামে ইয়াসমিনের মোড় হয়েছে৷ আর শহর থেকে দশ মাইল দূরে বলে ‘দশ মাইলের মোড়’ নাম হয়েছে৷

ওদের দু’ ছেলে ও তিন মেয়ে হল৷ সংসার বেড়ে ভরবাড়নত্ম হল৷ শেষে রাজাকার ওবায়েদীর প্রত্যৰ বিরোধীতায় মুক্তিযোদ্ধারা কোণঠাসা হয়ে যেতে থাকল৷ চায়ের দোকানের উপর ওবায়েদীর আক্রোশের কারণে লোকজন আগের মতো আসা বন্ধ হয়ে গেল৷ মোন্নাফও দিন দিন কেমন নেতিয়ে পড়তে লাগল৷ একটি কিডনির পর দ্বিতীয়টিও কখন অকেজো হয়ে পড়ল বুঝতেই পারল না৷ তিনটি মেয়ের মধ্যে একটির বিয়ে দিতে পারল৷ দোকান যখন চালু ছিল তখন কিছুই চিনত্মা করতে হয়নি৷

শেষে বড় ছেলে চায়ের দোকান বন্ধ করে দিয়ে তরিতরকারির দোকান করল৷ তাতেও খুব সুবিধে হল না৷ তারপর দিল চিনি ও লেবু দিয়ে সরবতের দোকান৷ চিনির দাম আকাশ ছুঁতে শুরম্ন করলে লোকে চিনিপানা খাওয়া কমিয়ে দিল ঝট করে৷ বড় ছেলে মামুদ ভাবতে ভাবতে আকাশ থেকে পাতালে নেমে কাপড় ইস্ত্রির দোকান খুলে বসল৷ পুরোনা একটা ইস্ত্রি কিনে কয়লা ভরে ইস্ত্রি করতে লাগল৷ প্রথম প্রথম কাপড়ও ধোলাই করত৷ শেষে ধোয়া বন্ধ করে শুধু ইস্ত্রি শুরম্ন করল৷ ছোট ভাই আবিদ পড়াশুনো বন্ধ করে দিয়ে ঢাকায় নাকি কোথায় চলে গেল৷ লোকে বলে তাকে নারায়ণগঞ্জে রিকশা চালাতে দেখা গেছে৷

স্বাধীনতার ৩৬ বছরে বিভিন্ন সময়ে ৰমতাসীনদের ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে কেশবপুরেও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার পরিবর্তন করে দীর্ঘ করা হয়েছে তালিকা৷ দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ৪৯ জন মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করা হলেও ২০০৭ সালে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ১০৩ জনে৷ এভাবে তালিকায় অনেক অমুক্তিযোদ্ধার নাম স্থান পাওয়ায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা হয়েছেন ৰুব্ধ৷

বড় মেয়ে সুফিয়ার বিয়ে হয়েছে৷ যমুনার ভাঙ্গনে ওর বাড়ি নদীতে মিশে গেছে৷ রূপিয়া ও দুখিয়ার বিয়ের বয়স নদীর মতো টলটল করে ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে৷ সংসার যমুনার ঢেউয়ের মতো খান খান হয়ে ভেসে পদ্মায় মিশে গেছে৷ কয় বছর আগে মোন্নাফ মিউনিসিপলিটির ঝাড় দারের চাকরি করত৷ ৬৫ বছর বয়স হয়ে যাওয়াতে চাকরিটিও গেল৷ ততদিনে তলপেটের ছোট্ট স্প্রিন্টারের টুকরো নাকি অন্য কোনো কারণে কিডনি দুটো পচে গেছে৷ ঢাকায় গিয়ে চিকিত্‍সা করার সময় ডাক্তার বলল মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দেখালে কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে৷ তাই আবার সার্টিফিকেটের জন্যে দেঁৗড়ঝাপ করল৷ কিন্তু গরিবের মা-বাপ থাকে না বলে ছোটাই সার হল৷

কতদিন মোন্নাফ ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত খায় না ডাল ও আলু ভর্তা দিয়ে৷ গরম ভাত, গরম ডাল ও শুকনো লঙ্কা-পোড়া দিয়ে আলু ভর্তার স্বপ্ন শুধু সরে সরে যায়৷ চোখে ছানি পড়ার মতো দুর্দশা গেড়ে বসেছে মৌরসীপাট্টার দেমাগে৷

মোন্নাফ মনে মনে (আসলে বিড়বিড় করে) বলে, জানের জান লাইলি, মুক্তিযুদ্ধের পর তোর গ্রামে গিয়ে নবাব-বাদশার মতো বিয়ে করে নিয়ে এসেছিলাম না! রাজাকার আসালত নেংটি ইঁদুরের গর্তে ঢুকে লুকিয়ে পড়েছিল, তুই-ই বলেছিলি৷ তোর মা আমাকে দেখে সুখে কেঁদে দিয়েছিল না! কী বীরত্বপূর্ণ এ্যাডভেঞ্চারই না ছিল সে দিনের সব ঘটনা! সেদিন কিডনির অসুখ-টসুখ সুখের চোটে ১৬ ডিসেম্বরে পাকিসত্মানি বাহিনীর মতো আত্মসমর্পণ করেছিল৷ আমাদের বিয়ে হয়েছিল উত্তরবঙ্গের প্রসিদ্ধ ঘন কুয়াশার বাড়ির ভেতর৷ তার মধ্যে উঠোনে ছিল চটের সামিয়ানা, তার নিচে ফুল ও জরির কাগজ দিয়ে বিবাহমন্ডপ, তার মধ্যে কুয়াশা ছিল বিজয়গর্বে৷ খবর পেয়ে আশপাশের মুক্তিযোদ্ধারা চলে এসেছিল গোলাগুলির বাজি-উত্‍সব করতে করতে৷ তখন মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট-টিকেটের ধার ধারিনি৷ তখন বুঝতে পারিনি যে রাজাকারেরা ভেতরে ভেতরে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট বানিয়ে নিচ্ছিল৷ অসুখটাও তলে তলে সার্টিফিকেট বানানোর মতো শক্তি সঞ্চয় করছিল ঘুণাৰরেও মনে করতে পারিনি৷ ঘুণ পোকা তলে তলে কাঠ কাটে, রাজাকারেরা তলে তলে পাকিসত্মানিদের সঙ্গে আঁতাত করছিল আমরা কেউ বুঝিনি৷

জীবন বাজি রেখে যে লড়াকু যোদ্ধা একদিন দেশ স্বাধীন করেছিল আজ সে মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রানত্ম হয়ে টাকার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরতে বসেছে৷ পাবনা শহরের সাইদুল ইসলাম চুন্নু মুক্তিযোদ্ধার সনদ দেখিয়ে কোনো সাহায্য নিতে বিব্রত বোধ করেন৷ আট মাস ধরে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্‍সাধীন; কিন্তু টাকার অভাবে সুচিকিত্‍সা বারবার ব্যাহত হচ্ছে৷

বিছানায় শুয়ে শুয়ে পেটের যন্ত্রণার বিরম্নদ্ধে ফুঁসে উঠতে থাকে মোন্নাফ৷ গর্জে ওঠে৷ যুদ্ধৰেত্রে পাকিসত্মানিরা সেবার ওদের প্রায় চারদিকে ঘিরে ধরতে থাকে৷ বাঁচার একমাত্র পথ শত্রম্নর বু্যহ ভেদ করে বেরিয়ে আসা, শত্রম্নর মনোবল ভেঙ্গে দেওয়ার জন্যে কখনোবা বেহিসাবী হয়ে গুলি খরচ করার ধৈর্য দেখাতে হয়৷ রাজাকারেরা ওদিকে মাথা তুলছে, ওদিকে শানত্মি কমিটির চেনা মুখগুলো শেয়ালের মতো মুখ বাড়াচ্ছে৷ আর মাত্র পাঁচ রাউন্ড গুলি আছে৷ যুদ্ধের এই অবস্থায় ওটা কিছুই না৷ পাশে গুলি জোগানদাতাকে দেখা যাচ্ছে না৷ সন্ধের অন্ধকার ঘিরে ধরছে৷ পাখি, ঝিঁঝিঁ, মানুষ বা শেয়াল কারও শব্দ নেই, আছে শুধু বুলেটের গর্জন ও বারম্নদের গন্ধ, অন্ধকারে ডুবতে বসা ভবিষ্যত্‍৷ সেই অসময় সময়ে মনে এলো লাইলির টলটলে চোখ-মুখ৷

স্বাধীনতার ৩৬ বছর পর রাজাকারদের বিচারের স্বপ্নপূরণের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠল রব হাওলাদারের চোখে৷ শরিয়তপুরের স্বর্ণঘোষ গ্রামের রবের আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি৷ বস্নাড-ক্যান্সার সব স্বপ্ন শেষ করে দিল৷ দু’মেয়ে রম্নবিনা ও রোজিনার বিয়ে দিল৷ তিন মেয়ে রম্ননা, সাবিনা ও সোনিয়ার বিয়ে দিতে পারেনি৷ দু’ ছেলে খোকন ও হাসকর বেকার৷ মৃতু্যর আগে তিনি ছেলেমেয়েদের নির্দেশ দিয়ে যান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে-কোনো আন্দোলনে শরিক হতে৷

মোন্নাফের মোড়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে মিছিল শুরম্ন হয়েছে৷ কাজের মেয়ে ইয়াসমিনের মোড় থেকে দশ মাইলের মোড় পর্যনত্ম দীর্ঘ হয়ে গেছে রাজাকার বিরোধী বিৰোভ মিছিল৷ ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই’ ধ্বনি গগনবিদীর্ণ করছে৷ মৃতু্যশয্যায় শুয়ে শুয়ে মোন্নাফ তার বদলে শুনছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা মিছিল করে তার দিকে ছুটে আসছে৷ মোন্নাফ দেখছে রাজাকার ওবায়েদী অস্ত্র হাতে দলবল দিয়ে ছুটে আসছে মোন্নাফকে হত্যা করতে৷

নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে মোন্নাফের৷ নাইটজার পাখিটা ধাতব গলায় ডাকছে চক-চুক-চুকর-র-র-র! শুনতে পাচ্ছে র-আ-আ-জা-কা-র জি-ন্দা-বা-দ! রাজাকার একটি আদর্শ, একটি বিশ্বাস, একটি দর্শন, একটি আন্দোলন৷ লুঙ্গির নিচের ক্যাথিট্যার মোন্নাফকে যন্ত্রণায় অতীষ্ঠ করে তুলেছে৷ জব্বারও মহিন, অলি, তপণ, সবাইকে মনে হচ্ছে রাজাকার, রাজাকার রাজাকার৷ টান মেরে ক্যাথিট্যারটা খুলে ফেলল, গলগল করে ওখান থেকে প্রশ্রাবের বদলে রক্ত ঝরছে৷ যুদ্ধে আহত হওয়ার মতো টকটকে কাঁচা তাজা রক্ত৷ ক্যাপ্টেন সিংকে সে ওবায়েদী দেখছে৷ নিশ্বাস ফুরিয়ে আসার আর বুঝি দেরি নেই৷

নাইটজার পাখিটা গজরাচ্ছে৷ মোন্নাফের হাতে ধরা ক্যাথিটারের নল হয়ে গেছে এসএলআর-এর গরম নল৷ লাইলি হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিচ্ছে গুলির ছরা৷ বাইরে চারদিকে ভীষণ অদম্য মৃতু্যহীন জয়বাংলার মৃতু্য৷

মোন্নাফ দেখছে মৃতু্যই জীবনের একমাত্র সত্য৷ মানুষ মৃতু্যর জন্যই বেঁচে থাকে৷

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.