জাপান সফরে ড. ইউনুস -রাহমান মনি

ড. ইউনূস জাপানিজ সমাজে বিশেষ করে শিক্ষিত শ্রেণির কাছে পরম পূজনীয় একটি নাম। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তার একটি বক্তব্য শোনার জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় থাকেন। শিক্ষার্থীরা যতটা না থাকেন তার চেয়েও বেশি আগ্রহী থাকেন শিক্ষকরা।

আর সেই জন্যই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলি ড. ইউনূসের একটি লেকচারের ব্যবস্থা করার জন্য দীর্ঘদিন পূর্ব থেকেই আবেদন জানিয়ে রাখেন। নোবেল লরিয়েট প্রফেসর ইউনূস-এর একটি লেকচার তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সম্মানেরও। তাই, এই সুযোগটি কেউ হাতছাড়া করতে চান না।

ড. ইউনূস একমাত্র বাংলাদেশি যিনি একজন বেসরকারি লোক হয়েও জাপানের বিমানবন্দরে নামার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার শুরু হয় এবং বিমানবন্দর ত্যাগ করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশ সরকারও সচরাচর যা পায় না।

প্রিন্ট মিডিয়া এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে তিনি স্থান পান। জাপানের প্রথমসারির পত্রিকাগুলি গুরুত্ব সহকারে স্থান দিয়ে থাকে। জাপান জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা (এনএইচকে) নোবেল লরিয়েট প্রফেসর ইউনূসের সাক্ষাৎকার ধারণ করে সম্প্রচার করে থাকে। যেখানে তার ব্যক্তি জীবন ও কর্ম বিশদভাবে তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বেলায়ও এমনটি দেখা যায় না।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এমন কি জাপান সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে ড. ইউনূস বছরে একাধিকবার জাপান সফর করে থাকেন। গতবছরও তিনি টোকিও গভর্নর ইয়ুরিকো কোইকের আমন্ত্রণে জাপান সফর করেছিলেন আসন্ন ২০২০ সালে অনুষ্ঠিতব্য টোকিও অলিম্পিক প্যারা অলিম্পিক আসরের পরামর্শদানের জন্য।

২০১৮’র মার্চের শেষ সপ্তাহে তিনি জাপান সফর করেন। তবে এবারের সফরটা একটু ভিন্ন আঙ্গিকের ছিল। এবারের সফর ছিল তার রচিত গ্রন্থ ‘অ ডড়ৎষফ ড়ভ ঞযৎবব তবৎড়ং’ বইটির জাপানিজ সংস্কর উদ্বোধন করার জন্য জাপান সফর। ২৪ মার্চ তিনি জাপান পৌঁছেন।

তার সফরের প্রথম দিনে তিনি বিজুকু’র ১৩তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে অ ডড়ৎষফ ড়ভ ঞযৎবব তবৎড়ং-এর প্রকাশনা উৎসব উদযাপনের জন্য কিয়োতো আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্য সরাসরি শোনার জন্য এবং নিজেদের কাজের মধ্য দিয়ে সমাজকে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ কিয়োতো আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জড়ো হয়েছিলেন জাপানের ১,১০০ প্রশিক্ষণার্থী মেকাপ শিল্পী ও তাদের প্রশিক্ষকগণ। সম্মেলনের আয়োজকদের পক্ষে প্রশিক্ষন স্কুল ‘বিজুকু’র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট মি. উচিদা সূত্রে জানা যায়, নিজেদের সৌন্দর্য নিয়ে অনেক জাপানিজ নারীই হীনম্মন্যতায় ভোগেন তার এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৭ হাজারের ও বেশি নারীকে প্রশিক্ষিত করার জন্য প্রফেসর ইউনুস স্কুলটির প্রেসিডেন্ট মি. উচিদাকে অভিনন্দন জানান। তিনি জাপানের বাইরেও তাদের এই সেবা সম্প্রসারিত করতে তাদের উৎসাহিত করেন।

তিনি বলেন, যে সকল দেশে মানসম্মত বিউটি পার্লারের চাহিদা প্রতিদিন বাড়ছে বাংলাদেশ তাদেরই একটি। বাংলাদেশে নবীন উদ্যোক্তা কর্মসূচির মাধ্যমে অনেক সামাজিক ব্যবসা গড়ে তোলা হয়েছে যেখানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মহিলারা গ্রামাঞ্চলে বিউটি পার্লার পরিচালনা করছেন।

একইদিন প্রফেসর ইউনূস মেয়র মি.দাইসাকু কাদোকাওয়ার সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হন। কিয়োতো নগরীর শীর্ষ কর্মকর্তারা এই সভায় উপস্থিত ছিলেন। মেয়র মিডিয়ার উপস্থিতিতে প্রফেসর ইউনূসকে কিয়োতো নগরীতে স্বাগত জানিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক সম্মাননাপত্র পাঠ করেন, যেখানে তিনি প্রফেসর ইউনুসের কর্ম ও উদ্ভাবন উদাহরন থেকে তার নগরীর শিক্ষা গ্রহণ করার আগ্রহ ব্যক্ত করেন।

স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিগণের অংশগ্রহণে এক ব্যবসায়িক বৈঠকে কিয়োতো নগরীকে কীভাবে সামাজিক ব্যবসা নগরীতে পরিণত করা যায় তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।

প্রফেসর ইউনূস ঐ দিনই তার আদর্শে সামাজিক ব্যবসার সঙ্গে ইতোমধ্যে যুক্ত অথবা সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী এমন প্রধান নির্বাহীদের উদ্দেশে ‘কর্পোরেট ব্যবসা পরিকল্পনায় সামাজিক ব্যবসা কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়’ শীর্ষক একটি বিশেষ বক্তব্য রাখেন।

২৫ মার্চ প্রফেসর ইউনূস কিয়োতো নগরীর আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের আ্যনেক্স হলে ‘বৈশ্বিক ভবিষ্যৎ সামাজিক সচেতন উচ্চাশা দিয়ে কীভাবে সামাজিক সমস্যাগুলোর সমাধান করা যায়’ শীর্ষক এক বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্য শুনতে জড়ো হয়েছিল প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০০ শিক্ষার্থীসহ বিশেষভাবে আমন্ত্রিত শিকি কমিউনিটি নেটওয়ার্কের অধীনস্ত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আরো ২০ হাজার শিক্ষার্থী। এরপর তিনি ‘একবিংশ শতাব্দীতে টিকে থাকার লক্ষ্যে সামাজিক ব্যবসায়ে রূপান্তর’ শীর্ষক এক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন।

২৬ মার্চ টোকিওর শিবুয়াতে অবস্থিত ইউনাইটেড নেশন ইউনিভার্সিটিতে তার ‘অ ডড়ৎষফ ড়ভ ঞযৎবব তবৎড়ং’-এর ওপর মূল বক্তৃতা শুনতে জড়ো হয়েছিলেন ৩০০ ব্যবসায়িক নির্বাহী ও নবীন উদ্যোক্তা। প্রফেসর ইউনুস জাপান ও ভারতের বিভিন্ন বিশেষায়িত ক্ষেত্র থেকে আগত সামাজিকভাবে সচেতন তরুণ নেতাদের সঙ্গে বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থাকে একটি ‘তিন শূন্য’র পৃথিবীতে রূপান্তরের লক্ষ্যে তারা কীভাবে একযোগে কাজ করতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করেন। সেমিনারে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং মিডিয়াকর্মী উপস্থিত থেকে প্রফেসর ইউনূসের বক্তব্য শোনেন। এইদিন ‘অ ডড়ৎষফ ড়ভ ঞযৎবব তবৎড়ং’ বইটির প্রায় ৩০০ কপি বিক্রয় হয়। বইটির মূল্য নির্ধারণ করা হয় জাপানিজ ২,০০০ ইয়েন।

এছাড়াও ২৬ মার্চ সকালে ভিআইপি কনফারেন্স রুমে জাপান প্রবাসী ব্যবসায়ী এনকে ইন্টারন্যাশনালের সিইও এমডি সহিদুল ইসলাম নান্নুর সঙ্গে এক ব্যবসায়িক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষ করে উগান্ডাতে জমি ব্যবহার করে সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে উৎপন্ন পণ্য জাপানে বাজারজাত করার বিষয়ে মি. নান্নু প্রফেসর ইউনূসকে ব্রিফ করেন এবং তার পরামর্শ কামনা করেন।

উল্লেখ্য, মি. নান্নু দুই দশকেরও বেশ সময় ধরে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসা করে আসছেন। অনেক দেশেই গাড়ি ব্যবসায়ে তার শোরুম রয়েছে। এছাড়াও তিনি সেখানকার জমি লিজ নিয়ে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক এবং স্থানীয় শ্রমিকদের সমন্বয়ে কৃষি জমি ব্যবহার করে ফসল উৎপন্ন করার কাজে বহু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে আসছেন।

২৭ মার্চ নোবেল লরিয়েট প্রফেসর মুহাম্মদ টোকিওর আকাসাকায় অবস্থিত আর্ক মোরি ভবনে উরাসেনকে-এর মাস্টার চেন সুশিতসুর সঙ্গে এক বৈঠক করেন। বৈঠকটি ছিল প্রফেসর ইউনূস এবং ইউনেস্কোর শুভেচ্ছা দূত চেন সুশিতসু এর মধ্যে সাক্ষাৎকারধর্মী আলোচনা।

এদিন তিনি হিরোশিমা সফর করেন। হিরোশিমা নগরীর মেয়র এবং হিরোশিমা প্রদেশের গভর্নরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। তার নতুন গ্রন্থ ‘অ ডড়ৎষফ ড়ভ ঞযৎবব তবৎড়ং’ এর জাপানিজ অনুবাদ প্রকাশ উপলক্ষে তিনি হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান করেন। তাঁকে হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ‘ডিশটিংগুইশড প্রফেসর’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেয়া হয়। হিরোশিমা সফরকালে তিনি হিরোশিমা পীস মেমোরিয়াল পার্কে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে পারমাণবিক বোমাবর্ষণে নিহত হাজার হাজার হিরোশিমাবাসীর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। তাকে হিরোশিমা শান্তি কেন্দ্রের ‘সন্মানিত উপদেষ্টা’ হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়।

এছাড়াও প্রফেসর ইউনূস জাপানের ইয়োশিমোতো কোজি কোং লিমিটেড এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘ইউনূস ফ্যামিলি কনফারেন্স’-এ প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন, যেখানে জাপানের বিভিন্ন এলাকা থেকে সামাজিক ব্যবসা উদ্যোক্তা ও সামাজিক ব্যবসায়ে উৎসাহী ব্যক্তিরা যোগ দেন। সম্মেলনে তিনি নতুন জাপানি সামাজিক ব্যবসা জয়েন্ট ভেঞ্চার ‘ইউনূস ইয়োশিমোতো সোশ্যাল অ্যাকশন’ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। ইয়োশিমোতো কোজিও কোং লিমিটেড ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত। জাপানের অন্যতম এন্টারটেইনমেন্ট কনগ্লোমারেট। নতুন এই সামাজিক ব্যবসাটি জাপানে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা যেমন, একাকীত্ব, বিষণœতা ও বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন অসুখ নিরাময়ে কাজ করবে।

যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন, ড. ইউনূস যখনই জাপান এসেছেন, তখনই কিছুটা হলেও বাংলাদেশিদের (প্রবাসী) জন্য সময় দিয়েছেন। শ্রদ্ধাভাজন আপনজনকে কাছে পেয়ে, তার সান্নিধ্য প্রবাসীদের আবেগে আপ্লুত করেছে।

আর প্রতিবারই এই সুযোগটি তৈরি করে দিয়েছেন গ্রামীণ কমিউনিকেশনের ডাইরেক্টর, কিয়ুশু বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. আশির আহমেদ। কিন্তু এবারই তার ব্যতিক্রম হয়েছে।

এবার তার ব্যস্ততা এতই বেশি ছিল যে, প্রবাসীদের জন্য একেবারেই সময় বের করা সম্ভব হয়নি। ড. ইউনূসের জাপান সফরের খবর মিডিয়ায় অবগত হয়ে অনেকেই এই প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন, তাদের গর্ব প্রিয় স্যারকে একটু কাছে পাওয়ার জন্য।
যথারীতি এবারও তার সফরকালে জাপানের বৃহত্তম সম্প্রচার সংস্থা এনএইচকে প্রফেসর ইউনুসের একটি সাক্ষাৎকার ধারণ করে। যেখানে, তার জীবন ও কর্ম বিশদভাবে তুলে ধরা হয়। সাক্ষাৎকারটি এনএইচকে’র সন্ধ্যাকালীন সংবাদে প্রচারিত হয়। প্রভাবশালী দৈনিক আসাহী ও জাপান টাইমসসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকায় তার সফরের সংবাদ প্রচারিত হয়।

সূত্র : ইউনূস সেন্টার মিডিয়া উইং, ড. আশির আহমেদ এবং সরজমিন উপস্থিত থেকে
ৎধযসধহসড়হর@মসধরষ.পড়সকন। শিক্ষার্থীরা যতটা না থাকেন তার চেয়েও বেশি আগ্রহী থাকেন শিক্ষকরা।

আর সেই জন্যই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলি ড. ইউনূসের একটি লেকচারের ব্যবস্থা করার জন্য দীর্ঘদিন পূর্ব থেকেই আবেদন জানিয়ে রাখেন। নোবেল লরিয়েট প্রফেসর ইউনূস-এর একটি লেকচার তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সম্মানেরও। তাই, এই সুযোগটি কেউ হাতছাড়া করতে চান না।

ড. ইউনূস একমাত্র বাংলাদেশি যিনি একজন বেসরকারি লোক হয়েও জাপানের বিমানবন্দরে নামার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার শুরু হয় এবং বিমানবন্দর ত্যাগ করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশ সরকারও সচরাচর যা পায় না।

প্রিন্ট মিডিয়া এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে তিনি স্থান পান। জাপানের প্রথমসারির পত্রিকাগুলি গুরুত্ব সহকারে স্থান দিয়ে থাকে। জাপান জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা (এনএইচকে) নোবেল লরিয়েট প্রফেসর ইউনূসের সাক্ষাৎকার ধারণ করে সম্প্রচার করে থাকে। যেখানে তার ব্যক্তি জীবন ও কর্ম বিশদভাবে তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বেলায়ও এমনটি দেখা যায় না।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এমন কি জাপান সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে ড. ইউনূস বছরে একাধিকবার জাপান সফর করে থাকেন। গতবছরও তিনি টোকিও গভর্নর ইয়ুরিকো কোইকের আমন্ত্রণে জাপান সফর করেছিলেন আসন্ন ২০২০ সালে অনুষ্ঠিতব্য টোকিও অলিম্পিক প্যারা অলিম্পিক আসরের পরামর্শদানের জন্য।

২০১৮’র মার্চের শেষ সপ্তাহে তিনি জাপান সফর করেন। তবে এবারের সফরটা একটু ভিন্ন আঙ্গিকের ছিল। এবারের সফর ছিল তার রচিত গ্রন্থ ‘অ ডড়ৎষফ ড়ভ ঞযৎবব তবৎড়ং’ বইটির জাপানিজ সংস্কর উদ্বোধন করার জন্য জাপান সফর। ২৪ মার্চ তিনি জাপান পৌঁছেন।

তার সফরের প্রথম দিনে তিনি বিজুকু’র ১৩তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে অ ডড়ৎষফ ড়ভ ঞযৎবব তবৎড়ং-এর প্রকাশনা উৎসব উদযাপনের জন্য কিয়োতো আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্য সরাসরি শোনার জন্য এবং নিজেদের কাজের মধ্য দিয়ে সমাজকে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ কিয়োতো আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জড়ো হয়েছিলেন জাপানের ১,১০০ প্রশিক্ষণার্থী মেকাপ শিল্পী ও তাদের প্রশিক্ষকগণ। সম্মেলনের আয়োজকদের পক্ষে প্রশিক্ষন স্কুল ‘বিজুকু’র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট মি. উচিদা সূত্রে জানা যায়, নিজেদের সৌন্দর্য নিয়ে অনেক জাপানিজ নারীই হীনম্মন্যতায় ভোগেন তার এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৭ হাজারের ও বেশি নারীকে প্রশিক্ষিত করার জন্য প্রফেসর ইউনুস স্কুলটির প্রেসিডেন্ট মি. উচিদাকে অভিনন্দন জানান। তিনি জাপানের বাইরেও তাদের এই সেবা সম্প্রসারিত করতে তাদের উৎসাহিত করেন।

তিনি বলেন, যে সকল দেশে মানসম্মত বিউটি পার্লারের চাহিদা প্রতিদিন বাড়ছে বাংলাদেশ তাদেরই একটি। বাংলাদেশে নবীন উদ্যোক্তা কর্মসূচির মাধ্যমে অনেক সামাজিক ব্যবসা গড়ে তোলা হয়েছে যেখানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মহিলারা গ্রামাঞ্চলে বিউটি পার্লার পরিচালনা করছেন।
একইদিন প্রফেসর ইউনূস মেয়র মি.দাইসাকু কাদোকাওয়ার সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হন। কিয়োতো নগরীর শীর্ষ কর্মকর্তারা এই সভায় উপস্থিত ছিলেন। মেয়র মিডিয়ার উপস্থিতিতে প্রফেসর ইউনূসকে কিয়োতো নগরীতে স্বাগত জানিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক সম্মাননাপত্র পাঠ করেন, যেখানে তিনি প্রফেসর ইউনুসের কর্ম ও উদ্ভাবন উদাহরন থেকে তার নগরীর শিক্ষা গ্রহণ করার আগ্রহ ব্যক্ত করেন।
স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিগণের অংশগ্রহণে এক ব্যবসায়িক বৈঠকে কিয়োতো নগরীকে কীভাবে সামাজিক ব্যবসা নগরীতে পরিণত করা যায় তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।
প্রফেসর ইউনূস ঐ দিনই তার আদর্শে সামাজিক ব্যবসার সঙ্গে ইতোমধ্যে যুক্ত অথবা সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী এমন প্রধান নির্বাহীদের উদ্দেশে ‘কর্পোরেট ব্যবসা পরিকল্পনায় সামাজিক ব্যবসা কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়’ শীর্ষক একটি বিশেষ বক্তব্য রাখেন।

২৫ মার্চ প্রফেসর ইউনূস কিয়োতো নগরীর আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের আ্যনেক্স হলে ‘বৈশ্বিক ভবিষ্যৎ সামাজিক সচেতন উচ্চাশা দিয়ে কীভাবে সামাজিক সমস্যাগুলোর সমাধান করা যায়’ শীর্ষক এক বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্য শুনতে জড়ো হয়েছিল প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০০ শিক্ষার্থীসহ বিশেষভাবে আমন্ত্রিত শিকি কমিউনিটি নেটওয়ার্কের অধীনস্ত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আরো ২০ হাজার শিক্ষার্থী। এরপর তিনি ‘একবিংশ শতাব্দীতে টিকে থাকার লক্ষ্যে সামাজিক ব্যবসায়ে রূপান্তর’ শীর্ষক এক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন।

২৬ মার্চ টোকিওর শিবুয়াতে অবস্থিত ইউনাইটেড নেশন ইউনিভার্সিটিতে তার ‘অ ডড়ৎষফ ড়ভ ঞযৎবব তবৎড়ং’-এর ওপর মূল বক্তৃতা শুনতে জড়ো হয়েছিলেন ৩০০ ব্যবসায়িক নির্বাহী ও নবীন উদ্যোক্তা। প্রফেসর ইউনুস জাপান ও ভারতের বিভিন্ন বিশেষায়িত ক্ষেত্র থেকে আগত সামাজিকভাবে সচেতন তরুণ নেতাদের সঙ্গে বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থাকে একটি ‘তিন শূন্য’র পৃথিবীতে রূপান্তরের লক্ষ্যে তারা কীভাবে একযোগে কাজ করতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করেন। সেমিনারে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং মিডিয়াকর্মী উপস্থিত থেকে প্রফেসর ইউনূসের বক্তব্য শোনেন। এইদিন ‘অ ডড়ৎষফ ড়ভ ঞযৎবব তবৎড়ং’ বইটির প্রায় ৩০০ কপি বিক্রয় হয়। বইটির মূল্য নির্ধারণ করা হয় জাপানিজ ২,০০০ ইয়েন।

এছাড়াও ২৬ মার্চ সকালে ভিআইপি কনফারেন্স রুমে জাপান প্রবাসী ব্যবসায়ী এনকে ইন্টারন্যাশনালের সিইও এমডি সহিদুল ইসলাম নান্নুর সঙ্গে এক ব্যবসায়িক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষ করে উগান্ডাতে জমি ব্যবহার করে সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে উৎপন্ন পণ্য জাপানে বাজারজাত করার বিষয়ে মি. নান্নু প্রফেসর ইউনূসকে ব্রিফ করেন এবং তার পরামর্শ কামনা করেন।

উল্লেখ্য, মি. নান্নু দুই দশকেরও বেশ সময় ধরে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসা করে আসছেন। অনেক দেশেই গাড়ি ব্যবসায়ে তার শোরুম রয়েছে। এছাড়াও তিনি সেখানকার জমি লিজ নিয়ে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক এবং স্থানীয় শ্রমিকদের সমন্বয়ে কৃষি জমি ব্যবহার করে ফসল উৎপন্ন করার কাজে বহু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে আসছেন।

২৭ মার্চ নোবেল লরিয়েট প্রফেসর মুহাম্মদ টোকিওর আকাসাকায় অবস্থিত আর্ক মোরি ভবনে উরাসেনকে-এর মাস্টার চেন সুশিতসুর সঙ্গে এক বৈঠক করেন। বৈঠকটি ছিল প্রফেসর ইউনূস এবং ইউনেস্কোর শুভেচ্ছা দূত চেন সুশিতসু এর মধ্যে সাক্ষাৎকারধর্মী আলোচনা।

এদিন তিনি হিরোশিমা সফর করেন। হিরোশিমা নগরীর মেয়র এবং হিরোশিমা প্রদেশের গভর্নরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। তার নতুন গ্রন্থ ‘অ ডড়ৎষফ ড়ভ ঞযৎবব তবৎড়ং’ এর জাপানিজ অনুবাদ প্রকাশ উপলক্ষে তিনি হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান করেন। তাঁকে হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ‘ডিশটিংগুইশড প্রফেসর’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেয়া হয়। হিরোশিমা সফরকালে তিনি হিরোশিমা পীস মেমোরিয়াল পার্কে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে পারমাণবিক বোমাবর্ষণে নিহত হাজার হাজার হিরোশিমাবাসীর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। তাকে হিরোশিমা শান্তি কেন্দ্রের ‘সন্মানিত উপদেষ্টা’ হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়।

এছাড়াও প্রফেসর ইউনূস জাপানের ইয়োশিমোতো কোজি কোং লিমিটেড এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘ইউনূস ফ্যামিলি কনফারেন্স’-এ প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন, যেখানে জাপানের বিভিন্ন এলাকা থেকে সামাজিক ব্যবসা উদ্যোক্তা ও সামাজিক ব্যবসায়ে উৎসাহী ব্যক্তিরা যোগ দেন। সম্মেলনে তিনি নতুন জাপানি সামাজিক ব্যবসা জয়েন্ট ভেঞ্চার ‘ইউনূস ইয়োশিমোতো সোশ্যাল অ্যাকশন’ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। ইয়োশিমোতো কোজিও কোং লিমিটেড ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত। জাপানের অন্যতম এন্টারটেইনমেন্ট কনগ্লোমারেট। নতুন এই সামাজিক ব্যবসাটি জাপানে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা যেমন, একাকীত্ব, বিষণœতা ও বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন অসুখ নিরাময়ে কাজ করবে।

যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন, ড. ইউনূস যখনই জাপান এসেছেন, তখনই কিছুটা হলেও বাংলাদেশিদের (প্রবাসী) জন্য সময় দিয়েছেন। শ্রদ্ধাভাজন আপনজনকে কাছে পেয়ে, তার সান্নিধ্য প্রবাসীদের আবেগে আপ্লুত করেছে।

আর প্রতিবারই এই সুযোগটি তৈরি করে দিয়েছেন গ্রামীণ কমিউনিকেশনের ডাইরেক্টর, কিয়ুশু বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. আশির আহমেদ। কিন্তু এবারই তার ব্যতিক্রম হয়েছে।

এবার তার ব্যস্ততা এতই বেশি ছিল যে, প্রবাসীদের জন্য একেবারেই সময় বের করা সম্ভব হয়নি। ড. ইউনূসের জাপান সফরের খবর মিডিয়ায় অবগত হয়ে অনেকেই এই প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন, তাদের গর্ব প্রিয় স্যারকে একটু কাছে পাওয়ার জন্য।

যথারীতি এবারও তার সফরকালে জাপানের বৃহত্তম সম্প্রচার সংস্থা এনএইচকে প্রফেসর ইউনুসের একটি সাক্ষাৎকার ধারণ করে। যেখানে, তার জীবন ও কর্ম বিশদভাবে তুলে ধরা হয়। সাক্ষাৎকারটি এনএইচকে’র সন্ধ্যাকালীন সংবাদে প্রচারিত হয়। প্রভাবশালী দৈনিক আসাহী ও জাপান টাইমসসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকায় তার সফরের সংবাদ প্রচারিত হয়।

সূত্র : ইউনূস সেন্টার মিডিয়া উইং, ড. আশির আহমেদ এবং সরজমিন উপস্থিত থেকে
rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s