সাক্ষাৎকার: বাংলাদেশের প্রথম জনপ্রিয় লেখক আমি

ইমদাদুল হক মিলন
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৫৫ সালে, বৃহত্তর ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে। পৈতৃক ভিটে লৌহজং থানার পয়শা গ্রামে। ঢাকার গেণ্ডারিয়া হাইস্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করা মিলন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে সম্মানসহ স্নাতক অর্জন করেছেন অর্থনীতি বিষয়ে অধ্যায়ন করে। দুই বাংলার পাঠকদের কাছে সমাদৃত এ লেখকের প্রথম লেখা গল্প ‘বন্ধু’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। প্রথম উপন্যাস যাবজ্জীবন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে। প্রথম গল্পগ্রন্থ ভালোবাসার গল্প ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হবার পর থেকেই বিপুলভাবে আলোচিত, পঠিত, সংবর্ধিত তিনি। ১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন কথাসাহিত্যে। ২০১১ সালে মহাকাব্যিক নূরজাহান উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন আই পি এম সুরমা চৌধুরী স্মৃতি আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার। ২৩ আগস্ট ২০১৫ সন্ধ্যায় লেখকের ষাটতম জন্মদিন সামনে রেখে তাঁর সাথে কথা বলেছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মিলন ভাই, অভিনন্দন। প্রায় বাংলাদেশের বয়সের সমান আপনার লেখালেখিকাল। আপনি ষাটে পা দিচ্ছেন আগামী আট সেপ্টেম্বর। তিয়াত্তরের শুরুর দিকেই তো আপনার প্রথম বই বেরুলো, না?
ইমদাদুল হক মিলন:লেখালেখি শুরু তারও আগে। বই পরে বেরিয়েছে। আমার প্রথম বই ভালোবাসার গল্প বেরোয় ১৯৭৭ সালে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আর ১৯৭৯ তে নিরন্নের কাল। প্রথম গল্পটা যেদিন লিখতে বসেছিলেন কি কাজ করছিলো আপনার মাথায়?
ইমদাদুল হক মিলন:আসলে লেখালেখি করবো, লেখক হবো এমন কোনকিছুই ছিলো না মাথায়। এবং আমার চারপাশে যারা বা আমার পূর্বপুরুষরা কেউ কখনো সাহিত্যপেশা বা লেখালেখি পেশায় ছিলো না। আমার যে ব্যাপারটা ঘটলো, ছোটবেলায় আমি অনেকটা বছর একা একা, আমার নানীর কাছে থাকতাম। একেবারে নির্জন একটা বাড়ি, মানুষজন কম, আমার নানী মাঝে মাঝে গল্প শোনাতো, রূপকথার বই পড়ে শোনাতো, মুখস্ত কবিতা শোনাতেন। ফলে আমার মধ্যে একটা কল্পনার জগৎ তৈরি হলো। একটা শিশু যখন একাকী থাকতে থাকে, তার মনোজগত কিন্তু বাড়ছে তখন—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অবশ্যই।
ইমদাদুল হক মিলন:তো গল্পগুলি শুনতে শুনতে ডালিম কুমারের মতোন পঙ্খিরাজে চড়ে কোথাও উড়ে যাওয়ার মতোন একটা কল্পনার জগৎ আমার মধ্যে তৈরি হলো। ঢাকায় এসে উঠলাম আমরা। আর যখন বড় হয়ে উঠছি আমার বাবা কিছু বই কিনে দিতেন আমাকে, সিন্দাবাদের সপ্তঅভিযান, ঠাকুমার ঝুলি, এগুলি পড়ে পড়ে বই পড়ার একটা অভ্যাস তৈরি হলো। যখন ঢাকায় চলে এলাম, গেণ্ডারিয়াতে থাকি, তখন গেণ্ডারিয়াতে একটা পাঠাগার ছিলো, এখনো আছে, অনেক বয়স, সীমান্ত গ্রন্থাগার, ওখানে গিয়ে বিকেলবেলা বই পড়তাম, খেলাধুলা বা দৌঁড়ঝাপ আমাকে টানতো না।

বই পড়তে পড়তে একদিন দেখলাম ওখানে একজন তরুণ লেখক আসেন যার দৈনিকের শিশুদের পাতায় লেখা ছাপা হতো। তো, একদিন তার লেখা ছাপা হয়েছে, সে তখন খুব অহংকার করে পত্রিকার কাটিংটা আমাদের দেখালো। ন্যাচারালি ঐ বয়সে একটা ছেলে যখন কচিকাচার আসরে লেখা ছাপা হয় তা গর্বেরই ব্যাপার। এবং সেই সময় গুটিকয়েক পত্রিকা, হাতে গোনা। আমার মনে হলো, এই ছেলেটা লাইব্রেরিতে বসে বই টই পড়ে, আমিও পড়ি, ওর লেখা যদি ছাপা হয় তো আমি কেনো পারবো না! ঐ চ্যালেঞ্জ থেকেই আমি একটা গল্প লিখলাম।

একেবারেই ছেলেমানুষি চিন্তা থেকে, এভাবে সাহিত্য হয় বলে আমার জানা নেই। ঐ চিন্তা থেকে আমি একটা গল্প লিখলাম, আমার ছোট ভাই, একটা বাচ্চা ছেলে, ওকে দেখতাম যে একটা বানর সকালবেলায় ওর হাত থেকে এসে একটুকরো রুটি নিচ্ছে বা ও নিজে নাস্তা করছে ওখান থেকে বানরটাকে দিচ্ছে। বানরটার হাত ভাঙা। বানরটা প্রতিদিন আসে, ভাঙা হাতটা এগিয়ে দিলে ভাইটা খাবার এগিয়ে দেয় সে নেয়। তো এই দুজনের রসায়ন নিয়ে আমি একটা গল্প লিখলাম, বানরের সাথে বাচ্চা ছেলের সম্পর্ক নিয়ে‘বন্ধু’। তো সেই গল্প কি করতে হয় কোথায় কিভাবে পাঠাতে হয় আমার কোন ধারণা ছিলো না। আমাকে একজন বললো যে পত্রিকাতে ডাকে পাঠাতে হয়। আমি পাঠিয়ে দিলাম, তখনকার দিনে পত্রিকাগুলোতে বিজ্ঞাপন থাকতো। লেখা পাঠান। বা তরুণদের লেখা চাই এরকম। তখন পূর্বদেশ বলে একটা পত্রিকা বের হতো অবজারভার হাউস থেকে। যেটার ছোটদের পাতার নাম ছিলো চাঁদের হাট।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: খুবই বিখ্যাত চাঁদের হাট।
ইমদাদুল হক মিলন:হ্যাঁ, যেটা এখন বিখ্যাত শিশু সংগঠন। খুব বড় সংগঠন। এই সংগঠনের সাথে পরে আমরা যুক্তও হয়েছিলাম। তো, তাতে আমি গল্পটা পাঠিয়ে দিয়েছি ডাকে, পরের সপ্তাহে গল্পটা ছাপা হয়েছে। তো, নতুন লেখক, একটা বাচ্চা ছেলে, গল্প পাঠিয়েছে তা ছাপা হয়ে গেছে, ছাপা হওয়ার পর আমি লক্ষ্য করলাম ঐ ছেলেটা যেমন অহংকারী ছিলো, আমার মনে হয়, আমি আরো বেশি অহংকারী হয়ে গেলাম। আমি পাঁচ ছয়টা পত্রিকা যোগাড় করে কাটিং সংগ্রহ করলাম। তখন একটা দৈনিক পত্রিকার দাম আট আনা। যাকে পাই তাকেই দেখাই, আমার লেখা ছাপা হয়েছে। সংবাদপত্র তো তখন বিশাল ব্যাপার। অনেকে দেখে বলে এইটা আমার নামে নাম, আসলে আমি না। এই অবস্থায় আমার মনে হলো যে, এটা প্রমাণ করতে হবে লেখকটা আমি। তারপর আমি উন্মাদের মতো লিখতে শুরু করলাম। যেইখানে যা পাই, অমুক পত্রিকা, তমুক পত্রিকা, কোনও বাছবিচার নাই। সর্বত্র লেখা পাঠাই এবং লেখা ছাপা হয়। তার ফলে হলো কি আমার মধ্যে একধরনের নেশা চেপে বসলো। আমি অনেকদিন ছাপার অক্ষরে নিজের নামটা দেখার লোভে লিখেছি। সাহিত্যটাহিত্য আমি বুঝি নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কবিতা লেখার চেষ্টা করেন নাই? সেই বয়সে তো সবাই কবিতা লেখার চেষ্টা করে বাংলাদেশে!
ইমদাদুল হক মিলন:কবিতা লেখার কোন চেষ্টা করি নাই। কবিতার যে ছন্দ মিল-টিল, আমার এ জিনিসটা আসতো না। গল্প বলার প্রতি একটা দুর্বলতা আমার ছিলো। সবসময়েই গল্প লিখতে চাইতাম। কাহিনীর প্রতি আমার একটা লোভ ছিলো। যেহেতু নানীর কাছে গল্প শুনে শুনে বড় হয়েছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মিলন ভাই, আপনি বললেন যে আপনার বাবা আপনাদেরকে বই কিনে দিতেন। ঠাকুমার ঝুলি এসব। আপনার বাবা কি করতেন? শৈশবে আপনার যতটুকু মনে আছে আপনাদের পারিবারিক অবস্থা কেমন ছিলো? বাবা কেমন ছিলেন? মা কেমন ছিলেন?
ইমদাদুল হক মিলন:বাবা মা থাকতেন ঢাকায়। আমি থাকতাম নানীর কাছে। ঈদের ছুটিগুলো তাই আমার কাছে খুব স্পেশাল ছিলো। সেসময় বাবা-মা অন্য ভাইবোনদের নিয়ে যেতো। আব্বা, গল্পের বই পড়তেন। আমরা কিন্তু মামাবাড়ি, নানাবাড়িতে মানুষ হয়েছি। আমাদের নিজেদের বাড়ি যেই গ্রামে, সেখানে কখনো থাকা হয়নি। একটা মধ্যবিত্ত পরিবার, সেখানে বইয়ের আলমারি ছিলো, সেখানে বিষাদসিন্ধু বা এ-জাতীয় বইপত্র ছিলো। বঙ্কিম, শরৎচন্দ্রের বইগুলো ছিলো। একটা পড়ার পরিবেশ ছিলো। আমার কোন আপন মামা নেই। আমার মায়ের যে চাচাতো ভাই-টাইয়েরা ছিলো তাদের মধ্যে একটা বই দিয়ে-নিয়ে পড়ার চল ছিলো। তখন এটাকে তারা নভেল বলতো। নভেল পড়া। সে-ই যে একটা বইপড়ার পরিবেশের প্রভাব আমার মধ্যে ঢুকলো, সেটা আমাকে প্রবলভাবে আচ্ছ্বন্ন করে রাখলো। এবং আমি পড়তাম।

যার ফলে আব্বা যখন ঈদের সময় বা অন্যসময় আমাকে দেখতে যেতেন তখন আমার জন্য একটা দুইটা বই নিয়ে যেতেন। কিন্তু আমাদের পরিবারের অন্য ভাইবোনের মধ্যে সেভাবে গল্পের বই পড়ার প্রবণতাটা ছিলো না। আর কাউকে আমি সেভাবে আমার মতোন পড়তে দেখি নাই। আমার বাবা ছোট একটা চাকরি করতেন, কেরানীর চাকরি। আমরা অনেকগুলো ভাইবোন। পুরান ঢাকার জিন্দাবাহার লেনে আমার প্রথম জীবনটা কেটেছে এবং তারপর গেণ্ডারিয়ায়। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত আমি বিক্রমপুরের স্কুলে পড়েছি। তারপর ঢাকায়। ছেলেবেলাটা বেশ দারিদ্র ইত্যাদির মধ্য দিয়েই কেটেছে। প্রচণ্ড অভাব, অভিযোগ ও কষ্টের মধ্য দিয়ে কেটেছে। একাত্তর সালে আব্বা মারা যাওয়ার পরে আমাদের কষ্টটা আরো বেড়ে গেলো। সংসারের একমাত্র রোজগারের মানুষটি চলে গেলেন। আমরা দশটা ভাইবোন। বড়ভাই মাত্র ইন্টারমিডিয়েট পড়ে। আমি এসএসসি (তখনকার মেট্রিকুলেশন) পরীক্ষা দেবো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি ভাইবোনদের মধ্যে কত নাম্বার?
ইমদাদুল হক মিলন:আমি ভাইবোনদের মধ্যে তিন। সবার বড় ভাই, তারপর বোন তারপর আমি। ভাইদের মধ্যে সেকেন্ড সেই অর্থে। তো, আব্বা মারা যাবার পরে দেশ স্বাধীন হলো। তখন এসএসসি পরীক্ষা দিলাম আমি। আমার বড়ভাই ইন্টারমিডিয়েট পাস করে একটা জায়গায় চাকরি নিয়েছে। তো, এই করে করে, একটা স্ট্রাগলের মধ্য দিয়ে আমাদেরকে আসতে হয়েছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন:মিলন ভাই,আপনি কবে ঢাকায় এলেন? ঐ গল্প ছাপা হওয়ার আগে না পরে?
ইমদাদুল হক মিলন:ঢাকায় এসেছি আমি সিক্সটি ফাইভে। ক্লাস সিক্সে এসে ভর্তি হয়েছিলাম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: না, ঢাকায় এলেন মানে হলো আপনার সাথে রফিক ভাইয়ের মানে কবি রফিক আজাদের পরিচয় হওয়া, উত্তরাধিকারে গল্প ছাপা হওয়া এটা কবে?
ইমদাদুল হক মিলন:এটা অনেক পরে, সেভেন্টি সিক্স এর দিকে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ঐ সময়টায় আমরা যেতে চাই। আপনার যে পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড ছিলো, আর কোন ভাইবোন কেউ সেভাবে গল্পের বই পড়তো না, আপনি পড়তেন, একজন লেখকের মতোন লোককে ঈর্ষা করে আপনি গল্প লেখা শুরু করলেন, যার গল্প ছাপা হওয়া আপনাকে উৎসাহিত করলো, এরপর যে সিরিয়াসলি লিখবেনই আপনি, কবিতার দিকে গেলেন না, গদ্য লেখালেখিই করবেন এই সিদ্ধান্ত, এই প্রতীতী কবে হলো আপনার!
ইমদাদুল হক মিলন:এটা মনে হলো, ঐ যে প্রথম লেখাটা ছাপা হওয়ার পর উন্মাদের মতো ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার লোভে লেখা শুরু করলাম। এরমধ্যে দু-একজন লেখকের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো, যেমন বুলবুল চৌধুরী, শেখ আবদুল হাকিম, শেখ আবদুর রহমান, তারপর সিরাজুল ইসলাম বলে একজন গল্প লিখতেন, ইঞ্জিনিয়ার, কবি, ফিউরি খোন্দকার, সুকান্ত চট্টোপাধ্যায় এরা গল্প লিখতেন, এদের সাথে একটু একটু করে পরিচয় হচ্ছে, বিচিত্রা নামে একটা খুব উল্লেখযোগ্য পত্রিকা বের হয় তখন। বিচিত্রাতে গল্প ছাপা হওয়া মানে লেখক হিসেবে বেশ স্বীকৃতি পাওয়া। তার আগে একটা ঘটনা ঘটেছিলো। আমি ছোটদের জন্য লেখা দিয়ে শুরু করেছিলাম।

হঠাৎ মনে হলো, আমি বড়দের জন্য লিখছি না কেনো? শঙ্খিনী নামে একটা গল্প লিখলাম। গল্পটা কেউ ছাপতে রাজী হলো না। যেই পত্রিকাতে দেই, বলে যে এটা অশ্লীল। আপত্তিকর। দূর সম্পর্কীয় এক ফুপুর সঙ্গে একটা কিশোর ছেলের সম্পর্ক। এরকম গল্প তো ছাপা যাবে না। এটা গল্প হয়নি। নানানরকম কথা । তো আমার মধ্যে একটা জেদ চেপে গেলো। তখন কোলকাতার পত্রিকাগুলো কিন্তু সব আসে আমাদের এখানে। সাপ্তাহিক দেশ, সাপ্তাহিক অমৃত। দেশ তো আনন্দবাজারের পত্রিকা। অমৃত বেরুতো যুগান্তর গ্রুপ থেকে। আমি কী মনে করে লেখাটা কোলকাতায় পাঠিয়ে দিলাম। এবং দেখো কী সৌভাগ্য, পরের সপ্তাহে লেখাটা ছাপা হলো। এবং ছাপা হওয়া মানে কি, অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে, প্রচ্ছদের পরে একটা বিজ্ঞাপন থাকে, তারপর সূচীপত্র, তারপরই পত্রিকার প্রধান কন্টেন্ট হিসেবে ইলাস্ট্রেশন করে গল্পটা ছাপা হয়েছে। যেটা আমি হিসাব করে দেখলাম যে ওদের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি মণীন্দ্র রায়। উনি আমার নাম-টাম দেখে ভেবেছেন যে হয়তো অনেক বড় লেখক, বয়স্ক লেখক।

ইমদাদুল হক মিলন, একটা লম্বা নাম। তো খুবই যত্নে তিনি গল্পটা ছাপলেন। ছাপা হওয়ার পরে কি হলো, ঐ পত্রিকাটা আমি সবার কাছে নিয়ে যাই, যারা যারা আমার গল্পটা ছাপে নাই তাদের কাছে গিয়ে দেখাই যে দেখেন কত যত্ন নিয়ে ভারতের একটা পত্রিকা আমার গল্পটা ছেপেছে। ঐ বয়সে যা হয় আর কী! এই যে দেখেন আপনে তো ছাপেন নাই, ওরা কেমনে ছাপছে! খুবই অহংকার তখন আমার। তারপর যেটা হলো, অমৃত পত্রিকাটা পপুলার ছিলো বাংলাদেশে। অনেকে আমাকে খুব সিনিয়র সিরিয়াস রাইটার মনে করতে লাগলো। এবং লেখা চাইতে থাকলো। লেখার চাপেও আমি প্রচুর লিখেছি তখন। বিচিত্রাতে একটা গল্প ছাপা হলো, মনে হয় না সজনী বা এরকম কিছু একটা হবে, ঐ গল্পটা ছাপার পরে আমি গিয়েছি বাংলা একাডেমিতে।

বাংলা একাডেমির একটা রুমে রফিক ভাই (কবি রফিক আজাদ), সেলিনা আপা (সেলিনা হোসেন), এবং রশিদ (হায়দার)ভাই বসা। তাদের মধ্যে একমাত্র রশিদ হায়দারের সাথে আমার পরিচয়সূত্র আছে। তার ছোটভাই জাহিদ হায়দার আমার বন্ধু। ততদিনে এদের সাথে আমার বন্ধুত্বটা হয়েছে, যারা তখন কবিতা লেখে, সাহিত্য করে, আমার বয়সী। উদ্দেশ্য একটাই, সেলিনা আপা ধানশালিকের দেশ পত্রিকার সম্পাদক, রফিক ভাই উত্তরাধিকারের সম্পাদক—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: যদি একটা লেখা চায়!
ইমদাদুল হক মিলন:একেবারে ঐ আশায় যাওয়া। ঠিক ধরেছো। হঠাৎ করে রফিক আজাদ, তখন রফিক ভাই টি-শার্ট পরা, হাতে বালা-টালা, বড় বড় চুল, এইরকম একটা তাগড়া লোক, ইয়া বড় বড় গোঁফ, আমি রফিক ভাইকে দূর থেকে চিনি, জানি উনি রফিক আজাদ। উনার তো আমাকে চেনার কোন কারণই নাই। ভম ভম করে মোটর সাইকেল চালানো একটা ডেসপারেট লোক। ঢাকা শহরের সবাই তখন রফিক ভাইকে চেনে। তো, রফিক ভাই সেখানে বসেই বিরাট হাঁক ডাক। পিয়নকে ডেকে বললেন, এই চা দাও। রশিদকে বলছেন এই রশিদ, পড়াশোনা কিছু করো! এই সপ্তাহের বিচিত্রায় একটা ছেলের লেখা দেখলাম। আউট অফ নাথিং কিন্তু, একেবারে আচমকা। এই সপ্তাহের বিচিত্রায় একটা ছেলের লেখা দেখলাম, ইমদাদুল হক মিলন। তুই চিনস? লেখাটা আমার ভালোই লাগলো। রশিদ হায়দার কয় কি, এই যে আমার সামনে বসে আছে। রফিক ভাই তো প্রবল উত্তেজিত, এই মিয়া এদিকে আসো। তো আমি গেছি। যাওয়ার পরে আমাকে বলে কী আমাকে একটা গল্প দিও তো, উত্তরাধিকারের জন্য। আমিতো গেছি এই আশাতেই, যদি কেউ লেখা চায়। তো গদগদ, একদম মুগ্ধ হয়ে গেলাম। হ্যাঁ রফিক ভাই। বলে যে এক সপ্তাহ সময়। এর মধ্যে দিবে। আমি পরের সংখ্যায় ছাপবো। তোমার ঐ বিচিত্রার লেখাটা ভালো হইছে। রফিক আজাদের মত লোক এটা বলা মানে যে, তখন একটা, ঐ বয়সে আমার মত নব্য লেখকের জন্য বিশাল ব্যাপার। রফিক আজাদ তখন মিথ অলমোস্ট।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ অলমোস্ট জায়ান্ট মিথ।
ইমদাদুল হক মিলন: আমি তখন এসে লেখা শুরু করলাম, ঐ রাতেই। লেখা শুরু করে এ রকম ফুলস্কেপের পাতায় আঠারো পৃষ্ঠা লিখলাম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এক রাতে?
ইমদাদুল হক মিলন:দু তিন দিনে। লিখি, কাটি, কারণ রফিক আজাদকে দিতে হবে। খুব যত্ন করে লিখার চেষ্টা করছি। গল্পটার বিষয়টা হচ্ছে যে আমার গ্রামে যে স্কুলটাতে পড়তাম তার পাশে একটা বাজার, নাম কাজির পাল্লা, ওখানে একটা মেয়েকে দেখতাম মাঝে মাঝে, যুবতী মেয়ে আলুথালু বেশে ঘুরে বেড়ায়, বাজারের লোকরা টিজ করে, বড় হয়ে বুঝেছি যে মেয়েটা আসলে বাজারের লোকজনের মনোরঞ্জনের জন্য, একটা পতিতা মেয়ে আর কী। বাজারি একটা মেয়ে, ভাঙ্গা বাড়ির মধ্যে থাকে। যাই হোক, ঐ বয়সে তো রহস্যটা বুঝিনি। এই গল্পটা লিখতে গিয়ে বুঝলাম। মানে গল্পটা শুরুই করলাম, আমি ঐ রকম একটা গ্রাম বাজার, কতগুলো চরিত্র, একজন ডাক্তার, দেশ ভাগের পরে এখানে একজন হিন্দু কম্পাউন্ডার কীভাবে বা কী ধরণের মানসিকতায় ভুগছে। বাজারে মুসলমানদের চেহারা কীভাবে বদলে গেছে, এই সব মিলিয়ে একটা লেখা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার গল্পের মধ্যে কিন্তু প্রথম দিক থেকেই মিলন ভাই, আমাকে যেটা আকৃষ্ট করে, দারুণ ডিটেইলিং থাকে!
ইমদাদুল হক মিলন: ডিটেইলটা ছিল, হ্যাঁ সে বাজারের মধ্যে একটা সার্কাস পার্টি আসছে, সেখানে একটা সার্কাসের জোকার, সব মিলিয়ে অনেকগুলো চরিত্র দেখতে; এর মধ্যে জানি না গল্পটা কোথায় শেষ হবে। আঠারো পৃষ্ঠা লেখার পরে দেখি যে, লেখাটা আমি যা বলতে চাচ্ছি বা যা লিখতে চাই তার কিছুই হয়নি। একটা চ্যাপ্টার হয়তো হয়েছে। কিন্তু রফিক আজাদ বলছে, পরের সপ্তাহে একটা ডেট দিয়েছে, যেতে হবে। তো ওটুকু লেখা নিয়ে আমি গেছি। যাওয়ার পরে রফিক ভাই বলে যে, এনেছো লেখা, আমি বলি, জী। দাও। রফিক ভাই একটু চোখ বুলিয়ে, ঠিক আছে, আমি দেখবো। বললাম যে রফিক ভাই একটু সমস্যা আছে। লেখাটা কিন্তু শেষ হয় নি। তো বললেন, বলো কী মিয়া! আঠারো পৃষ্ঠা লেখ্‌ছো তবু লেখা শেষ হয় নাই? কী লেখছো এইটা?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হা হা হা। কী ল্যাখছো?
ইমদাদুল হক মিলন: রফিক ভাই যেভাবে কথা বলেন। আমি বললাম যে আপনি একটু পড়ে দেখেন। বললো যে, হ্যাঁ আমি পড়ে দেখবো। পরের সপ্তাহে এসো। আবার গেছি। রফিক ভাই আমার দিকে তাকায়ে থাইকা বলে কি, বসো বসো বসো মিয়া। দাঁড়িয়ে আছি, তাকালাম আর কী। পিয়ন ডাকলো, বললো যে, দু কাপ চা দে। আগের দিন কিন্তু চা আমাকে অফারও করে নাই। চা খাও। আমি তোমার লেখটা পড়ছি, এই লেখাটা যত বড় হয় হোক, তুমি কিন্তু এইটারে ছোট করার কোন চেষ্টাই কইরো না। এটা যেভাবে লেখছো, তুমি লেইখা যাও। যত বড় হয় লেখাটা আমি ছাপমু। আঠারো সংখ্যা ধরে, শিমুল, আঠারো সংখ্যা ধরে রফিক আজাদ এই লেখাটা ছাপলেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: দুর্দান্ত।
ইমদাদুল হক মিলন: এটাই হচ্ছে আমার যাবজ্জীবন উপন্যাস। ১৯৭৬ সালে একটা ছেলের লেখা, এইভাবে বাংলাদেশের একজন বড় কবি যখন, জায়গাটা করে দেন তাঁকে এর চেয়ে বড় সাপোর্ট কিন্তু আর হতে পারে না। এবং এই আঠারো মাসের মধ্যে শহীদ কাদরী থেকে শুরু করে বাংলাদেশের যারা সাহিত্যের বোদ্ধা, হুমায়ূন আজাদ থেকে শুরু করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ডঃ আবু হেনা মোস্তফা কামাল, প্রত্যেকে আমার খোঁজ খবর করতে শুরু করলো যে, এই ছেলেটা কে? অনেকে আমাকে ডেকে ডেকে পাঠাতো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হুমায়ূন আজাদ খুব সম্ভবত খুব প্রশংসা করে ঐ লেখাটা নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলেন।
ইমদাদুল হক মিলন: হ্যাঁ। হুমায়ূন আজাদের মত, হুমায়ূন ভাইয়ের মত লোক কিন্তু কারো প্রশংসা করার মত লোক না। শামসুর রাহমানরেই পাত্তা দেন না, এই টাইপের তিনি। আচ্ছা যাই হোক। এই লেখাটা মোটামুটি ভাবে, এই লেখাটা লিখতে লিখতে, রফিক আজাদ আমাকে গুরুর মত করে অনেকগুলো জিনিশ শেখালেন। ততদিনে আমি রফিক ভাইয়ের মহা ভক্ত।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এবং আপনি একটি দুর্দান্ত লেখা লিখেছেন রফিক আজাদের ঐ সময়টা নিয়ে।
ইমদাদুল হক মিলন: রফিক ভাই আমাকে যে কী ভালোবাসে, ধীরে ধীরে এমন একটা সম্পর্ক হলো, সে আমাকে বলে, বেটা। আমি তাঁর ছেলের মত। এই চলো একটু মদ খাই। এই আমার সঙ্গে থাক, আজ রাতে, আড্ডা দিবোনি। এক বোতল মদ আমরা চাদরের তলায় করে নিয়ে গেছি । হয়তো আমার গেণ্ডারিয়ার বাসায় সে চলে এসেছে, বা তাঁর বাসায় আমি চলে গেছি। সে ধীরে ধীরে আমাকে শেখাতে লাগলো সাহিত্য জিনিশটা কী। যাবজ্জীবন পর্যন্ত কিন্তু আমার সাহিত্যের বোধ বলে কিছু নেই। আমার যা মনে হয়েছে আমি লিখেছি। এবং সে ফাঁকে ফাঁকে কিন্তু আমি নিরন্নের কালর গল্পগুলোও লিখেছি।

রফিকভাই আমাকে বললেন যেএই পড়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা পড়। এই পড় সেই পড়। একেকজন লেখকের কোন লেখা পড়তে হবে, প্রাচীন, আধুনিক সব একেবারে শীর্ষেন্দু, সুনীল পর্যন্ত, মতি নন্দী পর্যন্ত। দিনের পর দিন, ভাষা কী-রকম হওয়া উচিত,কন্টেমপোরারি লেখা কেনো পড়তে হয়, ক্লাসিকস কেনো পড়তে হয়, এসব তিনি আমাকে বোঝাতে লাগলেন। সারা পৃথিবীর ভালো লেখা কোনগুলো! গদ্য লিখবার জন্যও কবিতা কেনো পড়তে হয়! এবং তিনি এক সন্ধ্যায় আমাকে পরিস্কার বললেন যে, সেই গদ্যলেখকের পক্ষেই সবচেয়ে ভালো গদ্যলেখক হওয়া সম্ভব যে কবিতা পড়ে, কারণ কবিতা থেকে সে শব্দ নেবে, ভাষার চাতুর্য বা মাধুরী নেবে।

কবির কাছ থেকে একজন গদ্যকার ভাষার ব্যবহার কি হবে তা একেবারে শিক্ষকের মতো করে শিখতে পারেন। যথার্থ শিক্ষকের মতো করে রফিক ভাই আমাকে এসব করিয়েছেন। এবং আমি তার কথা মতোন লিখতে শুরু করলাম। মানে, রফিকভাই যেভাবে বলে সেই অনুযায়ী আমি একটা ভাষা তৈরির চেষ্টা করলাম। সেই ভাষায় আমি লেখার চেষ্টা করতে থাকলাম। তারপর আমি দ্বিতীয় উপন্যাস লিখলাম, একটা প্রেমের উপন্যাস, ও রাধা ও কৃষ্ণ। আর ঐ ফাঁকে ফাঁকে আমার যেটা হলো, প্রেমের লেখার দিকে আমার একটা ঝোঁক তৈরি হলো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: প্রেমের লেখা! আচ্ছা। এটা তো বেরুলো ১৯৮২ তে!
ইমদাদুল হক মিলন:হ্যাঁ, এই যে ও রাঁধা ও কৃষ্ণ লেখার সময় আবার কিছু প্রেমের গল্পও লিখছিলাম। প্রেমের লেখা লেখার একটাই কারণ, যদিও এটা কোন লেখকের অ্যাটিচুড হওয়া উচিত না আমি এখন মনে করি, কিন্তু ঐ বয়সে বা অনেকটা বয়স পর্যন্ত আমার মধ্যে এটা ছিলো যে আমি একজন জনপ্রিয় লেখক হতে চাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার সামনে জনপ্রিয় লেখকের আইডল কি হুমায়ূন আহমেদই ছিলেন!
ইমদাদুল হক মিলন: তখন হুমায়ূন ভাই জনপ্রিয় হননি, বাংলাদেশের প্রথম জনপ্রিয় লেখক আমি, ইমদাদুল হক মিলন। হুমায়ূন ভাই জনপ্রিয় হয়েছেন অ্যামেরিকা থেকে আসার পরে, এইটি ফাইভটাইভের পরে, আমি মোটামুটি শুরু থেকেই কিন্তু, ভালোবাসার গল্প বইটি বেরুবার পর থেকেই আমি একধরণের জনপ্রিয় লেখক।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি কী বইবিক্রির সংখ্যা দিয়ে জনপ্রিয়তা নির্ধারণ করছেন?
ইমদাদুল হক মিলন: হ্যাঁ, অবশ্যই। সারাবিশ্বেই বইয়ের বিক্রিই নির্ধারণ করে দেয় কে জনপ্রিয় কে অজনপ্রিয়। বড় লেখকেরা সবাই জনপ্রিয় লেখক ছিলেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি প্রথম কিভাবে টের পেলেন আপনি জনপ্রিয় লেখক? আপনি ষাট বছরের দ্বারপ্রান্তে, এখন বলছেন, বাংলাদেশের প্রথম জনপ্রিয় লেখক আপনি, এটা আপনি বুঝলেন কিভাবে?
ইমদাদুল হক মিলন: এটা টের পেলাম যখন বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে আমার কাছে অনবরত লেখা চাওয়া হতে থাকলো। এবং যখনি আমি একটা লেখা লিখি তখন এটা নিয়ে অনেক মানুষ কথা বলে। সাধারণ মানুষ কথা বলে। সাহিত্যিকরা একটু নিন্দামন্দ করে“এই ছেলে প্রেমের গল্প লেখে, যৌনতা নিয়া বাড়াবাড়ি করে”- কিন্তু সাধারণ ছেলেমেয়েরা, আমি ইউনিভার্সিটি টিএসসি বা বাংলা একাডেমি যেখানেই যাই লোকজন ভীড় করে।

আমি বইমেলায় গেলে মেয়েরা লাইন করে অটোগ্রাফ নিয়ে আমার বই কেনে। শুরুর দিক থেকেই এটা আছে। এই যে অবস্থাটা এর কারণে আমি বুঝতে পারছিলাম যে আমি জনপ্রিয় হচ্ছি। এবং রফিক ভাই আমাকে খুব গাইড করতেন, বলতেন, তুমি এই লেখাগুলো লেখো কোন সমস্যা নাই, কিন্তু আমি যে লেখাগুলোর কথা বলেছি, সেরকমও লিখবে। যা আমি সবসময় মাথায় রেখেছি। যার ফলে, তোমরা দুয়েকজন সিরিয়াস লেখক যারা আমার লেখা পড়ো, লক্ষ্য করবে আমি অলয়েজ কিন্তু দুরকম লেখার চেষ্টা করেছি। আমি একাধারে প্রথম উপন্যাস লিখলাম যাবজ্জীবন, দ্বিতীয় বই কিন্তু ও রাঁধা ও কৃষ্ণ। প্রথম গল্পের বই ভালোবাসার গল্প, দ্বিতীয় গল্পের বই কিন্তু নিরন্নের কাল। একদম দুটা আলাদা করে ফেলতে পারবা।

একটা দিকে আমার লোভ ছিলো, তাৎক্ষণিক প্রেম, স্বপ্ন, কল্পনা এসব লিখে ইয়াংদের কাছে আমি পপুলার হবো, আর অন্য যে লেখাগুলো আমি লিখি সেগুলো হয়তো একটু বোদ্ধা পাঠকরা গ্রহণ করবে। হয় করবেন নয় করবেন না, এমন একটা দোনামোনা ভাবও আমার মধ্যে ছিলো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন:মিলন ভাই, আমি যখন খুব ছোটোবেলায় আপনার লেখা পড়েছি সেটা আমাকে মুগ্ধ করেছে, এবং আমি প্রথম আপনার নাম কিন্তু জেনেছি টেলিভিশন নাটকের কারণে। এবং এটা বলতেই হবে যে, বারো রকমের মানুষ বা রূপনগর এর মধ্যে দিয়ে একদম প্রান্তিক মানুষের কাছ পর্যন্ত আপনি পৌঁছেছেন। তার বাইরে বিভিন্ন সময়ে আমরা আপনাকে টেলিভিশন অনুষ্ঠানে দেখেছি, আপনি খুব ভালো কথা বলেন, ফলে আপনি যখনি কোথাও বক্তৃতা করেছেন আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতোন শুনেছি। আমার মনে হয়, আপনার লেখায়ও একটা বিষয় প্রকট, যে আপনি বলছেন। এই ভঙ্গি আপনি কিভাবে রপ্ত করলেন! রফিকভাইয়ের কি কোন অবদান আছে এতে!
ইমদাদুল হক মিলন: খুব ভালো অবজারভেশন তোমার কিন্তু এটা ঠিক সচেতনভাবে করা না। আমার একসময় মনে হয়েছে যে একটা গল্প আমি বলতে চাই। সেটা পরিশীলিত, সুন্দর একটা ভাষায় বলতে চাই, এবং ভাষাটা এমন হবে যে সেটা মুখের ভাষা। আমি যেভাবে কথা বলি, কথা বলে যদি মানুষকে মুগ্ধ করতে পারি, সে যেমন মন্ত্রমুগ্ধের মতোন আমার কথা শোনে, তেমনি আমার লেখাটাকেও আমি সেরকম করতে চেয়েছি। যার ফলে আমার লেখা পড়তে শুরু করলে একটা মানুষ হোঁচট খাবে না এবং তার মনে হবে না যে সে অনন্তকাল ধরে পড়ছে। এটা কিন্তু একেবারে নিজের থেকে হওয়া, এটা আমাকে কেউ শেখায়নি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মিলন ভাই, প্রচুর লিখেছেন আপনি! ২৬৪টা বই আপনার! এতো ভালো লেখা কি সম্ভব!
ইমদাদুল হক মিলন: শিমুল, খুবই টেকনিক্যাল কোয়েশ্চেন। ২৬৪টা বই আমার। কিন্তু সবই কিন্তু আলাদা বই বা নতুন বই না। প্রকাশকরা আমাকে বিভিন্নভাবে বেঁচেন। এই যে তোমার সামনে ‘১৯৭১’ বলে একটা বই আছে, এরকম সংকলন

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ এরকম সংকলনও আপনার অনেক—
ইমদাদুল হক মিলন: এরকম সংকলন আমার আছে গোটা পঞ্চাশেক। সবমিলিয়ে ২৬৪টা। আমার মনে হয় না সেই অর্থে আমি খুব বেশি লিখেছি। হুমায়ূন ভাই আমার চেয়ে বেশি লিখেছেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তবুও, আপনি আমাদের প্রচুর লিখেছেন এমন লেখকদের একজন। আপনি কি কম্পিউটারে লেখেন?
ইমদাদুল হক মিলন: না, আমি হাতে লিখি। আমার একজন টাইপ করার লোক আছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমি ভাবছিলাম যে আপনার হাতে কি দাগ টাগ পড়ে গেছে কী না! বা আঙুলে!
ইমদাদুল হক মিলন: না, দাগ পড়ে নাই। তবে এখন লিখতে একটু আড়ষ্ট বোধ করি। এটা বয়সের জন্য হতে পারে (হাসি), এতদিন লিখেছি—
ইমদাদুল হক মিলন: এই যে দীর্ঘ সময়ের লেখালেখি মিলনভাই, তাতে তো আপনার অনেক বন্ধুরা আপনার শত্রু হয়েছে, অনেক অপরিচিত মানুষ পরিচিত হয়েছেন, এই সময়ের মধ্যে লেখালেখি নিয়ে আপনাকে নাড়া দিয়ে যাওয়া স্মৃতি কোনগুলো আসলে!
ইমদাদুল হক মিলন: নাড়া দেয়া, স্মৃতি, ঘটনা কিন্তু অনেক। একটা ঘটনার কথা আমার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। সেটা হচ্ছে ১৯৯৩ সাল, আমি বাংলা একাডেমী প্রাইজ পেয়েছি, সে বছর দুটো বই বেরিয়েছে আমার, না, তিন-চারটা বই বেরিয়েছে আমার, একটা উপন্যাসের নাম ভালোবাসার সুখ দুঃখ । বইটা পয়ষট্টি হাজার কপি বিক্রি হলো বইমেলাতে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন:মানে?
ইমদাদুল হক মিলন: এটা একটা রেকর্ড একটা বই মেলাতে। একজন লেখকের। এত বই এর আগে কখনো বিক্রি হয় নাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সিক্সটি ফাইভ থাউজ্যান্ড, হিউজ—
ইমদাদুল হক মিলন: আচ্ছা। এর পাশাপাশি আমি একটা মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস লিখলাম, সে উপন্যাসটার নাম হচ্ছে সুপুরুষ। ঐ বইটা দু হাজারও বিক্রি হলো না। তিন জন লেখক তখন তুঙ্গে বিক্রির। হুমায়ূন আহমেদ, তসলিমা নাসরিন, ইমদাদুল হক মিলন। নাসরিনও তখন খুব জনপ্রিয় ছিল। তো আমি একটা স্টলে বসি, স্টলটার নাম বিনোদন, ওরা আমার বই, মানে একক বইয়ের স্টল, একটা এরেঞ্জ করেছে, ওখানে এক দিনে ভালোবাসার সুখ দুঃখ বইটা এক হাজার কপি বিক্রি হয়েছিলো। তো আমি, ন্যাচারালি অটোগ্রাফ দিতে দিতে হাত ভেঙ্গে আসার কথা।

অটোগ্রাফ ছাড়াতো কেউ বই নেবে না, সব কিন্তু আসছে ওখানে অটোগ্রাফ নেয়ার জন্য। অটোগ্রাফ নেবে, বইটা নেবে। তো এক ভদ্র মহিলা অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে । দাঁড়িয়ে থাকার পরে আমি বললাম যে, দিন আপনার বইটা। বললো আমি বই নিতে আসিনি। এটা শুনে আমি থতমত খেয়ে গেলাম। সবাই অটোগ্রাফ নিচ্ছে, স্টল ভেঙ্গে ফেলছে, আটজন পুলিশ আমাকে পাহারা দিচ্ছে। ঐ অবস্থায় মহিলা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। দেখার পর আমাকে বললো যে আমি আপনার যাবজ্জীবন বইটা পড়েছি, আমি আপনার ভূমিপুত্র, পরাধীনতা এই লেখাগুলা পড়েছি।

তো আমার মনে হয়, আপনার জনপ্রিয়তার ইঁদুর দৌড়ে শামিল হওয়ার কোন দরকার নাই, আপনি অন্যরকম লেখক, এই যে আপনার হাজার হাজার বই বিক্রি হচ্ছে, এটা না হলে আপনার কিছু যায় আসে না। আমি হতভম্ব হয়ে মহিলার দিকে তাকিয়ে আছি। এবং সেদিন আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আমি অন্যরকম একটা উপন্যাস লিখবো। এবং তার পরদিন থেকে আমি নুরজাহান লিখতে শুরু করেছিলাম। এটিই আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিলো। আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্যার আমাকে খুব ভালোবাসতেন।

আমাকে একদিন বলেন যে আমি একজন লেখককে বিচার করি, আমার একটা গল্প বেরিয়েছিলো, গল্পটার নাম হচ্ছে গগন বাবুর জীবন চরিত। ওখানে একটা মৃত্যুর বর্ণনা ছিল। স্যার কেমন করে যেনো ঐ গল্পটা পড়েছিলেন, ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিলো। তো আমি যাবার পরে, উনিতো সবাইকে আপনি করে বলতেন। বললেন যে, বসেন, বসেন, বসেন। আমি একজন লেখককে বিচার করি তাঁর মৃত্যুর বর্ণনা দিয়ে। একজন লেখক কত ভালো মৃত্যুর বর্ণনা করতে পারছেন। এটা দিয়ে আমি একজন লেখককে বিচার করি। আমার কাছে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় খুব বড় লেখক এই কারণে যে দূর্গার মৃত্যুর মত মৃত্যু বাংলা সাহিত্যে নেই। আর আপনি একসময় খুব ভালো লিখবেন। আপনার এই গল্পটি আমি পড়েছি। এখানে যে মৃত্যুর বর্ণনাটি আছে, এ অসাধারণ!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: দারুণ ইন্সপায়ারিং—
ইমদাদুল হক মিলন:মানে আমি অনেক দিন ধরে এ কথাটা, এখনও পর্যন্ত মনে রাখি। যেমন নূরজাহান, স্বর্গপুরীতে একটা মৃত্যুর জায়গা আছে, আমি ওখানে, আমি জানিনা তুমি বইটা পড়েছো কি না!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: পড়েছি মিলন ভাই।
ইমদাদুল হক মিলন:তোমাকে আমি আজকে একটা বই দিয়ে দেবো। বইটা আছে আমি তোমাকে দিয়ে দেবো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই এডিশনটা নাই। এটা দুর্দান্ত এডিশন।
ইমদাদুল হক মিলন:তো যখন আমি মৃত্যুর জায়গা লিখছিলাম, শেষ হওয়ার পরে আমি অনেকক্ষণ বসে ছিলাম। মনে হচ্ছিলো, আবু হেনা স্যার বেঁচে থাকলে খুব খুশি হতেন, এ লেখাটা পড়ে। তাৎক্ষণিক ভাবে আমার এ দুটো ঘটনা মনে পড়ছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মিলন ভাই আপনি যে বলছিলেন যে, আমি একটা বিষয় খেয়াল করেছি, যে সব লেখা আমি পড়েছি। আপনার হাতে অনেক রকমের গদ্য আছে। আপনি চাইলেই যে কোন একটা অস্ত্র বের করে গুলি করতে করতে বেরিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু আপনি যে বললেন, একই সাথে দুহাতে ক্লাসিকাল এবং জনপ্রিয় ধারার লেখা লিখতে শুরু করলেন এবং সেটা, আপনার বইগুলা যে বেরুচ্ছে, তার ক্রম খেয়াল করে দেখলেই বোঝা যায়। জনপ্রিয়তা আপনাকে আসলে কী কী দিলো? মানে বাংলাদেশের প্রথম জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক ইমদাদুল হক মিলনকে জনপ্রিয়তা কী কী দিলো?
ইমদাদুল হক মিলন:এটা খুব ভালো একটা প্রশ্ন আমাকে করেছো। এ প্রশ্নটা আমাকে কেউ কখনো করেনি। জনপ্রিয়তা আমাকে একটা পর্যায়ে বাঁচিয়ে রেখেছিলো। আমি তোমাকে আগেই আমাদের পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডটা বললাম যে, ৭১ সালে আমার বাবা মারা যাবার পরে যে যুদ্ধটা আমাকে করতে হয়েছে। এ ভয়াবহ। তারপরে যখন দু’টা তিনটা বই বেরিয়ে গেছে, লিখছি, একটা পরিচিতি দাঁড়িয়ে গেছে। তখনও ঘোরে আছি আমি, অভাব সেভাবে কাটেনি। বরং ব্যবসা বাণিজ্য করার চেষ্টা করেছি। আমি জগন্নাথ কলেজে, অনার্স পরীক্ষা-টরীক্ষা দিয়েছি। ইউনিভার্সিটিতে পড়া হয়নি খরচের কারণে, কীভাবে যাবো এত দূর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সে কারণে জগন্নাথে।

যাই হোক সেই সময় দল বেঁধে সব যুবকেরা জার্মানিতে চলে যাচ্ছে—যে ওখানে গেলে রোজগারটা হবে। আমিও চলে গিয়েছিলাম শুধুমাত্র রোজগারের আশায়। গিয়ে দেখি অনেকেই কঠোর পরিশ্রমের যে শ্রমিকের জীবন কাটাচ্ছে, তা ভয়াবহ। তো ফিরে এসে আমি পরাধীনতা বা এ উপন্যাসগুলো লিখেছি। এই জীবনটা আমি মেনে নিতে পারিনি। আমার মনে হয়েছে আমি কম লিখতাম, ভালো লিখতাম, খারাপ লিখতাম, সেটা অন্য ব্যাপার, কিন্তু আমি একজন লেখক, আমি শ্রমিক হওয়ার জন্যে জন্মাইনি। আমি, বস্তা কাঁধে করে টেনে, রোজগার আমি করবো না। আমি আমার দেশে ফিরে যাবো।

একশ মাত্র ডলার নিয়ে, দুবছর পরে আমি জার্মানি থেকে ফিরে এলাম। ফিরে আসার পর আবার নানারকম চেষ্টা করি। রোববার পত্রিকাতে জয়েন করি। চাকরিটা চলে গেলো একটা লেখার কারণে। পুলিশদের বিরুদ্ধে একটা লেখা লিখেছিলাম, পুলিশ এত ক্ষিপ্ত হলো! ছোটখাটো ব্যবসা করতে যাই, যা করতে যাই, সর্বত্র ব্যর্থতা। ঐ ফাঁকে বিয়েও করে ফেলেছি, কোনভাবেই নিজেকে চালাতে পারি না। দশটা টাকাও রোজগার নেই। এবং যেখানে হাত দিই, সেখানে ব্যর্থতা। এক দুপুর বেলা বসে আছি, মানে, ওদিকে নিজেদের বাড়িতে মানে, ভাড়া বাসাই থাকি আমরা সবাই। সেই বাসা থেকে চলে আসতে হয়েছে।

অবস্থা এমন যে, আমাকে মোটামুটিভাবে বের করে দেয়া হয়েছে বলতে পারো। যে, আমি কোন কন্ট্রিবিউশন করতে পারছি না সংসারে। বউ আছে। তো আমার স্ত্রী একটু সচ্ছ্ল পরিবারের মেয়ে। আমার বড় মেয়েটা জন্মাবে। পঁচাশি সাল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ভয়ঙ্কর অবস্থা।
ইমদাদুল হক মিলন:মানে অকল্পনীয় একটা পরিস্থিতি। আমার পকেটে দশটা টাকা নেই। আমার শাশুড়ি বললেন যে তুমি আমাদের বাসায় এসে থাকো, সেটাও লেখক হিসেবে খুব অহংকারে লাগলো। শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ঘরজামাই থাকবো!
ইমদাদুল হক মিলন:হ্যাঁ। আমি বরং শ্বশুড় বাড়ির পাশে গিয়ে, দেড় হাজার টাকা দিয়ে একটা একতলা রুম,একটা বাসা ভাড়া নিলাম। ওখানে আমার একটা খাট, একটা লেখার টেবিল। এক বন্ধু একটা ফ্যান দিয়েছে। ওখানে বসে থাকি, মানে লিখতেও ইচ্ছে করে না। আমার বউ লজ্জায় ঐ বাসায় আসে না, তার রাজপ্রাসাদের মত বাড়ির পাশে, এখানে এই ফকিরিহালে, তাঁর হাজবেন্ড থাকে। টিফিন ক্যারিয়ার দিয়ে, একটা কাজের মেয়েকে দিয়ে আমার খাবার পাঠিয়ে দেয়। এরকম একটা পরিস্থিতি। রফিক আজাদ গেলেন একদিন। আমার সাথে আড্ডাটাড্ডা দিয়ে চলে এলেন, বললেন যে, জীবনে এসব হয়, এগুলা নিয়ে ভাববার কিছু নেই, লেখকদের এরকম হয়। বিরাট জ্ঞানফ্যান দিয়ে রফিকভাই চলে আসলো।

আমি দেখি কোথাও আমি দাঁড়াতে পারি না। দেড় হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া, স্ত্রীর গয়না বিক্রি করে দিলাম পরপর দু’মাস। তার পর এক দুপুরে বসে আছি, গরম বাইরে, ঘেমে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে যে, আচ্ছা আমি তো একটা কাজই পারি। যেটুকু শিখেছি, লেখাটা পারি। ঠিক আছে আমি লিখেই জীবন ধারণ করবো। যা হয়। যেভাবে হয়। এই আমি বসে লিখতে শুরু করলাম। সেই লেখাটা ধরো সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা-টাস্তা করে দুপুর পর্যন্ত। আবার দুপুর বেলা একটু খেয়ে-টেয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত। সন্ধ্যা বেলা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যাই। পকেটে দশটা টাকাও কিন্তু নেই। বাংলাবাজারে গিয়ে বসে থাকি। ও রাঁধা ও কৃষ্ণ (উপন্যাস) বেরিয়েছে। এসব বইয়ের ফলে জনপ্রিয় হয়েছি। তার ফলে, প্রকাশকদেরও একটু আগ্রহ আছে আর তখন প্রকাশকও দুটো তিনটে। অনন্যা, অন্যদিন, সময়, বিদ্যাপ্রকাশ, বুক সোসাইটি, এরা সবাই আমার বই দিয়ে উঠেছে। যাই হোক প্রতিদিন গিয়ে বসে থাকি।

একজন প্রকাশক বললেন, আমাকে মাসে একটা করে বই লিখে দিন। প্রতিমাসে একটা করে বই বের করবো আপনার। তো আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, আমাকে কত টাকা দেবেন? বললো যে দশ হাজার টাকা করে দেবো। দশ হাজার টাকা বিশাল ব্যাপার। কত পৃষ্ঠার, কী রকম বই হবে, বলে দিলো। এভাবে আমি কিন্তু এক দেড় বছর লিখলাম। প্রতিমাসে একটা করে বই লিখি। ঐ দশ হাজার টাকা দেয়। ধীরে ধীরে ওটা দেখি বাড়তে লাগলো। দু তিন মাস পরে দেখি যে পসারটা বাড়ছে, মানে বই বিক্রি হচ্ছে। আমি পনেরো হাজার টাকা পাচ্ছি। বিশ হাজার টাকা পাচ্ছি। এই করে করে, আট বছর, ১৯৯৩ সনে এসে আমার আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় না। আমি দেখি যে পাবলিক, তোমার ভাবতে খুব বিস্ময় লাগবে, ৯৩ সালে, ৯৪ সালে মেলার আগে তিরিশ লক্ষ টাকা আমাকে অ্যাডভান্স দেয়া হয়েছিলো লেখার জন্যে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হিউজ।
ইমদাদুল হক মিলন:অকল্পনীয় ব্যাপার। এই যে আজকের অন্যপ্রকাশ, এরা আমাকে তিন লাখ টাকা দিয়েছিলো ঐ সময়ে। আমি প্রথম অ্যাডভান্স নিয়ে লিখতে শুরু করলাম বাংলাদেশে। এবং অন্যদিন, অন্যদিন বলে একটা পত্রিকা আছে, ওরা আমাকে আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে প্রথম কাভার স্টোরি করেছিলো। ওদের প্রথম বই আমার লিখা। কি জন্য তৈরি করতে পারলাম? আমার ঐ পেছনে জনপ্রিয়তার জায়গাটুকু ছিল। যদি জনপ্রিয়তার ঐ জায়গাটুকু আমার ভেতরে না হতো, তরুণ-তরুণীরা আমার বই না কিনতো, তাহলে তো দাঁড়াবারই জায়গা থাকতো না আমার। আমি যাবজ্জীবন নিয়ে দাঁড়াতে পারতাম না, আমি ভূমিপুত্র নিয়ে দাঁড়াতে পারতাম না। হয়তো প্রশংসা করতো লোকে। এবং ঐ অবস্থা না থাকলে আনন্দ আমার বইও বের করতো না। আনন্দ যখন দেখলো যে, ও একজন হিউজ পপুলার লেখক বাংলাদেশে, ওর বই আমরা ছাপবো। তাই তো?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: দ্যাটস ইট।
ইমদাদুল হক মিলন:আর তা না হলে আনন্দ বাংলাদেশের কোন লেখকের সাড়ে সাতশো রুপির একটা বই, আনন্দ’র মত পাবলিশার্স। ক্যান ইউ বিলিভ ইট?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নো।
ইমদাদুল হক মিলন: ওরা তো আমাদের লেখকই মনে করে না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: লেখকই মনে করে না। এবং ভুল বানানে আমাদের নাম লেখে। কিন্তু আপনার নামটা বইয়ের ওপর ঠিক বানানেই দেখতে পাচ্ছি।
ইমদাদুল হক মিলন:হা হা হা, হ্যাঁ ঠিক বানানে লিখেছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জনপ্রিয়তা তাহলে আপনাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
ইমদাদুল হক মিলন:অবশ্যই। জনপ্রিয়তা আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে মানে পারিবারিকভাবে আমি দাঁড়িয়েছি। আমার সংসার যাপন করতে পেরেছি ভালো। জনপ্রিয়তার কারণে মানুষ আমাকে চিনেছে, মানুষ আমাকে নানারকমভাবে ভালোবেসেছে বলে, একটা পত্রিকারও সম্পাদক হতে পেরেছি। যদিও আমার সাংবাদিকতার স্ট্রং কোন ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। এবং গত বছর কলকাতা থেকে আমার তেরোটি বই বেরিয়েছে, ফেব্রুয়ারির বই মেলাতে। এবং এখন এই নুরজাহান সেকেন্ড এডিশন এখন ছাপা হচ্ছে কলকাতায়। তো যদি এই জনপ্রিয়তার শক্তিটা না থাকতো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু মিলন ভাই আপনার কী একবারও মনে হয় না, এই ‘জনপ্রিয়’ তকমা আপনার খুবই গুরুত্বপূর্ণ, খুবই ক্লাসিক্যাল ধাঁচের লেখাগুলোকে কম মূল্যায়ন করেছে? বা কম মূল্যায়ন ঘটেছে?
ইমদাদুল হক মিলন:অবশ্যই। এটা আমি বিশ্বাস করি কারণটা হলো আমাদের দেশের জনপ্রিয় লেখক মানে হচ্ছে, এক ধরণের সস্তা লেখক।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: না এটাকে বলা হয়—হুমায়ূন আহমেদ খুব মজা করে বলতেন বাজারি।
ইমদাদুল হক মিলন:বাজারি বলো আর যাই বলো, খুব সস্তা একটা তকমা লাগিয়ে দেয়া হয়, কিন্তু যারা এই তকমাটা লাগান তারা একবারও ভাবেন না যে পৃথিবীর সব বড় লেখকই জনপ্রিয় লেখক। রবীন্দ্রনাথ এর চেয়ে জনপ্রিয় লেখক আর কে ছিলেন?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: খুবই সত্য কথা। এর জনপ্রিয় আর কে আছেন?
ইমদাদুল হক মিলন: এর চেয়ে জনপ্রিয় বা মার্কেজ-এর চেয়ে জনপ্রিয় আর কে আছেন? হ্যামিংওয়ে। বড় লেখক জনপ্রিয় লেখক হতে বাধ্য। ব্যাপারটা কিন্তু এই জায়গায়, কিন্তু আমাদের দেশে যেটা হচ্ছে, এটা খুব দুঃখজনক ভাবেই হলো, জনপ্রিয় লেখক মানে সস্তা লেখক। এরা কোন লেখকেরই পর্যায়ে পড়ে না। ধরো হুমায়ূন আহমেদ লক্ষ লক্ষ পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছেন। এই লক্ষ পাঠকের মধ্যে কী সবাই গবেট? ওর মধ্যে কিন্তু তোমার আমার চেয়ে বহু উচ্চশিক্ষিত মানুষ আছে। অনেক বেশি সাহিত্য বোঝা মানুষ আছে। এই যে এই মাপের একজন লেখক বা ধরা যাক শরৎচন্দ্র, এখনও জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। তো এই লেখকদের লেখা কী খুব অশিক্ষিত লোকেরা পড়ে? সাহিত্য বোঝে এমন লোকেরা পড়ে? হুমায়ূন আহমেদের মত মানুষের এমন অনেক গল্প আছে আমি মনে করি অতুলনীয়। তাঁর অসাধারণ অনেক গল্প আছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কালের কণ্ঠের ঈদ সংখ্যায় চোখ নামের একটা গল্প ছিল।
ইমদাদুল হক মিলন: তুমি ভেবে দেখোতো! এরকম গল্প হুমায়ূন আহমেদ ছাড়া, ভাবা যায়! হুমায়ূন ভাই খুব বড় লেখক এবং বড় লেখক বলেই জনপ্রিয় লেখক। তো, আমি মনে করি, আমাদের দেশে যে জনপ্রিয় লেখকদেরকে এক ধরণের অবজ্ঞা, অবহেলা দেয়ার ব্যাপার আছে, তা এক ধরণের ভুল মানসিকতা। এবং এটা মানুষকে খাটো করে দেখার একটা প্রবণতা। যার ফলে অনেক সময় আমি একজন জনপ্রিয় লেখক এই কথাটা বলতে, আমি এক ধরণের সংকোচ বোধ করি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মিলন ভাই, এই সংকোচ লাগার কিছু নাই শেষ পর্যন্ত। আপনার টেলিভিশন নাটক নিয়ে কথা বলতে চাই। হুমায়ূন আহমেদ যেই সময় জনপ্রিয় হলো, আপনি আগে হলেন না হুমায়ূন আহমেদ আগে হলো?
ইমদাদুল হক মিলন:হুমায়ূন ভাইয়ের ব্যাপারটা কী, হুমায়ূন ভাই পঁচাশি সালে, এইসব দিনরাত্রি নামে, একটা ধারাবাহিক লিখতে শুরু করেন। এবং এটা এমন জনপ্রিয় হলো, এই জনপ্রিয়তা তাঁর সাহিত্যের ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করলো। এবং ঐ নাটককে ধরে তাঁর বইয়ের বিক্রি হুহু করে বেড়ে গেলো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: প্রচণ্ড বেড়ে গেলো।
ইমদাদুল হক মিলন: হ্যাঁ । তো হুমায়ূন ভাই হলেন নাটক লিখে তাঁর বইকে জনপ্রিয় করেছেন, কিন্তু আমি নাটকের জগতে যাবার আগে, বই লিখেই বইটাকে জনপ্রিয় করেছিলাম। যদি ব্যবধানের কথা বলো তো ব্যাপারটা এই জায়গায়। তো হুমায়ূন ভাই যেখানে হাত দিয়েছেন, সেখানেই সোনা ফলেছে। নাটকে তাঁর ধারে কাছে কেউ ছিল না। গল্প উপন্যাসে আর কী বলবো, এ কথা আমরা সবাই জানি। এমন কী তিনি গান লিখেছেন, গানগুলি অসাধারণ। বিজ্ঞাপন তৈরি করেছেন, সেটা ভালো হয়েছে। সিনেমা বানিয়েছেন, যে জায়গায় হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলেছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আগুনের পরশমনি, শ্রাবণ মেঘের দিন, শ্যামল ছায়া—
ইমদাদুল হক মিলন:সব মিলিয়ে হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ূন আহমেদ। তাঁর তুলনা তিনি নিজে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু আপনার, আপনি যখন নাটকে এলেন, মানে বারো রকমের মানুষ আগে না রূপনগর আগে…
ইমদাদুল হক মিলন: আমি তোমাকে বলি, আমার নাটক কিন্তু তারও অনেক আগে জনপ্রিয়, রূপনগর কিংবা বারো রকমের মানুষেরও আগে—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আচ্ছা
ইমদাদুল হক মিলন: আমি প্রথম টেলিভিশন নাটক লিখেছিলাম, এটা ৮৪, ৮৫ সালের দিকে। আমি একটা ধারাবাহিক নাটক লিখেছিলাম, যেটা এক পর্ব হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। তার আগে আমার দুটো একটা সপ্তাহের নাটক হয়েছে, কিন্তু খুব জনপ্রিয় নাটক হলো আমার সেই একপর্বের নাটকগুলি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: রূপনগর?
ইমদাদুল হক মিলন:না তার আগে একটা দুটো নাটক আছে। আমি একটা নাটক লিখেছিলাম, কোন কাননের ফুল, ধারাবাহিক।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটার নাম আমি শুনেছি কিন্তু যেহেতু খুব ছোট ছিলাম তখন মনে নেই অত।
ইমদাদুল হক মিলন: খুব জনপ্রিয় হয়েছিলো। কিন্তু তার আগে আমি একটা খণ্ড নাটক লিখে একদম মাত করে দিয়েছিলাম, যত দূরে যাই। তিন পর্বের নাটক। একটা একটা করে এক সপ্তাহ পর পর প্রচার হয়েছিলো। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিল এ নাটক। তার পরে যেটা খুব জনপ্রিয় নাটক, বারো রকমের মানুষ। তার পরে রূপনগর। এভাবে একের পর এক নাটক আমি লিখে গেছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অসাধারণ। মিলন ভাই এই যে আপনার লেখালেখির জীবন, ছুটছেন আপনি, পেছনের দিকে তাকালে, সবচেয়ে বেদনার ঘটনা কোনগুলো মনে পড়ে? এই যে একটা বেদনার কথা আপনি আমাকে বললেন।
ইমদাদুল হক মিলন: কোনটা বলো তো?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই যে শ্বশুড় বাড়ির পাশে গিয়ে একটা দেড় হাজার টাকার বাসায় উঠেছেন। ভাবী টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার পাঠাচ্ছে। নিজে আসতে লজ্জা পাচ্ছে।
ইমদাদুল হক মিলন: হা হা হা। এরকম বেদনার ঘটনা অনেক। আসলে বেদনার কথাগুলোকে আমি অনেক দিন আগে, একটা সেন্টিমেন্টাল সিনেমা দেখেছিলাম, সিনেমাটার থিমটা ছিল, এরকম, দুঃখ একার জন্য, আনন্দ সবার জন্য। দুঃখের কথাগুলো নিজের মধ্যে চেপে রাখা খুব ভালো। আনন্দটা সবার সঙ্গে শেয়ার করলাম। অনেক কিছু তোমার সঙ্গে শেয়ার করলাম। দুঃখের ঘটনা অনেক। জীবনে অনেক অপমান, অনেক অপদস্থ হওয়া, সাহিত্য নিয়ে অনেক নিন্দা মন্দা শুনেছি। তো সেগুলো আর মনে করতে চাই না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: প্রাপ্তির কথাই বলেন তাহলে!
ইমদাদুল হক মিলন: প্রাপ্তিটা বিশাল। প্রাপ্তিটা বিশাল মানে কী, এই যে আমার মত একজন সামান্য লেখককে মানুষ এত ভালোবেসেছে। বই কিনেছে, এখনও। সেদিন একটা ইউনিভার্সিটিতে বক্তৃতা দিতে গেছি, আমি যখন কথা বলছিলাম তখন দেখলাম আস্ত হল মন্ত্রমুগ্ধের মত—যখন আমি বক্তৃতা শেষ করলাম। প্রায় ৪৫, ৫০ মিনিট পরে, প্রত্যেকটা ছেলেমেয়ে শিক্ষকরা দাঁড়িয়ে করতালি দিতে লাগলো। তো দুঃখ বেদনা, রবীন্দ্রনাথের মত মানুষের কত ধরণের অপমান সইতে হয়েছে। তো সেটা লেখকদের যে কোন ক্রিয়েটিভ মানুষের এই দুঃখ, বেদনা থাকবেই। হুমায়ূন ভাই এবং আমি গিয়ে বাংলাবাজারে বসে থেকেছি।

প্রকাশকের ওখানে, সারাদিন বসে আছি । বললো যে, হ্যাঁ টাকা দেবে আমাদেরকে। দুপুরে হুমায়ূন ভাই আর আমি এক দোকানে গিয়ে পরটা খেয়ে আসলাম। ভাত-টাত খাওয়ার পয়সাও নাই। তো এই অবস্থায় সারাদিন বসিয়ে রেখে, প্রকাশক বললো যে আজ হবে না। তখনও কিন্তু আমরা দুজনই বাংলাদেশের সব চাইতে জনপ্রিয় লেখক। এটা ধরো ৮৬, ৮৭ সাল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এরকম ঘটনা ঘটেছে !
ইমদাদুল হক মিলন: এরকম ঘটনা অনেক ঘটেছে। আমার বড় মেয়েটা জন্মালো ৮৫ সালে। আমাকে প্রকাশক বলেছে, আমার বই চলে। প্রকাশক বলেছে আসো, আজকে তোমাকে পাঁচশো টাকা দেবো। আমি সারাদিন বসে আছি। আমার মেয়েকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করবো, চারশো টাকা লাগবে। সারাদিন বসিয়ে রেখে বিকেল বেলায় দেয়নি। আমি বাংলা বাজার থেকে হেঁটে হেঁটে ধানমন্ডি ক্লিনিকে আসছি। এসে বলছি যে আমি তো টাকাটা জোগাড় করতে পারিনি। আমার স্ত্রী’র বড় ভাই টাকাটা দিয়ে দিয়েছে। এরকম দিন গেছে অনেক। প্রচণ্ড ব্যর্থতা অপমান নিয়ে আমি লিখতে বসেছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মিলন ভাই আপনার মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস বেশ আলাদা ইন্টারপ্রিটেশনের, এমনকী গল্পও, মানে মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার বয়স কত?
ইমদাদুল হক মিলন:পনেরো বছর বয়স।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তার মানে আপনার খুব তাজা সব স্মৃতি?
ইমদাদুল হক মিলন:হ্যাঁ। মুক্তিযুদ্ধটাকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমার ঢাকার গেণ্ডারিয়া, এবং বিক্রমপুরের কতগুলো গ্রামে আমার দিনগুলো কেটেছে। এবং যেদিন স্বাধীন হলো তার দু দিন পরে আমি নৌকায় করে ঢাকা আসলাম। বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরীতে আমি লাশের পর লাশ ভেসে থাকতে দেখেছিলাম। এবং গ্রামের পর গ্রাম জ্বলছে, আমি দৌড়ে পালাচ্ছি। ঢাকার গেণ্ডারিয়াতে থাকি, রাজাকাররা এসে খবর দিলো যে কালকে আমাদের পাড়ায়, মিলিটারি আসবে, একজন লোককে মেরে ফেলবে। কেউ বুঝতে পারছে না, কাকে মারবে। আতঙ্কের অবস্থাটা বোঝ তুমি, সাধনা ঔষধলায়ের যে মালিক চন্দ্রবাবু, তিনি জগন্নাথ কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন, সতেরো, আঠারো বছর।

ভাগলপুর থেকে পাশ করা, পি এইচ ডি করা একজন মানুষ, ছিয়াশি বছর বয়স। হাঁটতে পারে না। মেরে ফেলে রেখে গেলো। আমাদের চোখের সামনে দেখা। মুক্তিযোদ্ধারা ছড়াচ্ছে চারিদিকে। আমার নানার বাড়িতে গেছি, আমার মায়ের মামাবাড়ি, বিকেল বেলায় দেখি সামনে দিয়ে গুলির পর গুলি। মানে চোখের সামনে যে জায়গাগুলো দেখা। রাজাকারকে ধরেছে, রাজাকার বলছে, আমাকে ধরেন কেন? আমি রাজাকার হবো না? আমাকে সরকার থেকে বেতন দেয়? আমি বউ বাচ্চা নিয়ে খেতে পারতাম না। এখন খেতে পাই। মুক্তিযোদ্ধারা বলছে যে, তুমি জানো, যে এই দেশটা নিয়ে একটা যুদ্ধ হচ্ছে? এবং কেন যুদ্ধ হচ্ছে, ধরো তোমাকে একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাই, তুমি একটা ক্ষেতে ধান চাষ করেছো। ধান পেকে গেছে, একদল লোক এসে সেটা কেটে নিয়ে গেছে, তাহলে তুমি কী করবে? তুমি এই মানুষগুলাকে সাপোর্ট করেছো। তাহলে আমাকে খাল পারে গিয়ে মেরে ফেলেন। আমি গল্প লিখলাম, লোকটা রাজাকার ছিল। এইগুলা আমি দেখেছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মিলন ভাই লেখকদের মধ্যে সরাসরি না হলেও ভার্চুয়াল এক ধরণের যোগাযোগ এখন আছে । সেদিন আপনার উপন্যাস নিয়ে কথা হচ্ছিলো কয়েকজনের সাথে। আপনার ইন্টার্ভিউ নেবার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আর কী। আমি কথা বলছিলাম কয়েকজনের সাথে। প্রচেত গুপ্তর সাথে কি আপনার যোগাযোগ আছে?
ইমদাদুল হক মিলন:হ্যাঁ, ও নিজেও খুব ভালো লেখে। আমার ফ্যান।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আচ্ছা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তো পশ্চিমবঙ্গের যে ধরণের গদ্য, সুনীল বাদই দিলাম, সমরেশ বা শীর্ষেন্দু—
ইমদাদুল হক মিলন: শীর্ষেন্দু

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শীর্ষেন্দু বা এখন যারা লিখছেন। যে ধরণের গল্পের একটা ফ্লো উঠে আসছে এখন, আমাদের এখানে কিন্তু, আপনি বা হুমায়ূন স্যারের পরে উত্তরাধিকার সুত্রে গড়ে ওঠেনি। পশ্চিমবঙ্গে উত্তরাধিকারের একটা লিগ্যাসি তৈরি হয়েছে, আমাদের এখানে হয়নি। একজন অগ্রজ লেখক হিসেবে, এ ব্যাপারটাকে আপনি কী রকম ভাবে দেখেন?
ইমদাদুল হক মিলন: আমি যখন শুরু করলাম। ধীরে ধীরে রফিক আজাদের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো। উনি আমাকে ভাষার ব্যাপারটা সচেতন করলেন, এবং আমাদের এখানকার তুমি যদি হুমায়ূন ভাইয়ের কথা বলো, তাঁর একটা নিজস্ব ভাষা ছিল এবং সেটা কমিউনিকেটিং একটা ল্যাংগুয়েজ, যে কেউ তার ভাষাকে খুব সহজে পড়ে যেতে পারতো। আমাদের হাসান আজিজুল হকের ভাষা খুব চমৎকার, আমাদের মাহমুদুল হকের গদ্য আমার খুব পছন্দের ছিল। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গদ্য আরেক মাত্রার। এরা প্রত্যেকেই গদ্য শিল্পী হিশেবে, অনেক বড়।

সৈয়দ শামসুল হকের গদ্য, তো এই যে সব মিলিয়ে যদি আমি বা হুমায়ূন আহমেদ বা আমাদের অগ্রজ হিশেবে যদি তুমি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে ধরো বা হক ভাইয়ের প্রথম দিককার গদ্য ধরো, সব কিছু মিলিয়ে আমরা মুখের ভাষাটিকে সাহিত্যের একটি ভাষা করার চেষ্টা করেছি। বা তুমি এই জিনিশটা বললেও যে লেখা পড়লে মনে হয় কথা শুনছো। এই জিনিশটা আমরা তৈরি করতে পেরেছিলাম। পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু এই প্র্যাকটিসটা আরও আগে হয়েছে। ধরো সুনীল, বুদ্ধদেব বসুর ভাষা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ।
ইমদাদুল হক মিলন: বা বিমল করের ভাষা বা তারও পরে এসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষা। শীর্ষেন্দুর ভাষা। সমরেশ মজুমদারের ভাষা আমার কাছে তুলনামূলকভাবে একটু আড়ষ্ট মনে হয়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আবুল বাশারের ভাষা।
ইমদাদুল হক মিলন: ভাষা একটু অন্যরকম কিন্তু প্রত্যেকের একটা নিজস্ব..

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ভঙ্গি আছে।
ইমদাদুল হক মিলন: ভঙ্গি আছে। এই ভাষাভঙ্গিটা আমাদের এখানে গুটিকয়েক লেখক ছাড়া রপ্ততো হয়ই নি, পরবর্তীকালের লেখকদের মধ্যে কারোরই এটা হয় নি। তুমি একটা বই এভাবে তুমি ঢেকে দিলে, ঢেকে দিয়ে যদি একটা প্যারা পড়ো তুমি বুঝে নেবে হুমায়ূন আহমেদ না ইমদাদুল হক মিলন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমি সিগনেচারটার কথাই বলছি, এটা দাঁড়ায় নি।
ইমদাদুল হক মিলন: এটা দাঁড়ায়নি। আমার মনে হয় যে আমাদের পরবর্তী সময়ের যে লেখক তারা এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আসলে ভাবেই না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন:আপনার পরে লিখতে এসেছেন যারা তাদের মধ্যে দুজনের নাম যদি বলতে বলা হয় কাদের কথা বলবেন!
ইমদাদুল হক মিলন: আমার পরের দুজনের কথা আমি বলতে পারি, যাদের লেখা আলাদা করে আমার ভালো লাগে। আনিসুল হক ও আহমাদ মোস্তফা কামাল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন:আপনার প্রাপ্তির কথা বলছিলেন মিলন ভাই! আপনি যে জনপ্রিয়—
ইমদাদুল হক মিলন:একবার আমরা রাঙামাটি বান্দরবান ঘুরতে গিয়েছি। পাহাড়ের উপর একটা মন্দির দেখতে গেছি সেদিন। তো একজন এসে ভিক্ষা চাইলো। আমি দিলাম। আমার এক বন্ধু আমাকে দেখিয়ে ঠাট্টা করে ভিক্ষুককে জিজ্ঞেস করলো, চেনেন একে? আমার দিকে তাকিয়ে সে বলে কি, বাংলাদেশের কোন মানুষ ইমদাদুল হক মিলনকে চেনে না? ঐ মন্দিরে থাকা ভিখিরিদের মধ্যে থেকে একজন এটা বললো। এবং আমি আঁতকে উঠেছিলাম। আমার কাছে মনে হয় আমার জীবনে এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর নেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: দুর্দান্ত।
ইমদাদুল হক মিলন:আমার কাছে মনে হয় যে জীবনে যত পুরষ্কার পেয়েছি তার মধ্যে লোকে আমাকে যে সম্মান দিয়েছে, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আমার আর নেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মিলন ভাই, এই যে লিখালিখির এত, এই যে জীবন, এই যে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, এই যে বেঁচে থাকা, এই যে আমাকে আজকে একটু সময় দিলেন, কী মনে হয়, কী কাজ বাকি রইলো? পরিকল্পনায় যা কিছু ছিলো, সব হলো!
ইমদাদুল হক মিলন:পরিকল্পনায় যা ছিল সেটা, আমার যতটুকু চিন্তা ভাবনা, আমি কখনো সঠিক পরিকল্পনা করে কোন কিছু করিনি। খুব পরিকল্পনা করে আমি আসলে কিছু লিখিনি। নূরজাহান লিখতে গেছি, লিখাটা এগিয়েছে এবং আমি দেখেছি সেটা তাকিয়ে তাকিয়ে, কলমটা ছেড়ে দিয়েছি। লেখাটা যেদিকে যায় যাক। যেতে থাক। ওগুলা আমি এই ভাবে লিখেছি। যেটা তোমাকে বলছিলাম যে, আমি কোন পরিকল্পনা করে কখনো আগাইনি বা লিখতে শুরু করিনি। কোন কোন লেখা, পরাধীনতা এক রকমভাবে লেখা, যাবজ্জীবন এভাবে লেখা ছিল, নুরজাহান। যেমন আমি বাহাদুর বলে একটা উপন্যাস লিখলাম । আমি থাকতাম বিক্রমপুরে, বর্ষাকাল, তখনকার বর্ষা মানে কিন্তু গভীরতর বান,বন্যা ঘরের ভেতর পানি ঢুকে যায়। তো আমি করতাম কী, আমাদের বিশাল টিনের ঘর, তার বাইরের দিকটায় আমি, একটা কাঠি পুঁতে রাখতাম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: পানি কতটুকু বাড়লো তা মাপার জন্য!
ইমদাদুল হক মিলন:তার মাপটা কতটুকু হয়। আর আমার একটা মামা ছিল, ঠাট্টা করতো, আমাকে বললো, পরদিন হিন্দুদের মত ভাষা করে যে, জল কত হইলো। আমি এখান থেকে একটি উপন্যাস শুরু করলাম, নাম বাঁকা জল। আমি জানিও না যে লেখাটা কোনদিকে যাবে। তারপর গিয়ে দেখি যে একটা জায়গায় লেখাটা থামলো। শওকত আলী স্যার খুব উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। যাই হোক আমি বিক্রমপুরের জীবন কাটিয়েছি। প্রথম দিকে বিক্রমপুরের সঙ্গে যোগাযোগটা আমার ছিল। আমার যাবতীয় গ্রাম বিষয়ক রচনাগুলি বিক্রমপুরকে নিয়ে। কিন্তু আমি যে দীর্ঘ জীবন ঢাকায় কাটালাম, ঢাকার, পুরান ঢাকার জীবন আমার লিখায় সেভাবে আসেনি। আমি জিন্দাবাহার, একেবারে ঢাকার আদি জায়গা,

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: পুরান ঢাকার একেবারে আদি জায়গা
ইমদাদুল হক মিলন: হ্যাঁ, হ্যাঁ, জায়গা, ওখানে আমি ৬১ সাল থেকে বিক্রমপুরে যেতাম আসতাম। ওখানকার একটা বাসায় আমার জীবন কেটেছে। গেণ্ডারিয়ার একটা বাসায়, আমার বয়স দিনে দিনে বেড়েছে, ঢাকা শহরকে আমি দিনে দিনে আমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বড় হতে দেখলাম। এই বিষয়টি আমি আমার লেখায়, বলতে চাই একটা বড় অংশ। হয়তো পুরান ঢাকার জীবন নিয়ে আমি এক দীর্ঘ বই লিখবো। একটা পার্ট আমি এবার লিখেছি। ঈদ সংখ্যা প্রথম আলোতে আমি একটা সংখ্যা লিখেছি, মনে আছে জিন্দাবাহার। এটা হচ্ছে ফার্স্ট পার্ট। এবং কয়েকটা পর্বে আমি লিখাটা দিতে চাই, আপাতত এই হচ্ছে আমার পরিকল্পনা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হুমায়ূন আহমেদ ও আপনার মধ্যে একটা পার্থক্যের কথা আমার মনে হয়, হুমায়ূন আহমেদের লেখা যত বেশি সংলাপ-নির্ভর আপনার লিখা তার চেয়ে বেশি বর্ণনা-নির্ভর। এবং সংলাপ বেশি নাই আপনার লেখায়। বর্ণনায় আপনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন । মানে আমরা দেখেছি যে আপনার যে সমস্ত লেখা আছে বলেন, প্রচুর গল্প এবং উপন্যাস। আমি মনে করি ছোট গল্পকার হিশেবে, এটা আমি মনে করি আপনার পাওনাই, একটা আলাদা জায়গা আছে আপনার। আপনি কি সেটার সাথে একমত?
ইমদাদুল হক মিলন: হ্যাঁ, এই ব্যাপারটা কি আসলে যদি বিনয় করেও বলি, অত পাওয়ারফুল লেখক আমি আসলে না। কিন্তু একটা জিনিশ আমি

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি বিনয় করছেন। বিনয়ের বাইরে যদি একটু বলেন।
ইমদাদুল হক মিলন:(হেসে) না। আমি তোমাকে একটা জিনিশ বলতে পারি, সেটা হচ্ছে যে হ্যাঁ, প্রচুর উপন্যাস আমি একটানা লিখে গেছি। ঐ যে তোমাকে আমি খানিকক্ষণ আগে বলেছি, টাকা পয়সার ব্যাপার ছিল, এই সেই গেছে। আমার মনে হত যে যত দ্রুত পৃষ্ঠা ভরিয়ে দিতে পারি আমি। সংলাপ হোক, এই হোক সেই হোক, সাদামাটা একটা কাহিনী দিয়ে হোক বা না-কাহিনী দিয়ে হোক যাতে পাঠক সেটা পড়ে। আমি অত ভেবে অনেক উপন্যাস লিখিনি। কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি, গল্পগুলো ভেবে লিখতে। আমি আশা করি, তুমি পড়ে দেখবে আবার।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ আমি পড়েছি।
ইমদাদুল হক মিলন: ভেবে লিখার চেষ্টা করেছি। অবশেষে

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: একটা ছোট্ট আত্মজীবনী আপনি লিখেছেন। নাম বন্ধুবান্ধব।
ইমদাদুল হক মিলন:এটা আসলে আত্মজীবনী না বলে সেটা তুমি আমার খুব প্রিয় বন্ধুদের নিয়ে

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা আপনি আত্মজীবনী বলতে পারেন,
ইমদাদুল হক মিলন:আত্মজীবনীর অংশ বলতে পারো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আলাভোলাইতো। মানে আত্মজীবনীর অংশ।
ইমদাদুল হক মিলন:আমি আত্মজীবনীর কয়েকটা পৃষ্ঠা লিখেছি। নাম দিয়েছি, কেমন আছো সবুজ পাতা। এটা আমার কেউ জানে না। এখন আমি আমার অন্য অংশগুলো ধীরে ধীরে ধীরে ধীরে লিখবো। এবং জিন্দাবাহার যেই লেখাটির কথা বললাম সেটা কিন্তু প্রকৃত অর্থে আমার জীবনী। আমার জীবনীই মানে বানানো ব্যাপারটা সেখানে কম থাকবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নিশ্চয় আপনার সাদা নীল কালো সব বিষয়ই থাকবে । মানে আপনার লিখা যেমন অকপট, এই অকপটের জায়গাটা আমি বলছি। আপনার লিখায় আপনি, আমার মনে হয় যে সব চেয়ে কম সেন্সর আপনি করেছেন।
ইমদাদুল হক মিলন:কম সেন্সর করেছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আচ্ছা।
ইমদাদুল হক মিলন:আত্মজীবনীর মধ্যে হাফ এ লাইফ আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছে। সুনীলদাকে আমি জিজ্ঞেশ করেছিলাম যে অর্ধেক জীবন কেনো আপনার আত্মজীবনী? সে বলেছিল, জীবনের সব কথাতো বলা যাবে না। জীবনের সব কথা বলা যাবে না, এটা বাঙালি লেখকরা মনে করেন। আবার যখন তুমি সমারসেট মমের মেমোরি পড়বে, অকপটে সব বলে দিয়েছে। কিন্তু বাঙালিদের কতগুলো সংস্কারের জায়গা আছে। সংস্কারের জায়গাটা কী রকম? লোক ভাববে যে আমার ছেলে মেয়ে হয়ে গেছে, এত আত্মীয় স্বজন। আমি কবে কোন মেয়ের সঙ্গে অনৈতিক ভাবে শুয়েছি। এটা কি করে লিখি? এই জায়গাগুলির ব্যাপারে এই ব্যাখ্যাটাই আমাকে সুনীলদা দিয়েছিলেন। এটা কি করে তুমি লিখবা বলো? তখন লোকে বলবে যে এই শালা কোন—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানুষের জাতই না ।
ইমদাদুল হক মিলন: তসলিমা নাসরিন এত নিন্দিত হলো কেন? অকপটে সব বলেছে বলে। নাসরিনের সম্মানের জায়গাটা অনেকটা নষ্ট হয়েছে। এই মেয়ে যদি বাঙালি না হত। ইউরোপিয়ানদের কাছে কিন্তু ওর কদর বিশাল। কিন্তু বাঙালি মেয়েরাই ওকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে। যে, ও এই সব বলতে গেল কেন? তো সেই কারণে হয় কি, জীবনের সব কথা তুমি সেভাবে বলতে পারবে না। যত তুমি আধুনিক হও না কেন। বাঙালি হিশেবে ঐ জায়গাটায় তুমি যেতে পারবে না। কত বড় বাঙালি জন্মেছেন না, অমর্ত্য সেন সে কি পারবে তাঁর জীবনের কথা বলতে? ডঃ ইউনুস পারবে? ডঃ ইউনুসের যে মেয়ে আছে না আমেরিকায়, ব্যান্ড দলের সদস্য, সেই মেয়ের কথাতো উনি স্বীকারই করতে চান না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: রবি ঠাকুরের ক্ষেত্রেও এমনকি তা হয়েছে।
ইমদাদুল হক মিলন: রবীন্দ্রনাথ কি বলো! সম্ভব না বাঙালির পক্ষে। এবং আমার ধারণা ইউরোপ আমেরিকার লোকরাও সব বলে না। কোথাও না কোথাও তার সীমাবদ্ধতা থাকবে। ধরো একটা মানুষের যৌনতা একটা বন্য ব্যাপার এবং সেই সময় মানুষের হিংস্রতা নীচতা এমন একটা পর্যায়ে চলে যায় যে এমন অনেক ঘটনাও আছে যে পৃথিবীর খুব বড় লেখক দুজন মানুষকে হত্যা করেছেন। পৃথিবীর এমন অনেক বড় অভিনেতা আছেন যে সতেরো বছরের একটা মেয়েকে রেপ করেছেন। আছে তো, সে কথা সে কখনো লিখবে না। লিখবে না এই জন্যে যে সে তাঁর লিখালিখির জগতে বা শিল্পের জগতে যে ইমেজটা তৈরি করেছে সে পঙ্কিলতাটুকু দেবে না। ওটাকে সে নষ্ট হতে দেবে না। তার ফলে আত্মজীবনী একশো ভাগ অকপটভাবে লেখা সম্ভব না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কারো পক্ষে সম্ভব না বটে, আপনি বন্ধু বান্ধব নিয়ে, বন্ধু বান্ধব কাছের দেখা মানুষজনের স্মৃতির আমি মনে করি আপনি আমাদের দেশের শিল্প সাহিত্য সব কিছুর সাথে একাত্ম হয়েছেন, ঐ সময়টার একটা বড় সাক্ষী আপনি ফলে শিল্প সাহিত্যের এই মানুষগুলোর আসা উচিত বলে আমার মনে হয় ।
ইমদাদুল হক মিলন:এটার অনেকগুলো অদ্ভুত অদ্ভুত পরিকল্পনা আমি করেছিলাম। যেমন আমি একটা লিখা হয়তো লিখবো আবার কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের লেখক বন্ধুদের নিয়ে, আবার একটা লিখবো বাংলাদেশের বন্ধুদের নিয়ে। অভিনেতাদের নিয়ে। আমারতো কাজের জগতটা অনেক রকম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বিবিধ রকম।
ইমদাদুল হক মিলন: আমি যদি বাংলাদেশের প্রকাশকদের নিয়ে একটা লিখা লিখি, ঐ লিখা আর কেউ লিখতে পারবে না। কারণ আমি একদম শুরু থেকে তাঁদের মধ্যে বড় হয়েছি। তাঁদের অনৈতিক জায়গাটা আমি দেখেছি, তাঁদের উদারতার জায়গাটাও আমি দেখেছি। সুতরাং হয়তো আমি একটি, একে কি বলে অকপটে যদি একটা আত্মজীবনী লিখা যায়,

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তো ভাই আমরা অনেক কথাই বললাম। আসলে আরও অনেক প্রশ্ন বাকি। আমি কি আরেকটু সময় নিতে পারি? আপনি ব্যস্ত খুব?
ইমদাদুল হক মিলন: না না বলেন বলেন। আর চা খাও।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ। সেটা হল যে এই যে লিখালিখি
ইমদাদুল হক মিলন: তুমি গ্রিন টি খাবে?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: গ্রীণ টি আছে?
ইমদাদুল হক মিলন: ওকে আর আমাকে বড় মগে চা দাও।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমাদের এই লিখালিখির যে জগত, লেখক সমাজ বলতে আমরা যা বুঝি, আমাদের যে বিশ্ববিদ্যালয় গুলি, আপনারতো টাকা পয়সা কম ছিল, জগন্নাথেই পড়তেন আপনার কি মনে হয়, এখন আপনি এক পত্রিকার সম্পাদক আপনি যে ভাবে এই বিষয়টিকে, এই শহরকে দেখেন, অনেকের পক্ষেই এভাবে দেখা ঠিক সম্ভব না। আপনার কি মনে হয়, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের সঠিক দায়িত্ব পালন করে?
ইমদাদুল হক মিলন: এটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ভাববার বিষয়। খুব সঠিক

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাংলা একাডেমীর হলে যে প্রথম আপনি গেলেন, দেখলেন, সেখানে বক্তা হল সেলিনা হোসেন, রফিক আজাদ, তাঁদের মেধা খেয়াল করেন, এখন আপনি বাংলা একাডেমীতে গেলে যাদের বসে থাকতে দেখেন—
ইমদাদুল হক মিলন:আমি এখন অনেক জায়গায়ই যাই না, গেলে আমাকে নানান রকম ভাবে হোঁচট খেতে হয়। আমি ঠিক মানতে পারি না যে, এই জায়গাগুলো এরকম পরিস্থিতিতে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলো, আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেরই অনেক জায়গার কথা বলো, যেই জায়গাগুলো কিন্তু আগের সেই জায়গাতে নেই। আমি বহু দিন আগে একটা নাটক লিখেছিলাম, কোন কাননের ফুল, নাটকটার থিম ছিল, এক বাগানের ফুল আরেক বাগানে ফুটলে যা হয়, আমাদের এখানে যে মানুষটির যে জায়গায় থাকার কথা, আমাদের সে মানুষগুলো প্রকৃত জায়গাতে নেই।

অনেক অপ্রয়োজনীয় মানুষ অনেক প্রয়োজনীয় জায়গায় গিয়ে বসে গেছে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ চাপা পড়ে গেছে। যার ফলে আমাদের কিন্তু প্রত্যেকটি জায়গাতে একটা হযবরল অবস্থার তৈরি হয়েছে। একটা উদাহরণ আমি তোমাকে দিই, একটা সময় ছিল বাংলাদেশের টেলিভিশন, বিটিভি দেখার জন্যে পাবলিক হুড়মুড় খেয়ে থাকতো। আমাদের নাটক, আমি কলকাতায় গেছি, মানুষ আমাকে দেখতে ভিড় করেছিলো। এই লোকেরাই তো, যতদূরে যাই। আর এখন আমাদের চ্যানেলের দিকে ওরা ফিরেও তাকায় না। কারণ আমাদের দেশের মানুষেরাই আমাদের চ্যানেল দেখে না, দেখে ওদেরগুলো। ওরা এটা অ্যাচিভ করতে পেরেছে। আমরা পিছিয়ে গেছি। ওরা এগিয়ে গেছে। আমরা আমাদের যে জায়গায় ছিলাম সে জায়গা ধরে রাখতে আমরা পারিনি। আমরা আমাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সর্বনাশটা আমরা করেছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই সর্বনাশের ক্ষেত্রে দায়ের কথাতো বলাই যায়, মানে দায়গুলা কার?
ইমদাদুল হক মিলন: দায়গুলো আমাদের সবারই দায়। এখন তুমি যদি বলো, সবার দায়, ব্যাপারটা কী রকম? শিল্প সংস্কৃতি বলো বা দেশের যা কিছুই বলো সেটার প্রথমত রাষ্ট্রব্যবস্থার একটা সূক্ষ্ম নজর থাকে। একটা যত্নের ব্যাপার থাকে, একটা শাসনের ব্যাপার থাকে, একটা স্বাধীনতারও ব্যাপার থাকে। হ্যাঁ ইমদাদুল হক মিলন বা অমুক, তুমি ভাই তোমার মত করে করো। সরকার তোমার সঙ্গে আছে। রাষ্ট্র পৃষ্ঠপোষকতা করবে। একজন ভালো ছেলে সিনেমা বানাতে পারলো না। তাঁকে রাষ্ট্র টাকা দেবে না। কিন্তু যে সব রাষ্ট্রীয় অনুদান বলো বা যা বলো এখানে যেই ভাবে কাজগুলো হয় তুমি সেখানে খুব বড় মেধা নিয়ে কাজে লাগাতে পারবে না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বটেই। আমি সে জিনিশগুলো—
ইমদাদুল হক মিলন:প্রত্যেকটা জায়গাতে আমাদের এক অবস্থা। তুমি শিক্ষার জায়গা বলো, আমাদের শ্রমের জায়গাটাতে আছে, এক শ্রেণির মানুষ ব্যাপকভাবে টাকা রোজগার করছে, আরেক শ্রেণির মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে। দেশটি স্বাধীন হয়েছে ঠিকই, দেশটা একটা বড় পর্যায়ে এসেও দাঁড়িয়েছে ঠিকই। নানারকম ভাবে। অর্থনৈতিকভাবে একটু মেরুদণ্ডটা শক্ত হয়েছে কিন্তু এই দেশটি কি বহু বড় জায়গায় থাকার কথা না? এই এতোগুলো মানুষ, এই মানুষগুলোকে যদি আমি সচেতনভাবে কাজে লাগাতে পারতাম, বাংলাদেশের সামনে কে দাঁড়াতে পারে?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মিলন ভাই, হুমায়ুন আজাদ যেন আপনার কোন বইটার প্রশংসা করেছিলেন! ভূমিপুত্র?
ইমদাদুল হক মিলন:না বোধ হয়, পরাধীনতা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: পরাধীনতা তো একটা, আরেকটা হচ্ছে ভূমিপুত্র!
ইমদাদুল হক মিলন: রাইট

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তার এত বছর পরে আমি একটা অন্য প্রসঙ্গে যেতে চাই, সেটা হল যে তার এত বছর পরে আপনি, এখনও লিখছেন এবং এখনও অনেক পরিকল্পনা করছেন যে আপনি লিখবেন আরও। বাংলাদেশে আপনি স্বভাবতই জানেন যে, ব্লগারদের হত্যা করা হচ্ছে। চোরাগুপ্তা হত্যা বেড়ে গেছে, আমাদের সামাজিক যে বৈষম্য তা আরও প্রকট হচ্ছে। ধনী ও গরীবের মধ্যকার বৈষম্য। আমি সেদিন শিল্পী মুর্তজা বশীরের সাথে কথা বলছিলাম, তার জন্মদিনের সকাল বেলায়। উনি বলছিলেন যে, দেখো, এ দেশের মানুষ ভয়ংকর। এ দেশের মানুষ ঝড়, জলোচ্ছ্বাস এগুলোর সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে, তাদের প্রকৃতিই এরকম যে কখনও মাথা নোয়ায় না। সুতরাং বৈষম্য বাড়ছে, মানুষের গ্লানি যেমন বাড়ছে, বিরক্তিও বাড়ছে, সহ্যক্ষমতা কমে আসছে। এরা যখনি ফুঁসে উঠবে আসল মুক্তিযুদ্ধ কিন্তু তখন হবে।
ইমদাদুল হক মিলন: ওনি সাম্যবাদিতার কথা এখানে বলেছেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার কী মনে হয়? এই যে দেশের বর্তমান যেই অবস্থা, মানুষের নিরাপত্তা নেই, এর মধ্যে লেখক হিসেবে আপনার ভাবনার জায়গাটা আসলে কী?
ইমদাদুল হক মিলন:দেখো আমার, মুর্তজা বশীরের এই কথাটা আমার খুব ভালো লেগেছে। সবসময় দেখে আসছি যে বাঙালি হল লড়াই করা জাতি, বাঙালির যা কিছু অর্জন কোনটা কিন্তু লড়াই ছাড়া হয়নি। তুমি দেখো ৪৭ এর দেশভাগের পরে প্রথম আঘাতটা কিন্তু হলো ভাষার উপর। মুর্তজা বশীর ভাষাসৈণিক। আমাদের ছেলেরা বুকের রক্ত দিলো, যে ইতিহাস পৃথিবীর কোন জাতির নেই যে ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্যে রক্ত দিতে হয়েছে। এই কারণে বাংলা ভাষা আসলে রক্ত দিয়ে অর্জন করা একটি ভাষা এবং এই কারণে একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখটা আসলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

এবং এটা কিন্তু আমাদের একটি বড় অর্জন। এরপরে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুথান বলো, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলো, তিরিশ লক্ষ লোক প্রাণ দিয়েছে। এক কোটি লোক কিন্তু ভারতে চলে গিয়েছিলো। যে লড়াইটা আমরা করলাম, সে লড়াই এর ফলে, যুদ্ধের ফলে আমরা একটা স্বাধীন দেশ পেলাম। তারপরেও কিন্তু এদেশের ছাত্র এবং সাধারণ জনগণ যখনই দেখেছে যে ধীরে ধীরে ধীরে ধীরে অত্যাচারিত হতে হতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, তখন ক্ষোভে দুঃখে ফেটে পড়েছিলো এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থা বদলে দিয়েছে। যেটা এরশাদের আমল, এরশাদকে রাতারাতি গদি থেকে নামিয়ে দিয়েছে মানুষ। সুতরাং বাঙালি কিন্তু কোন অপকর্মকে অপশাসনকে দীর্ঘ দিন মেনে নেবে না। কোন না কোনভাবে বাঙালি ঘুরে দাঁড়াবে। এখন যে অবস্থাটি চলছে, হ্যাঁ এই অবস্থার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় আছে। রাষ্ট্রের দায় কী রকম যে এই রাষ্ট্র মোটামুটিভাবে দুটো রাজনৈতিক দলে ভাগ হয়ে আছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: একদম পরিষ্কারভাবে
ইমদাদুল হক মিলন:এবং বহু মেধাবী মানুষ আছেন, যারা প্রকৃতভাবে দেশটাকে ভালোবাসেন, দেশের মঙ্গল চান। এবং এর পাশাপাশি বহু খারাপ মানুষ আছে যারা দেশের আগে নিজের আখেরটা গোছাতে চান।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এবং যাদের জন্যে ভালো মানুষরা কিছু করতেও পারে না।
ইমদাদুল হক মিলন: এবং তাদের জন্যই মেধাবীরা চাপা পড়ে যায়, এই যে অবস্থাটি চলছে,এটার খুব ভালো চেইঞ্জ দরকার। এই চেইঞ্জটা যারা রাষ্ট্রের পরিচালনায় আছেন তারা যদি না ঘটান, তারা যদি সচেতন না হন তবে সম্ভব না। হ্যাঁ আমি জানি যে আমার রাষ্ট্রের শিশুদেরকে হত্যা করা হচ্ছে, ব্লগারদের হত্যা করা হচ্ছে। আমার দেশের নারীকে অবিরাম নির্যাতন করা হচ্ছে, কিশোরীদের রেইপ করা হচ্ছে। এই অবস্থাটা রাষ্ট্র চাইলে চোখের পলকে বদলে যেতে পারে। রাষ্ট্র যদি চায় কাল থেকে, আমি তোমাকে শুধু একটা উদাহরণ দিই, ঢাকার সব রাস্তায় দু ঘণ্টা তিন ঘণ্টা তুমি বসে আছো, নড়তে পারছো না। তুমি শুধু জাহাঙ্গীরগেট দিয়ে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে ঢোকো, অন্য রাজ্য মনে হবে তোমার।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কোন জ্যাম নাই, কিচ্ছু নাই।
ইমদাদুল হক মিলন: অন্য রাজ্য মনে হবে। কেন হচ্ছে? ঐ শাসন। আইনের ব্যবহার। ঠিক, ঠিক তো ?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ঠিক।
ইমদাদুল হক মিলন: এই যে শাসনব্যবস্থা, তুমি ঐ রকম একটা কঠোর শাসনব্যবস্থা তৈরি করো, আইনের প্রয়োগটা করো সঠিকভাবে, পৃথিবীর যে কোন দেশে, তুমি রাত্রি দুটোর সময়, তুমি ইউরোপের রাস্তা দিয়ে ড্রাইভ করে যাচ্ছো, দেখবে লাল বাতি জ্বলছে, রাস্তায় কিচ্ছু নাই, ফাঁকা নির্জন, তুমি দাঁড়াবে, কেন দাঁড়াবে জানো, দাঁড়াবে এই জন্য যে, এই মুহূর্তে যদি আমি এটা ক্রস করি, গাড়ির নাম্বারটি হিডেন ক্যামেরায় উঠে থাকবে, পরশু দিন আমার কাছে এক হাজার ডলার ফাইনের একটা চিঠি আসবে। একটি লোক ক্রাইম করে পালাতে পারবে না। কোন না কোন পুলিস তাকে ধরবে এবং পুলিস ধরা মানে হচ্ছে তোমাকে মারবে না পেটাবে না। তোমাকে হাজতে নিয়ে যাবে। তোমাকে একটা বড় ফাইন করে দেবে। ঐ টাকা রোজগার করতে তোমার জান বেরিয়ে যাবে। এই যে ছোট ছোট জিনিসগুলি আমি তোমাকে বললাম কারণটা হচ্ছে যে তুমি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করো।

রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে একটা সত্যিকার শাসন ব্যবস্থার মধ্যে আনো, মানুষগুলিকে কাজে লাগাও। যে দেশের সতেরো কোটি মানুষ, এইটুকু একটি দেশ। লক্ষ লক্ষ ছেলে মেয়ে বেকার, লক্ষ লক্ষ ছেলে মেয়ে পাশ করে বেরুচ্ছে, তাদের কাজ দিতে পারছি না। চায়না হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি জনবহুল দেশ। দুইশ কোটি লোক এখন তাদের। দুইশ বিশ কোটি লোক। দুইশ বিশ কোটি লোকের দেশ চায়না এখন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ। তারা তাদের প্রত্যেকটি লোককে কাজে লাগাতে পেরেছে। ঘরে বসে আলপিন তৈরি করেছে। ঘরে বসে জাহাজ তৈরি করে ফেলেছে। যেমন আলপিন তৈরি করেছে, তেমন জাহাজও তৈরি করেছে, উড়োজাহাজ ও করেছে। পৃথিবীর পুরো বাজারটা চায়না দখল করেছে বিকজ অফ তারা তাদের মানুষদেরকে কাজে লাগাতে পেরেছে। তুমি আমার মানুষগুলোকে কাজে না লাগাও তারা খুন করবেই। বদমায়েশি করবেই। অলসমস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। তুমি মূল জায়গাটাকে বদলে দাও।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই যে আমাদের যে টেলিভিশনে, আপনি আমাদের টেলিভিশনের একজন জনপ্রিয় উপস্থাপকও বটে।
ইমদাদুল হক মিলন: হা হা হা হা। এককালে ছিলাম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এর পাশাপাশি এবং এখন বিভিন্ন টক শোতে কথাও বলছেন।
ইমদাদুল হক মিলন: হ্যাঁ, পলিটিকাল টক শোতে আমি যাই না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানে সেটাও, খুব মানে, কালচারতো মোটেও পলিটিক্সের বাইরে না। পলিটিক্সকে গাইড করে কালচার।
ইমদাদুল হক মিলন:দ্যাটস ট্রু।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ফলে ঐ জায়গা থেকে, এখন এখানে যেমন একটা বিটিভি ছিল এককালে, এখন ছাব্বিশ সাতাশটা চ্যানেল। মিডিয়ার বড় একটা বুম হয়েছে এখানে। আপনার অবজার্ভেশন কি?
ইমদাদুল হক মিলন: এখানে বড় সংকট হলো মানুষের শিক্ষা দীক্ষা, কালচারের। যখন প্রয়োজন হয় তখনই মিডিয়া বড় হয়ে উঠে। টেলিভিশন বলো, প্রিন্ট মিডিয়া বলো, অনলাইন বলো যা যা হয়েছে এখন, এতে আধুনিক পৃথিবীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমরা যাচ্ছি। কি দ্রুত, এই রকম একটা ছোট্ট দেশে আটাশটা তিরিশটা চ্যানেল। একটু না, অনেক বেশি মনে হয়। আর যতগুলো দৈনিক পত্রিকা, পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু এর অর্ধেকও নাই ভাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু ওদের যে দুইটি পত্রিকা, তাদের সার্কুলেশন তো আমাদের এত্তগুলোর চেয়ে বেশি!
ইমদাদুল হক মিলন: একটা হচ্ছে ১৪ লাখ আর আরেকটা হচ্ছে ৭লাখ, এই দুইটার হিশেব তুমি দেখো আর কোনদিকে তোমাকে তাকাতে হবে না। এই দুইটাই বাইশ লাখ। এই যে এ অবস্থাটি, বাঙালি এমনভাবে শুরু করে, ধরো ঢাকায় একসময় চায়নিজ রেস্টুরেন্টের ব্যবসা জমে গেলো, রাতারাতি এত এত চায়নিজ রেস্টুরেন্ট হলো, এরপর রেস্টুরেন্টের পর রেস্টুরেন্ট খালি থাকে। এই টেলিভিশন চ্যানেলগুলো একটার পরে একটা হওয়াতে আমাদের বিজ্ঞাপনের জায়গাটা বাড়েনি। আমাদের ব্যবসার জায়গাটা বাড়েনি। কয়টা বড় ব্যবসায়ী গত বিশ বছরে তৈরি হয়েছে? তো টেলিভিশন হয়ে গেছে আটাশটা।

বিজ্ঞাপন দিতে পারে এমন সংস্থা কয়টা তৈরি হয়েছে? কিন্তু টেলিভিশন বা প্রিন্ট মিডিয়ায় একটা বা দুইটা বা পাঁচটার জায়গায় তিরিশটাই দখল করেছে। সেই ক্ষেত্রে ক্ষতিটা যেটা হয়েছে। তুমি একটা ভালো প্রোডাকশন করতে গেলে যা প্রয়োজন তার চার ভাগের এক ভাগও খরচ করতে পারছো না। তাহলে তুমি ভালো প্রোডাকশন পাবে কী করে। এই রকমের নানা রকমের নানা ক্রাইসিসের কারণে আমাদের টেলিভিশনগুলো কিন্তু এভাবে দাঁড়াতে পারছে না। আমি কিন্তু ঢালাও ভাবে বলছি না, কোন কোন টেলিভিশন চ্যানেল দাঁড়িয়েছে। বেশ ভালো ভাবেই দাঁড়িয়েছে। বেশিরভাগই দাঁড়ায়নি কিন্তু এখানে মেধার অভাব বা টেকনিক্যাল জ্ঞানের অভাবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মেধার অভাব!
ইমদাদুল হক মিলন: মেধার কথা যদি বলো মেধার অভাব সাড়া পৃথিবীতেই আছে কিন্তু তুমি যখন টেলিভিশন বা টেকনিশিয়ান দরকার, টেকনিক্যাল লোকগুলি দরকার। যেটা সারা পৃথিবীতে ট্রেনিং করিয়ে করিয়ে ইন্সটিটিউট থেকে একটা জায়গায় পোস্ট, কাজ দেয়া হয়। আমাদের এখানে কী টেলিভিশন, কি সাংবাদিকতা, টেলিভিশনের টেকনিক্যাল জিনিশগুলো! এসব কি ঠিক আছে? আমরা কী করছি? চার নম্বর এসিস্টেন্ট এখন একটা প্রতিষ্ঠানের সি ই ও, হয়তো একটা টেলিভিশনের। এইভাবে আমরা লোকগুলোকে এনেছি। মেধার বিকাশ হওয়ার জন্য যে ট্রেনিংগুলো দরকার, যে চর্চার দরকার, সেখানে বিশাল একটা গলদ রয়েই যাচ্ছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মিলন ভাই, এখন দেখছেন যেমন বাংলাদেশ আপনি, একজন সম্পাদক হিসেবে খবরের সাথে থাকেন, সবই জানেন, আপনাকে যদি বলা হয় যে, আপনি আপনার প্রয়াণের আগে কেমন বাংলাদেশ দেখে যেতে চান?
ইমদাদুল হক মিলন: শোনো, বাংলাদেশতো আমাদের সবচেয়ে বড় অহংকারের জায়গা। আমাকে যদি কেউ বলে যে তোমার সব চাইতে বড় অহংকার কী, অবশ্যই বলবো যে, আমি বাঙালি, বাংলাদেশের মানুষ। আমার ভাষায় কথা বলার জন্য আমরা বুকের রক্ত দিয়েছিলাম। আমরা তিরিশ লক্ষ লোকের বিনিময়ে দেশটাকে স্বাধীন করেছিলাম।

আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সংগীত রবীন্দ্রনাথ রচনা করে দিয়েছেন, “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।” তো এই যে দেশটি , বিশাল স্বপ্ন নিয়ে আমরা স্বাধীন করেছি। স্বপ্নের ধারে কাছেও আমরা পৌঁছাতে পারিনি। কিন্তু এরপরেও আমাদের অনেকগুলো অর্জন আমাদের আছে। কম বেশি অর্জন কিন্তু আমাদের আছে। আমাদের বিজনেস সেক্টর এখন একটা জায়গায় গেছে। গার্মেন্টস সেক্টর, পৃথিবীর যে কোন দেশে গেলে, তুমি তাঁদের আমেরিকার মত একটা জায়গায় বড় একটা শপিংয়ে ঢুকে যখন দেখবে, ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ঝুলছে তখন কিন্তু বুক ভরে যাবে, এখানে বসলে এটা বোঝা যাবে না, যখন তুমি আইফেল টাওয়ারের চূড়ায় চড়বে সেখানে যখন তুমি দেখবে যে ঐ পয়েন্ট থেকে পৃথিবীর কোন দেশের কত দূরত্ব, সেখানে যখন দেখবে যে বাংলাদেশের মানচিত্রটি এঁকে, বাংলাদেশের ফ্ল্যাগটি এঁকে দূরত্বটি লেখা আছে বুকটা ভরে উঠবে যে আমি কোথায় পৌঁছেছি। এই অহংকারটা যাতে আরও দীর্ঘ হয় আমাদের। আমি শুধু একটা জিনিশ মনে করি, বাংলাদেশের অর্জনের কথা যদি আমি বলি, গার্মেন্টস সেক্টরে একটা বড় অর্জন হয়েছে। আইটি সেক্টরে একটা বড় অর্জন হয়েছে। আমাদের একজন মানুষ নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। আমাদের ক্রিকেট কিন্তু পৃথিবীকে মাতিয়ে দিয়েছে। আমাদের দেশের একটা ছেলে, দুবার অস্কার পেয়েছে। এনিমেশনও একটা ফিল্ম কিন্তু।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জাফর!
ইমদাদুল হক মিলন: এই অর্জনগুলোকে, আমাদের দেশের একটা লেখক কিন্তু সেদিন একটা বড় পুরস্কার পেয়েছে। জিয়া হায়দার রহমান।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জিয়া হায়দার রহমান।
ইমদাদুল হক মিলন: আমাদের তসলিমার লেখা নিউইয়র্ক টাইমসে নিয়মিত ছাপা হয়। এগুলো অনেক বড় ব্যাপার। এই ব্যাপারগুলো আর বড় হতে পারতো কারণ আমরা অনেকগুলো দিন পেরিয়ে আসছি, বিয়াল্লিশ, তেতাল্লিশ বছর দেশটা স্বাধীন হয়েছে, চুয়াল্লিশ বছর হয়ে গেছে, আমাদের অর্জনটা আরও বড় হতে পারতো। আরও বড় হতে পারেনি, তার আরও কতগুলো কারণ আছে। স্বাধীনতার পর থেকে অবিরাম রাজনৈতিক পটভূমি পরিবর্তন হয়েছে। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, বঙ্গবন্ধুর মত মানুষকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: রাষ্ট্রক্ষমতায় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ!
ইমদাদুল হক মিলন: জিয়াউর রহমানের মত লোক, এ প্রসঙ্গটায় আমি না যাই, এই যে কাণ্ডগুলো হয়েছে, রাষ্ট্রটাকে দুর্বল করা হয়েছে। এক সরকার এক প্ল্যান করে একজায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু পরের সরকার এসে সব ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। নিজেদের মতোন এগিয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেছে। পরবর্তীতে আরেকটা সরকার এসে সব ধূলিসাৎ করার চেষ্টা করেছে, এগোতে পারেনি। একটি সুশৃঙ্খল পরিস্থিতি দরকার ছিল। একটা স্টেবল সরকার দরকার ছিলো। হ্যাঁ একদল দেশ শাসন করছে। পাশাপাশি একটা স্ট্রং বিরোধী দল দরকার ছিল। যারা একেবারে সঠিকভাবে একটা দিকনিদের্শনা দিয়ে দেশটাকে ঠিক দিকে নিয়ে যাবে। আমাদের দেশের পার্টিগুলো বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করে। ভালো দেশের জন্যে করে না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: রাইট।
ইমদাদুল হক মিলন: সুতরাং সমস্যাটা কিন্তু দু দলেরই। এই যদি পরিস্থিতি, দেশটাকে কোথায় নিয়ে যাবে তুমি। হয়ে গেলো, ধরো ক্লিনটন দু বার দেশ শাসন করার পরে আরেকজন এলেন সে কিন্তু সেই।
(একটা ফোন কল শেষ করে) কোন জায়গায় ছিলাম বলোতো?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ঐ যে সাফল্যটাকে বিস্তৃত
ইমদাদুল হক মিলন: যে কথা বলছিলাম ক্লিনটন চলে গেলেন তাঁর ক্ষমতা থেকে, নতুন প্রেসিডেন্ট এলেন, এসে তিনি প্রথমেই বললেন যে, বিল ক্লিনটন আমেরিকার জন্য যা করেছে, ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে তার নাম লেখা থাকবে। আমি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমার কাজ শুরু করছি। আমাদের এখানে কি হয়? সব লোপাট করে ফেলেছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সব লোপাট করে ফেলেছে, নতুন করে সব করতে হবে।
ইমদাদুল হক মিলন: এই মানসিকতাটা বদলাতে হবে। একজন মানুষের কন্ট্রিবিউশনকে তুমি স্বীকার করবে না। ধূলিসাৎ করে দেবে। তো এই মানসিকতাটা বদলানো দরকার এবং শিক্ষিত, উচ্চ রুচিশীল জাতি গঠনের জন্য, ব্যবস্থার জন্য যা যা করা দরকার একটা রাষ্ট্রকে গতিশীল করার জন্য। শিক্ষার জায়গাটিকে প্রসারিত করার জন্যে, আধুনিক একটা জাতি তৈরি করার জন্যে। গভীরভাবে চিন্তা করে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক লিখেছেন, আপনার অনেক লেখার কথা এখন আমার মনে পড়ছে, ভয়ংকর ভাবে মনে হচ্ছে, নেতা যে রাতে নিখোঁজ হলেন।
ইমদাদুল হক মিলন: বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা বোধ হয়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই গল্পটা, মানে আপনিতো সেদিন রাতে ছিলেন না। কিন্তু এত পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা আপনি কিভাবে লিখলেন?
ইমদাদুল হক মিলন:আমি সেদিন রাত্রে ছিলাম না মানে কী, আমিতো সেদিন রাত্রে ঢাকাতেই ছিলাম। পরদিন সকাল বেলা যখন রেডিওতে এই ঘোষণাটা হলো, আমার মা দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। রান্না ঘরে ছিলেন, শোনার পরে এত দিশেহারা হলেন; দৌড়ে এসে বললেন, কী, বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলেছে? এবং এর পরে যতদিন গেছে তখনতো এমন দিন ছিল, বঙ্গবন্ধুর নাম কেউ উচ্চারণ করতো না।

কিন্তু সাধারণ মানুষ যে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসত, এই উদাহরণগুলো আমাদের চারপাশে ছিল, কোন কোন মানুষ বলতো। তো আমি এরকম একটা মানুষকে দেখেছিলাম যে একজন চাষি, তাও বর্গা চাষি। যে জমি অন্যের জন্যে চাষ করে। তাঁর খুব স্বপ্ন ছিল, তাঁর খুব স্বপ্ন ছিল যে সে একটু চিড়া বানিয়ে বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে আসবে কারণ এই লোকটার জন্য দেশটা স্বাধীন হয়েছে। ঐ মানুষটার স্বপ্ন থেকে আমি গল্পটা সাজিয়ে ছিলাম এবং যখন আমি গল্পটা লিখলাম, সেটা এরশাদ সাহেবের সময়। সেটা ঊননব্বই বা নব্বই সাল। ঐ সময় কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গল্পটল্প লেখা বা ঐ সময়টায় কেউ কিন্তু ঐ ভাবে সাহসও পাচ্ছিলো না। এটা আসলে একটা ভালোবাসার গল্প। যে একজন নেতার প্রতি একজন সাধারণ মানুষের গভীর ভালোবাসা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মিলন ভাই, আমাদের সিরিয়াস লেখকদের মধ্যে অনেকের সাথে ব্যাপক যোগাযোগ দেখা যায় আপনার। ফরিদুর রেজা সাগর বলেন, আনিসুল হক বলেন কিংবা বুলবুল চৌধুরী বলেন, মানে আমাদের শিশু সাহিত্যে যারা মোটামুটি আইকনিক, লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম, তাঁদের সাথে আপনার এক ধরণের সখ্য আছে। বন্ধুত্ব আছে। শিশুসাহিত্য নিয়ে আপনার ভাবনাটা কেমন?
ইমদাদুল হক মিলন:আমারতো জীবনে প্রথম গল্পটিই কিন্তু ছোটদের জন্যে লেখা। পরে আমি, ভালোবাসার গল্প আর নিরন্নের কাল, এই দুইটা বই বের হওয়ার সাথে সাথে ছোটদের উপন্যাস বের হয়। এবং খুব জনপ্রিয়ও হয়েছে, যাই হোক। ছোটদের লেখার প্রতি আমার একটা গভীর মমত্ববোধ আছে তো ছোটদের লেখা, ধরো আমি নুরজাহান লেখার ফাঁকে ফাঁকে অনেক ছোটদের লেখা লিখেছি এবং এমনও গেছে যে, আমি একটা উপন্যাস লেখা নিয়ে আছি, মনের মত লিখতে পারছি না, ঐটা রেখে দিয়ে আমি একটা ছোটদের লেখা লিখছি। আমার মনে হয়েছে যে, ঐ লেখায় আমি প্রচুর স্বাধীনতা পেতে পারি, প্রচুর গল্প বানাতে পারি। আমার কল্পনার জগত থেকে, সুতোর নাটাই থেকে অবিরাম সুতো ছেড়ে দিতে পারি। বানাতে পারি। এই বানাবার মজার কারণে, মজাটা নেবার জন্যে আমি ছোটদের লেখার মধ্যে আমি ডুবে যাই। এবং আমার লিখতে খুব ভালো লাগে। আরেকটা জিনিশ হলো ছোটদের লেখা লিখার সময়, আমার একটা জিনিশ খুব কাজ করে। আমার মনে হয় যে, ধরো নায়কের বয়স হচ্ছে তেরো চৌদ্দ বছর বা ক্লাস সেভেনে পড়ে। আমি নিজেই ছেলেটার বয়সে নিজেকে নিয়ে যেতে পারি এবং ওর মত করে আমি দেখার চেষ্টা করি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার স্মৃতি এবং কল্পনা এটা খুবই দুর্দান্ত। দারুণ। মিলন ভাই, এই যে ছোটদের গল্প লেখা, বড়দের গল্প লেখা, গল্প লেখা, ইতিহাসের গল্প লেখা, নুরজাহান-এর মত এমন একটা মহাকাব্য লেখা। একজন নিপীড়িত মানুষকে নিয়ে। তাকে স্থাপন করা একটা নির্দিষ্ট জায়গায়। এই সমস্ত কিছুতো চলেছে আপনার জীবনে। আমি যদি জানতে চাই যে গত দশ বছরে আপনার দিনগুলো আসলে কেমন কেটেছে? যে কোন একটা দিনের যাপন দিয়ে যদি আমাদের একটু বলেন। যে ধরুন, আপনাকেতো এখন অনেক সামাজিক কাজে যোগদান করতে হয়, এই যে বলছিলেন যে, চাকরি করতে, তার মধ্যে যে নিজের লেখালিখির জন্যে রাখতে হয়। এটা যে কত বড় চ্যালেঞ্জ, এটা লেখকরা ছাড়া আর কেউ বুঝবে না।
ইমদাদুল হক মিলন:এখন অনেকের ধারণা যে আমি লিখিই না। বা এতগুলো কাজ করে আমার দিনগুলো কাটে কীভাবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি লিখেন কীভাবে?
ইমদাদুল হক মিলন:আমি তোমাকে একটা বর্ণনা দিই, সেটা হচ্ছে আমি উঠি খুব সকালে কিন্তু। আমি এখন সকাল ছয়টার মধ্যে উঠি। উঠে দু আড়াই ঘন্টা লিখি। উঠেই আমার প্রথম কাজ হচ্ছে লেখা। আটটা থেকে আমি অন্তত দু ঘন্টা বা চার ঘণ্টা লিখি। তারপরে আমি উঠে ঘন্টাখানিক এক্সারসাইজ করি। এরপরে গোসল টোসল করে, নাস্তা টাস্তা করে হয়তো আমি একটু পড়লাম বা ইয়ে করলাম। দশটা এগারোটার মধ্যে আমি অফিসে চলে আসি। এর মধ্যেও কাটে।

কিন্তু আমার যে, গত দশ বছরের জীবনে আমি যেই কথাগুলো বললাম, মোটামুটি এই হচ্ছে আমার রুটিন। কিন্তু আমি সম্পাদক হওয়ার আগে বা পত্রিকায় কাজ করার আগে যে দিনগুলো আমার ছিল, আমি সকালে উঠে লিখতে বসতাম। নাস্তা টাস্তা খেয়ে হয়তো বারোটা একটা পর্যন্ত আমি লিখতাম। লিখাটাকে আমি আমার সারাদিনের কাজের মধ্যে নিয়ে আসতাম যে, আমি চাকরি করলেও তো আমাকে করতে হতো আমি যেহেতু করি না, আমি লিখাটা নিয়েই থাকি। দুপুর পর্যন্ত লিখে আমি আর লিখতাম না। বাসায় রেস্ট টেস্ট নিয়ে বিকেল বেলায় একদম আড্ডা দিতে বেরুতাম। তারপর মাঝে মাঝে আমার নাটকগুলো হতো।

সিরিয়ালের শুটিং দেখতে যেতাম, নাটকের শুটিং দেখতে যেতাম। টক শো করেছি, প্রেজেন্টার হিশেবে কাজ করেছি ওখানে প্রত্যেকটা জিনিশকে আমি আমার মত করে সময় ভাগ করে নিয়েছিলাম। যে এইভাগে আমি এই কাজটা করবো। কোনদিন আমি কোন কাজ করতে না পারলে, যদি লেখার কাজটা না করতে পারি, আমি একটা অপরাধবোধে ভুগি। আমার মনে হয় যে, আজ আমি লিখাটা লিখলাম না, এক ধরণের অপরাধ বোধ হয়। এই হচ্ছে আমার প্রতিদিনের হিশাব।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মিলন ভাই এই যে, যে কথাটি বলছিলেন, সম্পাদক হওয়া, লেখার জন্যে সময় বাঁচিয়ে রাখা মানে এত সামাজিক কাজের মধ্যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন না? এই যে আপনি কথা বলছেন এবং আপনি বড় একটা উপন্যাস লিখছেন, তার মাঝখানে আপনি হাজার হাজার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। পরে আবার ফিরে আসলেন মানে ঐ লেখার কাছে ফিরে আসতে কি আপনার কষ্ট হয় না! সময় বের করতে—
ইমদাদুল হক মিলন:এটার একটা রিসেন্ট উদাহরণ দিই, গতকালকের ঘটনা। কলকাতার বর্তমান পুজো সংখ্যায় আমি একটা লেখা লিখি, এবার গল্পটা আমি দিতে পারছিলাম না, আমার গল্প হচ্ছিলো না। আমি একটা গল্প পরিকল্পনা করছি কীভাবে শুরু করবো এটা ভাবতে আমার সময় লেগে গেলো। এই ফাঁকে আমি আমার অন্যান্য লেখা লিখেছি। তো তারপর লেখাটা শুরু করলাম। তারপরেও এক সপ্তাহ পিছিয়ে গেলো। ওরা আমাকে সময় দিলো, কালকের মধ্যে লিখাটা পাঠাতে হবে। কিন্তু পরশু রাত পর্যন্ত লিখাটা অর্ধেক লেখা হয়েছে। একটা বড় গল্প কিন্তু ধরো হাজার ছয়েক শব্দ। কালকে সকাল বেলা ভাবছি, খুব সকালে উঠে লিখতে শুরু করবো। আমার একটা ছেলে আছে, অনেক বছর ধরেই আছে। টাইপ করে। আমার দুটো বাসা আছে, একটা মগবাজারে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জানি আমি।
ইমদাদুল হক মিলন:হ্যাঁ। মগবাজারের বাসায় থাকলে এই ছেলেটা সারাক্ষণ আমার সঙ্গে। আমি সকালে ছয়টায় উঠলে সেও উঠে বসে থাকে। তো আমি সকালবেলা, একবার উঠেছি তো সেও উঠে বসে আছে। আমি তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি। আটটার দিকে আমার দুই ভাই এলো, বড় ভাই এবং ছোটো ভাইটা। দশটা এগারোটা পর্যন্ত তাঁদের সাথে চা, গল্প গুজব হলো। তারপরে এক ল-ইয়ার দম্পতি এলো। আমার একটা কাজেই এলো , তো তাঁদের সংগে একটা পর্যন্ত। তখন আমার এক খালাতো ভাই ফোন করলো সে চারটার সময় আসবে। আমি কিন্তু ছটফট করছি, আজকে আমাকে লেখাটা শেষ করতে হবে। আরও আড়াই তিন হাজার শব্দ আমাকে লিখতে হবে। হিউজ কিন্তু কিছু করার নেই, এত অসহায় লাগলো। বাচ্চাটা বললো যে আমাকে গোসল করিয়ে দাও। আমি বাসায় থাকলে তাকে গোসল করিয়ে দিতে হয়। ওদিকে আমার মেয়েটার একটা বাচ্চা হয়েছে, তোমার ভাবী সেখানে চলে গেছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ভয়ঙ্কর অবস্থা। মেয়ের বাসায় ভাবী—
ইমদাদুল হক মিলন:ওখানে। তো আমি বুঝতে পারছি না, আমি কী করবো। এত অসহায় লাগছে। একবার ভাবলাম কি বর্তমানকে ফোন করে বলে দেবো যে এবার লেখাটা দিতে পারলাম না। কিন্তু ওরা আমার লেখার জন্য অপেক্ষা করছে, ওরা বিজ্ঞাপন দেয় আগে থেকে, ওরা বিশাল বিলবোর্ডে লেখকদের নাম আগেই ঝুলিয়ে দেয়—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ, কোলকাতায় পূজা সংখ্যার হোর্ডিং দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম।
ইমদাদুল হক মিলন: কী করবো? দুইটার দিকে দেখলাম যে, একটু ফ্রি হয়েছি, বললাম, আমাকে এককাপ চা দাও। ড্রয়িং রুমের একটা ফাঁকা জায়গা। আমি সেখানটাতে লেখালেখি করি। ওখানে গিয়ে বসে লিখতে শুরু করি এবং উন্মাদের মত। চারটা বেজে গেলো, আবার আমার ঐ খালাতো ভাইটা এলো, ছোট ভাইটাও এলো। একদিকে আমার ঐ ছেলেটা কম্পোজ করছে।

এই ছেলেটার নাম সাজু, সে গত আঠারো বছর ধরে আমার সাথে আছে। ও কম্পোজ করছে। আমার হাতের লেখা এমন অন্য কেউ কম্পোজও করতে পারে না। এত কঠিন লেখা। আমি পারি না। ঐ ছেলেটা পারে। খালাতো ভাইকে আধা ঘন্টার মত সময় রেখে শেষ করলাম। তাঁকে বিদায় করে আবার এক মগ চা নিয়ে বসলাম। লিখতে লিখতে লিখতে সাড়ে সাতটার সময় লিখাটা শেষ হলো। শেষ হওয়ার পরে, আমি এক পৃষ্ঠা করে লিখি, সে কম্পোজ করে। তো শেষ করার পরে এখন, এত বড় লেখাটা পড়। আমার মাথাটা দপদপ করছে। মাথাটা খুব গরম হয়ে আছে। তারপর আমি লেখাটা খুব ঠাণ্ডা মাথায় পড়লাম। সাড়ে আটটা বেজে গেলো, পরে আবার কিছু কারেকশন করলাম। সাড়ে নয়টায় ঐ ছেলেকে বললাম মেইল করো।

বললো এইটা তো কলকাতায় পিডিএফ ফাইলে পাঠাতে হবে। আমার বাসায় পিডিএফ নাই। সফটওয়্যার। আমি বললাম কোন একটা দোকানে গিয়ে করে আসো। কলকাতায় একজন লেখক আছে জয়ন্ত দেব, সে ওটার পূজো সংখ্যাটার দায়িত্বে। জয়ন্তকে ফোন করলাম যে জয়ন্ত তোমার মেইল আইডিটা দাও। বললো দাদা আপনার কাছেতো রয়েছে। বললাম ভুলে গেছি। আবারও পাঠালো।, পিডিএফ করে পাঠালাম। পাঠানোর পর বললাম, জয়ন্ত পেয়েছো? বললো দাদা বলতে পারবো না। আমিতো অফিসে নেই। আজকে সকালে ওটা মেইল করেছি। ওটা নিয়েও টেনশন, পেলো কি না? না হলে আবার পাঠাতে হবে। আজকে সকালে সে জানালো যে, লিখাটা পেয়েছে। এই যে কালকের যন্ত্রণাটা গেলো, আমার মনে হলো কালকের পরে যে আমি যে কোন পরিস্থিতির মধ্যে আমার লেখকসত্তাটা আলাদা হয়ে থাকে। ওটাকে নিয়ে যখন বসি, আমার তখন অন্য কোন কিছু মাথায় থাকে না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মিলন ভাই, আপনার যারা যৌবনে বন্ধু ছিল, আপনার কৈশোরে যারা বন্ধু ছিল, কৈশোরের বন্ধুদের কথা বাদই দিলাম। যৌবনে যারা বন্ধু ছিল, জীবনের মূল অধ্যায়ে আপনার চল্লিশের সময় যারা বন্ধু ছিল, তাঁরা কি এখন আপনার বন্ধু আছে?
ইমদাদুল হক মিলন: আমার বন্ধু ভাগ্যটা ঈর্ষণীয়। আমার সেই ছেলেবেলা থেকে যারা বন্ধু ছিল, যেমন বিক্রমপুরে যখন নানাবাড়িতে থাকতাম, তার পাশে একটা হাজাম বাড়ি ছিল, হাজামতো বুঝো,যারা খৎনাটৎনা করে। সে বাড়ির হাফিজউদ্দিন বলে ছেলে ছিল, ঠিক আমার বয়সী। সারাক্ষণ আমার সঙ্গে থাকতো। তো আমরা গ্রামের একটা মুসলমান বনেদী পরিবার, তো ওরা আমাদের বাড়িতে কাজ-টাজ করতো তো, ছেলেটা আমার সঙ্গে থাকতো।

এখন আমার বয়েসী একটা ছেলে এখন ধরো তার সাত বছর বয়স হয়েছে। তো আমি এর মধ্যে বাড়ি গেছি, ও বাজারে মাছ বিক্রি করে। মাছের কারবার। মাছ-টাছ ফেলে চলে আসছে আমাকে দেখতে, আরে লালন বলে জড়িয়ে ধরছে। তো আমাকে দেখে বলে কী লালন তোমাকে দেখতে আসলাম। আমার এই বন্ধু থেকে শুরু করে পরবর্তী জীবনে যারা বিখ্যাত মানুষ, সাগর,আফজাল, ফরীদী,ফরিদী ছিল বা সুবর্ণা, যাদের সঙ্গে আমার জীবনে বন্ধুত্ব হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে আমার ব্রেক আপ হয়নি। এটা বিস্ময়কর। একজনের সঙ্গেও আমার বন্ধুত্ব নষ্ট হয়নি। এখনও প্রতিদিন অন্তত দশটি বন্ধু ফোন করে আমার খবর নেয়। বিভিন্ন জায়গার। বিদেশ থেকে অন্তত দু টা ফোন রোজ পাই। কানাডা থেকে আমার এক বন্ধু করলো। আমেরিকা থেকে করলো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা দারুণ। যাদের কথা বললেন, তাঁরা সবাইতো শিল্প সাহিত্যেরই লোক।
ইমদাদুল হক মিলন: হঠাৎ করে বুলবুল চৌধুরী একটা ফোন করলো। লেখকদের মধ্যে আমার প্রথম বন্ধু। বললো মিলন আপনাকে খুব মিস করছি। বললাম আসেন, আড্ডা দিই। এরকম কিন্তু।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: দারুণ। মিলন ভাই, লেখালেখির সূত্রেই তো আসলে হাজারও মানুষের সংস্পর্শে গেছেন। সারা দেশের গ্রামের প্রত্যন্ত মানুষটিও আপনার নাম জানে। লেখক হিশেবে নিজেকে সফল মনে করেন?
ইমদাদুল হক মিলন: এই সফল মনে করাটা মানে এই প্রশ্নটার মুখোমুখি সব লেখকদেরই হতে হয়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সাফল্য ব্যাপারটা আসলে কী রকম, বলেন তো?
ইমদাদুল হক মিলন: সাফল্য এবং সার্থকতা এই দুটো জিনিশ নিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে। হয়তো ঐ অর্থে সফল বই বিক্রি হয়েছে, হয়তো মোটামুটি একটা পজিশন তৈরি হয়েছে। কিন্তু লেখক হিশেবে কতটা সার্থক সেটার জবাব আসলে আপনি দিতে পারবেন না। তবে এইটা বোধ হয় এই জগতের জন্য …

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তা তো বটেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্বার্থকতার কথা হচ্ছিলো।
ইমদাদুল হক মিলন:স্বার্থকতার উদাহরণ হচ্ছেন ওয়ালীউল্লাহ বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। এরা লেখক হিশেবে কতটা স্বার্থক এই বিবেচনা করে তারা যাননি। এটা ওদের পাঠক বা বোদ্ধারা করবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু পাঠক তো আসলে খুব ধোঁয়াশা একটি আইডিয়া। যেমন ধরেন আপনার পাঠক যারা, আপনার পাঠকদের মধ্যে খুব কমই পাওয়া যাবে যারা আপনার সব বই পড়েছে। বা নূরজাহান পড়েছে!
ইমদাদুল হক মিলন:না না পড়েনি। সিরিয়াস উপন্যাস, সেই অর্থে যেগুলো খুব খেটে লিখা– পড়েইনি। নুরজাহান বড় দেখেই, কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে আর আগায়নি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সেটাই বলছি।
ইমদাদুল হক মিলন:হতেই পারে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ফলে পাঠকদের কথা বাদ দিয়ে, মানে এখন যেটা মনে হচ্ছে যে, তো আপনি যখন আপনার বইগুলোর দিকে তাকান মানে আপনার বাসায় নিশ্চয় আপনার বই পত্র সাজানো আছে।
ইমদাদুল হক মিলন:আমি ওগুলো একটু লুকিয়ে রাখি। আমার লজ্জা লাগে তো। সিরিয়াসলি তুমি আমার বাসায় আমার বই খুঁজেও পাবে না। আমি যে রুমটাতে কাজ করি সেখানে রাখা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আজকে তো গোপন কথা জানা গেলো।
ইমদাদুল হক মিলন:না, আবার এই বাসায় রেখেছি অনেক সময় প্রয়োজন হয় বলেই। আমার খালি মনে হয় যে এতগুলো লেখা লিখে নিজেকে অপচয় করে, আরে আমি ভালো লিখা লিখলে পারতাম। না না এটা খুব মনে হয়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হা হা হা। আপনার অনেক পাঠকও এটা মনে –করে যে আপনি প্রচুর লিখেছেন কিন্তু ভালো লিখা আপনার, মানে জনপ্রিয় সেই অর্থে লিখার তুলনায় আপনার সিরিয়াস লিখা কম এবং আমি একটা হিশেব করে দেখলাম যে, আপনার সিরিয়াস লিখার সংখ্যাও, তাও আপনার কোন রকম নড়চড় হয়তো হতো না। আপনার অনেকের সাথেই বন্ধুত্ব আছে এটা দারুণ। আপনার লেখক বন্ধুরা এখনও আপনাকে ফোন করে। আপনার লেখালেখির সাথে, মানে আপনি সার্থকতার কথা বললেন, আপনি যখন তাকান বইগুলোর দিকে, তখন আপনার কী মনে হয়—
ইমদাদুল হক মিলন:কোন কোন বইয়ের জন্য ভালোই লাগে কেমন আছো সবুজ পাতা বইটি, এই বইটির কথা ভাবলে আমার খুব ভালো লাগে যে আমি এমন একটা জীবন কাহিনীতে, এমন একটা লেখা লিখেছি। যেমনটা লিখতে চেয়েছি, অনেকটাই তেমন করে লিখেছি। নুরজাহান-এর দিকে তাকালে আমার ভালো লাগে যে, এত প্রেমের উপন্যাস লিখেছি কিন্তু সবগুলো প্রেমের উপন্যাসের মধ্যে তার মানে এই উপন্যাসটিতে- আমি আমার মত করে চেষ্টা করেছি। এখন সার্থকতা যদি বলো তো অনেকেই, যেমন সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলে যে সময় অতিক্রম করে যাওয়ার মধ্যে… অনেক সময় বলে যে। যদি সেটুকু পেরে থাকি তাহলেতো সার্থকতা কিছুটা আছেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মিলন ভাই, এই যে আপনিই আপনাকে কীভাবে মনে রাখবেন? ধরুন আপনি যদি না থাকেন, তাহলে আপনাকে কীভাবে মনে রাখলে আপনার ভালো লাগবে?
ইমদাদুল হক মিলন:আমি একটা নুরজাহান লিখেছি, এটার জন্য যদি মনে রাখে, যে হ্যাঁ নুরজাহান নামে একটা উপন্যাস লিখেছিলো একদিন ইমদাদুল হক মিলন। তাহলে আমার ভালো লাগবে এবং সেটা আমি অনেক গৌরব বোধ করবো। মৃত্যুর পরের জগতে থেকেও আমি খুব গৌরব বোধ করবো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অনেক ধন্যবাদ মিলন ভাই, আমার খুবই ভালো লাগলো।
ইমদাদুল হক মিলন:আমারও খুবই ভালো লাগলো তোমার সঙ্গে কথা বলে। আমি অনেক ইন্টারভিউ দিই তো, অনেকে আসে, মানে আমি তোমার ইন্টারভিউটা, তোমার সঙ্গটা খুব এনজয় করেছি। খুব এনজয় করেছি। কারন তুমি অনেক প্রসঙ্গ এনেছ, এমন কিছু কথা আমার কাছ থেকে বের করেছো বা জানতে চেয়েছো যে এগুলো কেউ বলে না। সবাই এসে বলে যে, আপনার প্রথম লেখা কী, কেমন, কবে আপনার প্রথম বইটা বেরুলো। তো এইগুলো আমি গত চল্লিশ বছর ধরেই বলে যাচ্ছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: থ্যাঙ্ক ইউ মিলন ভাই, এটা আমার জন্য একটা দারুণ ব্যাপার।
ইমদাদুল হক মিলন:না আমার খুব ভালো লেগেছে। দাও ঐ বইটা আমি তোমাকে লিখে দিই।

বিডি নিউজ 24

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.