লোকজ শিল্পের বিশ্বযাত্রী : পটচিত্রের শম্ভু আচার্য

সাড়ে চার শ বছর ধরে পটচিত্রের গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারাকে বাঁচিয়ে রেখেছে মুন্সিগঞ্জের কালিন্দীপাড়ার ঠাকুরবাড়ির আচার্য পরিবার। আট পুরুষ ধরে এ শিল্পকে লালন করে চলেছেন তাঁরা। সেই বংশধারার নবম পুরুষ শম্ভু আচার্য। ৯ এপ্রিল সোমবার সকালে নিজের ঘরে বসে গাজীর পটে চূড়ান্ত কাজ সারছিলেন তিনি। সঙ্গে ছেলে অভিষেক আচার্য। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কথা বললেন শম্ভু আচার্য।

১৯৭৭ সালের ঘটনা। সেবার কারুশিল্পবিশারদ তোফায়েল আহমেদ কলকাতার আশুতোষ জাদুঘরে দেখেন, একটি পটচিত্রের পাশে লেখা ‘উভয় বঙ্গের একমাত্র গাজীর পট’। তোফায়েল আহমেদ নিজেই অবাক-বাংলাদেশে কোনো পটচিত্রী আছেন, সেটা জানা ছিল না তাঁর। দেশে ফিরে তোফায়েল আহমেদ খোঁজখবর নিলেন। নরসিংদী গিয়ে জানলেন, সেখানে গায়েন দুর্জন আলীর কাছে গাজীর পট আছে। দুর্জন আলী জানালেন, এটি মুন্সিগঞ্জের সুধীর আচার্যের কাছ থেকে কেনা। সুধীর আচার্য হলেন শম্ভু আচার্যের বাবা। সেই থেকে আচার্য পরিবারের পটচিত্রের গৌরবের প্রচার শুরু।

শম্ভু বংশপরম্পরায় আঁকাআঁকিতে এলেও বাবার সঙ্গে সামান্য তফাত আছে ছেলের। বাবা আঁকতেন গামছায়, শম্ভু আঁকেন ক্যানভাসে। আঁকার ক্যানভাসটি বিশেষভাবে প্রস্তুত করেন নিজেই। ইটের গুঁড়া ও চক পাউডারের সঙ্গে তেঁতুলবিচির আঠা মিশিয়ে তৈরি হয় মিশ্রণ। এ মিশ্রণ মার্কিন কাপড়ে লেপে দিয়ে তৈরি হয় আঁকার জমিন। এর ওপরই চলে রেখা-রঙের খেলা। ইটের গুঁড়া, তেঁতুলবিচি, ডিমের কুসুম, সাগুদানা, বেলের কষ, মাটি, নীল, সিঁদুর, মশালের ধোঁয়া-এসব দিয়ে তৈরি হয় রং। আর তুলি বানানো হয় ছাগলের লোম দিয়ে।

২০০৬ সালে গ্যালারি কায়ার উদ্যোগে একটি কর্মশালা পরিচালনা করেছিলেন শম্ভু আচার্য, যেখানে তিনি এসব রঙের দ্রব্যগুণ ও পটচিত্র সম্পর্কে এ দেশের গুণী শিল্পীদের হাতে-কলমে শিখিয়েছিলেন। সেই কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী আমিনুল ইসলাম, কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, সমরজিৎ রায়চৌধুরী, নিতুন কুন্ডু, হামিদুজ্জামান খান, কালিদাস কর্মকার প্রমুখ।

জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন শম্ভু আচার্য।

শম্ভু আচার্য মূলত ঐতিহ্যবাহী পটচিত্রধারার চিত্রকে নতুন আঙ্গিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। যেখানে বিলুপ্তপ্রায় লোকচিত্রধারা উপস্থাপিত হয়েছে নতুনভাবে। তাঁর ক্যানভাসে এখন উঠে এসেছে সমসাময়িক গ্রামীণ ও নাগরিক জীবন। ফুল, পাখি, জেলে, কামার, কুমার, তাঁতির সরল জীবন যেমন উঠে এসেছে, তেমনি বারবার এসেছে রাসলীলা, মহররম পর্ব, ময়ূরপঙ্খি, কৃষ্ণের নৌকাবিলাস।

শম্ভু আচার্যের পটচিত্র পৌঁছে গেছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম, চীনের কুবিং মিউজিয়াম ও জাপানের ফুকুওকা মিউজিয়ামে। ইতিমধ্যে শিল্পী শম্ভু আচার্যের ছবি নিয়ে হয়েছে বেশ কয়েকটি একক প্রদর্শনী। প্রথমটি হয় ১৯৯৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায়। ১৯৯৯ সালে লন্ডনে। প্রদর্শনী হয়েছে দেশে স্বনামধন্য গ্যালারিগুলোতে। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে চীনে তাঁর ছবির দুটি প্রদর্শনী হয়।

শম্ভু আচার্য বলেন, ‘আমরা পারিবারিকভাবে এ ধারাকে টিকিয়ে রেখেছি। আমার তিন মেয়ে, এক ছেলে। তারাও পটচিত্র আঁকছে।’

শম্ভু আচার্যকে নানা সময় সহায়তা ও উৎসাহ দিয়েছেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, শম্ভু তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য ধারণ করে তাতে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করেছেন। তিনি পটের ছবি আঁকেন ঐতিহ্য অনুসরণ করে, তবে বিষয় হিসেবে বেছে নেন আধুনিক জনজীবন।

প্রথম আলো

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.