মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির দুই শীর্ষ নেতা মুখোমুখি

মোজাম্মেল হোসেন সজলঃ মুন্সীগঞ্জে দুই শীর্ষ নেতার মুখোমুখি অবস্থানে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না জেলা বিএনপি। স্থানীয় নেতারাও ভাগে ভাগে বিভক্ত। সাত সদস্যের জেলা কমিটিও দুই ভাগে বিভক্ত। গত বছরের এপ্রিল মাসে বিএনপির মহাসচিব জেলা বিএনপির কমিটি অনুমোদন দিয়ে শর্ত জুড়ে দেন, ৩০ দিনের মধ্যে ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করে অনুমোদন নেয়ার। কিন্তু কমিটি গঠনে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে দুই শীর্ষ নেতার চরম বিরোধ। এদের একজন জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল হাই এবং অপরজন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাবেক ছাত্রনেতা কামরুজ্জামান রতন। আবার এদের সঙ্গে গ্রুপিংয়ে রয়েছে জেলার আরো দুই শীর্ষ নেতা।

আবদুল হাইয়ের পক্ষে রয়েছেন, বিভিন্ন দল থেকে আগত ও বর্তমান কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসভাপতি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা কামরুজ্জামান রতনের সঙ্গে রয়েছেন সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সিনহা।

শীর্ষ নেতাদের গ্রুপিংয়ের শিকার জেলা, বিভিন্ন উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপি এবং অঙ্গ-সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীরা। গত বছরের এপ্রিল মাসে জেলা বিএনপির নতুন কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় বিএনপির সমাজকল্যাণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রতন মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এরপরই ভাগ বসানো এবং আগামীতে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনটি কেড়ে নেয়ার আশঙ্কায় একই আসনের জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাইয়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে বিরোধ তুঙ্গে উঠে। তবে, জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের জন্মস্থান একই উপজেলা গজারিয়ায়। আবদুল হাই ১৯৭৯ সাল থেকে গজারিয়ার ভোট ব্যাংকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসছেন। প্রতিটি নির্বাচনেই মুন্সীগঞ্জ সদরে আবদুল হাইয়ের ভোট প্রাপ্তি কম ছিলো। আর সেই গজারিয়ার ভবেরচরের লক্ষিপুরা গ্রামের কামরুজ্জামান রতন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়া এবং দুই শীর্ষ নেতার দ্বন্দ্বে গজারিয়া বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠন দুইভাবে বিভক্ত।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর গত বছরের ২৫ শে মার্চ শহরের একটি কমিউনিটি সেন্টারের জেলা বিএনপির প্রথম প্রতিনিধি সভায় কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে এই দুই নেতা সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং মিলেমিশে কাজ করার ঘোষণা দেন। কিন্তু এর কিছুদিন পরই তারা আলাদাভাবে কর্মসূচি পালন করা শুরু করেন।

আবদুল হাই বিরোধীরা মনে করেন, তার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে মুন্সীগঞ্জ বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। অযোগ্য ও মাদকাসক্তদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দিয়ে রেখেছেন। তিনি ও তার ভাই সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. মহিউদ্দিন দলকে পেছনে দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। আবদুল হাইয়েরও আগের সে জনপ্রিয়তা নেই। যার প্রমাণ গত উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন।

২০১৪ সালের ২৩ শে মার্চ গজারিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে প্রার্থী দেয়া হয় মুজিবুর রহমানকে। এই নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হন গজারিয়া উপজেলা যুবদলের সভাপতি ও বাউশিয়া ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান দেওয়ান মনা। নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের দিন দু’পক্ষ ব্যাপক সংঘর্ষে জড়ায়। ওইদিন গজারিয়া উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের ভোট গ্রহণ চলাকালে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রেফায়েতউল্লাহ খান তোতার সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতায় নৌকা প্রার্থীর সমর্থক বালুয়াকান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগ নেতা শামসুদ্দিন প্রধান নিহত এবং ভোট গণনাকালে যৌথ বাহিনীর গুলিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল মান্নান দেওয়ান মনার স্ত্রী লাকি বেগম ও ছাত্রলীগ নেতা জোটন নিহত হয়। নানা কেন্দ্রে সহিংসতার ঘটনায় ৯টি ভোট কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়। এরপর একই বছরের ৯ এপ্রিল স্থগিত ৯টি কেন্দ্রের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী তোতা জয়লাভ করেন।

স্ত্রী লাকি বেগম নিহত হওয়ার শোকে নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার পরও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল মান্নান দেওয়ান মনা (ঘোড়া) ১১ হাজার ৯৬৩ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন এবং ৪ হাজার ৩২৩ ভোট পেয়ে বিএনপির প্রার্থী মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির তৎকালীন যুগ্ম-সম্পাদক মজিবুর রহমান (আনারস) চতুর্থ হন। এরপর ২০১৬ সালের মে মাসে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সব ইউনিয়নেই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও সে সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি স্থানীয় বিএনপি। গজারিয়ার অধিকাংশ ইউনিয়নে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থীরা জামানত হারান। এমনকি জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাই তার নিজ ইউনিয়ন এবং বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত জেলা সদরের পঞ্চসার ইউনিয়নও ধরে রাখতে পারেননি।

শান্তিপূর্ণ ও পক্ষপাতহীন ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. গোলাম মোস্তফা কারাগারে বসেই জয়ী হন। আর এইসবের জন্য জেলা বিএনপি সভাপতির স্বেচ্ছাচারিতা ও অদক্ষতাকে দায়ি করেছেন কামরুজ্জামান রতন অনুসারিরা।

কামরুজ্জামান রতন নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমান উল্লাহ আমানের আহবায়ক কমিটির সদস্য ও ১৯৯১ সালে রুহুল কবীর রিজভী-ইলিয়াস আলী কমিটির প্রথম যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ওদিকে, আবদুল হাই ১৯৭৮ সালের পঞ্চসার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ার পরপরই ১৯৭৯ সালে মুন্সীগঞ্জ সদর-৪ (মুন্সীগঞ্জ সদর-গজারিয়া) আসনে (বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে) ২০০১ সাল পর্যন্ত বিএনপি অংশ নেয়া প্রতিটি নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে আবদুল হাইকে সরিয়ে ঢাকা-৪ আসনে প্রার্থী করা হলে সেখানে তিনি পরাজিত হন।

কামরুজ্জামান রতন বলেন, গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জে সরকার বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে গেলে আবদুল হাই ও তার লোকজন আমাকে অপমান-অপদস্থ করে। তাদের আন্দোলন কেবল নিজ বাড়ি মুক্তারপুরে। তাও পুলিশের সাথে আঁতাত করে সামান্যতম সময়ের জন্য। আমাকে অপমান-অপদস্থ করার ঘটনায় বিএনপির চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। সে জবাব এখনও দেননি জেলা বিএনপির সভাপতি। এরই মধ্যে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে। ওই ঘটনার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত আবদুল হাইয়ের অধীনে নামকাওয়াস্তের কোন কর্মসূচিতে তিনি অংশ নেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন।

তিনি আরো জানান, দলীয় বিবেদের কারণে জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা যাচ্ছে না। তবে, কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল হাই বলেছেন, বিগত উপজেলা ও ইউপি নির্বাচনে অযোগ্য কোন প্রার্থীকে মনোনীত করা হয়নি। আওয়ামী লীগের দমন-পীড়ন ও দখলবাজির ঘটনায় প্রার্থীরা ভালো করতে পারেনি।

তিনি আরো বলেন, কেউ কর্মসূচিতে না আসলে তাকে ধরে আনবো কেনো। চেয়ারপারসনতো ব্যবস্থা নেবেন, দলীয় শৃঙ্খলা কেউ না মানলে তার জবাব তাকেই দিতে হয়। ম্যাডামতো এক পক্ষের নন, তিনি দু’পক্ষের কথা শুনেই ব্যবস্থা নেবেন। তখনই আসলটা বেরিয়ে আসবে।

অবজারভার

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s