জাপানে অনুষ্ঠিত হয়েছে টোকিও বৈশাখী মেলা

রাহমান মনি: টোকিও বৈশাখী মেলায় জাপান প্রবাসীদের আনন্দ উল্লাসের যেমন সীমা পরিসীমা নেই; তেমনি আগ্রহ, উৎকণ্ঠারও শেষ নেই। আর এই উৎকণ্ঠের উৎপত্তিটা হয় বৈশাখী মেলা কমিটির সর্বোচ্চ পদ থেকে, বিতর্কিত কর্ম, অনাকাক্সিক্ষত, অশালীন মন্তব্য উৎকণ্ঠ কে আরও বাড়িয়ে দেয় বহুলাংশে।

তারপরও প্রবাসীদের দৃঢ় মনোবল কর্মযজ্ঞতা এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত টোকিও বৈশাখী মেলা সাফল্যের মুখ দেখে থাকে, আর প্রবাসীরা জাপানের মাটিতে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করে আনন্দের একটি দিন কাটায়। টোকিওর তোশিমা সিটির ইকেবুকুরো নিশিগুচি পার্কটি হয়ে ওঠে ছোট্ট একখ- বাংলাদেশ।

প্রতি বছরের মতো এবারও টোকিওর তোশিমা সিটি ইকেবুকুরো নিশিগুর্চি পার্কে বসেছিল জাপান প্রবাসীদের মিলনমেলার হাট। ১৫ এপ্রিল ২০১৮ রোববার ইকেবুকুরো এলাকাটি হয়েছিল এক টুকরো বাংলাদেশ। আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হয়েছিল বাংলাভাষা, মানুষ দেখেছে বাংলাদেশিদের পোশাক সংস্কৃতি, স্বাদ নিয়েছে বাংলাদেশের খাদ্য সংস্কৃতির এবং উপভোগ করেছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সংস্কৃতি। এদিন বর্ণিল সাজে সেজেছিল শহীদ মিনার খ্যাত ইকেবুকুরো নিশিগুর্চি পার্কটি।

২০০০ সাল থেকে টোকিওর তোশিমা সিটির ইকেবুকুরো নিশিগুচি পার্কটিতে টোকিও বৈশাখী মেলা নামে বাংলা নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়। এর আগে একই স্থানে ও অন্যান্য স্থানে বিভিন্ন নামে বাংলা নববর্ষ পালন করে জাপান প্রবাসীরা। ২০০০ সাল থেকে জাপান বাংলাদেশ সোসাইটি (জেবিএস) নামক একটি এনপিও মেলাটি’র ভার গ্রহণ করে টোকিও বৈশাখী মেলা নাম দিয়ে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে জাপান প্রবাসীদের একত্রিত করার উদ্যোগ নেয়। সেই থেকে নিয়মিতভাবে মেলাটি উদযাপিত হয়ে আসছে।

এবারের আয়োজনটি ছিল ১৯তম। মেলাটিতে জাপানিদের সম্পৃক্ত এবং আগ্রহী করে তোলার জন্য বৈশাখী মেলা ও কারি ফেস্টিভ্যাল”নামটি দিয়ে কারি ফেস্টিভ্যাল জুড়ে দেয়া হয়। মেইন ব্যানারটি জাপানি ভাষায় লিখা থাকে ‘কারি ফেস্টিভ্যাল অ্যান্ড বইশাখী মেলা (বাংলাদেশ নববর্ষ)। ভিতরে অবশ্য টোকিও বৈশাখী মেলা লিখা অন্য আরেকটি ব্যানার স্টেজের পিছনের দিকটাতে শোভা পায়।

মেলাতে বিভিন্ন পসরার মোট ৩০টি স্টল ছিল। যার মধ্যে ১৯টি ছিল ভোজন সামগ্রীর। এছাড়া বিনামুল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর জন্য স্টল ছিল।

সকাল ১০টায় শুরু হয়ে একটানা ৮ ঘণ্টার আয়োজনটির সন্ধ্যা ৬টায় আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হলেও অনেক রাত পর্যন্ত প্রবাসীরা মেলা প্রাঙ্গণে অবস্থান করে বিভিন্ন আড্ডায় মেতে থাকেন। এ যেন শেষ হইয়াও শেষ হতে চায় না।

মুক্ত অনুষ্ঠান ছোটদের ছবি আঁকা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, জাপানি অনুষ্ঠান, ভিআইপি সংবর্ধনা, স্থানীয় শিল্পীদের সংগীত পরিবেশনা এবং সবশেষে বাংলাদেশ থেকে আগত শিল্পীদের সংগীত পরিবেশনা দিয়ে অনুষ্ঠানমালা সাজানো ছিল।

ভিআইপি অতিথিদের মধ্যে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত হিরোয়াসু ইযুমি। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত মাতসুশিরো হোরিগুচি, তোশিমা সিটি পর্যটন পরিষদের প্রতিনিধি হিরোয়ুকি ওয়াতানাবে, তোশিমা সিটি সংস্কৃতি ও বাণিজ্য বিভাগীয় প্রধান আকিরা সাইতো, আয়োজক সংগঠনের পক্ষে ড. ওসামু ওতসুবো।
এছাড়াও জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি কমিটির মহাসচিব ইচিরো সুকাদা বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও বিশেষ কারণে তিনি উপস্থিত হতে না পারায় তিনি একটি বাণী লিখে পাঠান। বাণীটি পাঠ করে শুনানো হয়।

প্রবাসীদের কোনো আয়োজনে একই মঞ্চে দুই দেশের রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতি ছিল বিরল একটি মুহূর্ত। আর তাতে ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে প্রাক্তন আরেকজন রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতি।

টোকিও বৈশাখী মেলায় এ বছর উপস্থাপনা প্যানেলে জুয়েল আহসান কামরুল, নারমীন হক, নিয়াজ আহমেদ জুয়েল এবং জাপানি অংশে ড. কিনুকাওয়া নোরিকো ছিলেন।

এবার বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত শিল্পীরা ছিলেন পাওয়ার ভয়েজ এর শামীম আহমেদ এবং চ্যানেল আই সেরা আইডল নিশ্চুপ বৃষ্টি। এছাড়া যন্ত্রে ছিলেন রাসেল, সৌরভ ও মিথুন।

উত্তরণ, স্বরলিপি গানের মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করতে সক্ষম হলেও ব্যর্থ হয়েছেন বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত শিল্পীরা। যদিও স্টেজ এর সামনে কিছুসংখ্যক দর্শক উল্লাসে মেতেছিলেন।

বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত শিল্পী শামীম আহমেদ ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা’ গানটি দিয়ে শুরু করে হঠাৎ করে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ অর্থাৎ জাতীয় সংগীত কেনো শুরু করলেন তা কারোরই বোধগম্য হয়নি। বিব্রত বোধ করে কেউ কেউ জাতীয় সংগীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়ালেও অধিকাংশরা ছিলেন যে যার মতো।

বিশ্বের যে কোনো দেশে জাতীয় সংগীত গাওয়া বা বাজানোর ক্ষেত্রে নিয়ম রয়েছে। নিয়মকানুন মেনে জাতীয় সংগীত গাওয়া বা বাজানো সে দেশের নাগরিকদের অবশ্য কর্তব্য। নিয়ম রয়েছে বাংলাদেশেও। বাংলাদেশ ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয় সংগীত পরিবেশনার ওপর একটি বিধিমালা প্রণয়ন করেন। বিধিমালা অনুযায়ী- জাতীয় সংগীতের পুরোটা সব অনুষ্ঠানে গাওয়ার নিয়ম নেই। বিভিন্ন জাতীয় দিবস, যেমন একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের শুরুতে ও শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ সংগীত বাজাতে হবে। তবে স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসের প্যারেড অনুষ্ঠানে দুই লাইন শুরুতে বাজানোর নিয়ম রয়েছে।

জাতীয় সংগীত কোনোভাবেই ভুল গাওয়া যাবে না। একদম সঠিক উচ্চারণে এবং সুরে শুদ্ধ করে গাইতে হবে এবং গাওয়ার সময় এর প্রতি যথাযথ সম্মানও দেখাতে হবে। যখন জাতীয় সংগীত বাজানো হয় ও জাতীয় পতাকা প্রদর্শন করা হয়, তখন উপস্থিত সবাইকে জাতীয় পতাকার দিকে মুখ করে দাঁড়াতে হবে। যখন পতাকা প্রদর্শন না করা হয়, তখন সবাইকে বাদক দলের দিকে মুখ করে দাঁড়াতে হবে এবং কারও মাথায় টুপি থাকলে খুলে ফেলতে হবে। অনেককেই বুকে হাত রেখে জাতীয় সংগীত গাইতে দেখা যায়। এটি আসলে সঠিক নয়। জাতীয় সংগীত গাইতে হবে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে। সাধারণ নাগরিকদের বাইরে ডিফেন্স বা প্রতিরক্ষাবাহিনীর জন্য জাতীয় সংগীত গাওয়ার নিয়ম পৃথকভাবে বলা হয়েছে।

কোনো গানের মাঝখানে জাতীয় সংগীত বিকৃতভাবে পরিবেশন শুধু অন্যায়ই নয় অপরাধও বটে। যেটা অর্থের বিনিময়ে আসা অতিথি শিল্পীরা করেছে জাপানের মাটিতে। অবাক করার বিষয় হলো আয়োজকরা ছিল নির্লিপ্ত।

মাত্রারিক্ত মিউজিক এবং সাউন্ডের জন্য গানের কথা বুঝা বা শোনার জন্য বিশেষ গুণের প্রয়োজন ছিল দর্শক-শ্রোতাদের। বৃষ্টির গানের কথা না লিখাই ভালো।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা বাংলাদেশের জনপ্রিয় গানগুলির দুই-চার লাইন করে গেয়ে শ্রোতাদের মন জয় করতে চেষ্টা করলে এমন দু’চার লাইন সবাই গাইতে পারেন বলে শ্রোতাদের কাছ থেকে মন্তব্য শোনা যায়।

সপরিবারে উপস্থিতির পাশাপাশি এবারের বৈশাখী মেলাতে তরুণদের উপস্থিতি বেশি লক্ষ্য করা গেছে। এই তরুণরা ছাত্র বিধায় অর্ধ বেলা কাজ করে শেষ বেলায় মেলার মাঠে উপস্থিত হলে মেলা প্রাঙ্গণে প্রবাসীদের উপস্থিতি লক্ষণীয় ছিল।

সার্বিক পরিস্থিতি এবং আবহাওয়া পূর্বাভাষের পরিপেক্ষিতে দোদুল্য থাকলেও শেষের দিকে মেলাতে প্রবাসীদের ঢল নেমেছিল। জাপান আবহাওয়া বিভাগের নিখুঁত পূর্বাভাষ অনুযায়ী সকাল ৮টার পর বৃষ্টি থেমে যায় এবং এই সময়ের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
দেখা হবে আগামী মেলাতে আশাবাদ ব্যক্ত করে মেলার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.