ঢাকা-না’গঞ্জ মুন্সীগঞ্জের ইয়াবা চক্রে পুলিশ

পুলিশ কর্মকর্তার চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি
রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের ইয়াবা ব্যবসার একটি বড় চক্রের সঙ্গে পুলিশের শীর্ষ থেকে নিম্মস্তরের সদস্যদের সম্পৃক্ততার খোঁজ মিলেছে। অপরাধীদের ধরতে নয়, বরং এসব পুলিশ সদস্য ‘ভয়েস ট্র্যাক’-এর মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করছেন নিজেদের ইয়াবা ব্যবসার স্বার্থে। নারায়ণগঞ্জে অর্ধলাখ পিস ইয়াবা ও কয়েক লাখ টাকাসহ গ্রেফতার হওয়া

এক পুলিশ কর্মকর্তার দেয়া জবানবন্দিতে বেরিয়ে এসেছে নানা চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। আদালতে দেয়া ওই পুলিশ কর্মকর্তার জবানবন্দিতে জানা গেছে, প্রায় ১ লাখ পিস ইয়াবা ও ইয়াবা কেনার কয়েক লাখ টাকাসহ গ্রেফতারকৃত ২ আসামির একজনকে নারায়ণগঞ্জ সদর থানার ওসি কামরুল ইসলামের নির্দেশে মুন্সীগঞ্জের একজন পুলিশ কর্মকর্তার হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল এবং অপর একজন আসামিকে পুলিশ সদস্যরাই ঢাকা পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৮ মার্চ রাতে বন্দরের আমিন আবাসিক এলাকায় নিজের ভাড়া বাসা থেকে ৪৯ হাজার পিস ইয়াবা এবং ইয়াবা বিক্রির ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৫০০ টাকাসহ গ্রেফতার হন নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার এএসআই আলম সরোয়ার্দী রুবেল।

মামলাটি প্রথমে নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করে ও পরবর্তীতে এর তদন্তভার পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) ন্যস্ত করা হয়। জানা গেছে, সিআইডি মামলাটি তদন্তকালে গ্রেফতারকৃত পুলিশের এএসআই সরোয়ার্দী রুবেল গত ২৭ এপ্রিল সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

ওই জবানবন্দি অনুযায়ী, বুধবার রাতে সিআইডি গ্রেফতার করে রাজবাড়ী হাইওয়ে পুলিশের উপপরিদর্শক বিল্লাল হোসেন ও নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানাধীন মদনগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির কনস্টেবল আসাদকে।

ইতিমধ্যে কনস্টেবল আসাদও আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে ইয়াবা ব্যবসার বিশাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।

আদালতে দেয়া এএসআই সরোয়ার্দী রুবেলের ৯ পাতার জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, রুবেল ২০১৫ সালে মুন্সীগঞ্জ জেলায়, ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানায় এবং ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় যোগ দেন। মুন্সীগঞ্জে কর্মরত থাকা অবস্থায় রুবেলের সঙ্গে সখ্য হয় এসআই বিল্লাল, মাদক ব্যবসায়ী ও পুলিশের সোর্স আরিফ (বন্দুকযুদ্ধে নিহত) এবং আরিফের স্ত্রী মাদক সম্রাজ্ঞী সাবিনা আক্তার রুনুর সঙ্গে।

গত ৭ মার্চ এএসআই হাসান নামের একজন পুলিশ কর্মকর্তা এএসআই রুবেলকে ফোনে জানান, আরিফের স্ত্রী রুনু ও একজন মহিলা ইয়াবার বড় চালান নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বন্দরের মদনপুর বাসস্ট্যান্ডের দিকে আসছে।

বিষয়টি তখন এএসআই রুবেল সদর থানার ওসি কামরুল ইসলামকে জানালে ওসি কামরুল তাকে বন্দরের মদনপুরে যেতে বলেন। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে এএসআই রুবেল, পুলিশের সোর্স রিয়েল ও বন্দর থানার কনস্টেবল আসাদ মদনপুর পৌঁছলে এএসআই হাসান তাদের জানায়, সে রুনু কাঁচপুর ব্রিজে আছে এবং সে মাদক ব্যবসায়ীদের ভয়েজ ট্র্যাক করে তাদের কথাবার্তা শুনেছে।

বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে মাদক ব্যবসায়ী রুনু তার সঙ্গের মহিলাসহ একটি বাজারের ব্যাগ নিয়ে মদনপুর অবস্থান নেয়। তখন ২ জন তাদের সামনে এলে এএসআই রুবেল, সোর্স রিয়েল তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা করলে ওই মহিলা ও একজন লোক পালিয়ে যায়।

গ্রেফতারকৃতদের সিএনজিতে উঠিয়ে রওনা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মুন্সীগঞ্জ ডিবির এসআই মোর্শেদ রুবেলের মোবাইলে ফোন দেন। ফোনটি রিসিভ না করলে এসআই মোর্শেদ ওই মাদক সম্রাজ্ঞী রুনুর মোবাইলে ফোন দিয়ে রুবেলের সঙ্গে কথা বলে তাদের থামতে বলেন।

বিষয়টি তখন নারায়ণগঞ্জ সদর থানার ওসি কামরুল ইসলামকে জানালে তিনি রুবেলকে নিরাপদ স্থানে অবস্থান নিতে বলেন। এরপর মুন্সীগঞ্জ ডিবির কর্মকর্তা এসআই মোর্শেদের কাছে ওই ২ আসামিকে তুলে দেয়া হয়।

মোর্শেদ মাদক ব্যবসায়ী রুনুকে নিয়ে চলে যায় এবং অপর একজনকে সোর্স রিয়েল ও পুলিশ কনস্টেবল আসাদ ঢাকাগামী বন্ধন বাসে উঠিয়ে দেয়।

পুরো বিষয়টি এএসআই রুবেল সদর ওসি কামরুল ইসলামকে জানান এবং তার নির্দেশেই সব কাজ করেন।

এরপর জব্দকৃত ইয়াবা থেকে ৫ হাজার পিস ইয়াবা নিয়ে এসে ওসি কামরুলের সঙ্গে দেখা করেন এবং ওসির নির্দেশে জনি নামের একজনকে গ্রেফতার করেন। ওই রাতেই নারায়ণগঞ্জ ডিবি তার বাসায় হানা দিয়ে তাকে গ্রেফতার করে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র আরও জানিয়েছে, টেকনাফের ইয়াবা ব্যবসায়ী শফি ইসলাম ওরফে শফিকের সঙ্গে এএসআই বিল্লালের যোগাযোগ রয়েছে। তারা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ৮-১০ জনের মাধ্যমে নিয়মিত ইয়াবার ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন। এই গ্রুপের প্রধানের নাম জনৈক ইলিয়াছ।

যুগান্তর

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.