দক্ষিণবঙ্গের যাত্রীদের জিম্মি করে শিমুলিয়াঘাটের অধিপতি আশরাফ!

আশরাফ হোসেন খান, তিনি একজন চেয়ারম্যান ও জাতীয় পার্টি থেকে বর্তমানে আওয়ামী লীগের নেতা। তার দূর্দন্ত প্রতাপে দক্ষিণবঙ্গের হাজারও যাত্রী জিম্মি। তার এই আধিপত্যের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছেন ব্রেকিং২৪.নিউজের মুন্সীগঞ্জ সংবাদদাতা।

মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মেদেনীমন্ডল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং একই ইউনিয়নের এই চেয়ারম্যান দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার মুন্সীগঞ্জ প্রান্তের শিমুলিয়া স্পিডবোট ঘাটের অধিপতি। সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব না দিয়ে আশরাফ খান শুধু শিশুলিয়া স্পিডবোট ঘাটের নিয়ন্ত্রণ করেই কয়েক কোটি টাকার মালিক।

ঈদ আসলেই যাত্রীদের জিম্মি করে নেন অতিরিক্ত ভাড়া। রাতের বেলায় স্পিডবোট চালানোর সরকারি বিধি-নিষেধ থাকলেও তা মানছে না তিনি। শুধু মাত্র স্পিডবোট ঘাটের নিয়ন্ত্রণ করেই আজ কোটিপতি বনে গেছেন তিনি। তার আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে উঠার নেপথ্যে ওই স্পিডবোট ঘাট। সেখান থেকেই তার কোটিপতি বনে যাওয়ার উৎস।

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৮ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত বিনাটেন্ডারে খেয়েছেন শিমুলিয়া স্পিডবোট ঘাট। অভিযোগ উঠেছে, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে তিনি বিনাটেন্ডারের ঘাট থেকেই গত কয়েক বছরের হাতিয়েছেন অন্তত ৭০-৮০ কোটি টাকা।

শুধু মাত্র ঘাটই নয়, পুরো লৌহজং উপজেলার সাধারণ মানুষের কাছে মূর্তিমান আতঙ্কের নাম আশরাফ হোসেন খান। শূন্য থেকে কোটিপতি আশরাফের উত্থানে আজ সবাই অবাক। তবে তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস নেই শিমুলিয়াসহ পুরনো মাওয়াঘাট এলাকার কারোই। এখানে চলছে তারই শাসন। মূলত: পুরনো মাওয়াঘাট ও বর্তমান শিমুলিয়া ঘাটের অঘোষিত রাজা হচ্ছেন এই আশরাফ খান।

স্থানীয়রা ব্রেকিং২৪.নিউজকে জানিয়েছেন, ২০০৮ সাল থেকে টেন্ডার ছাড়াই মাওয়া ঘাট ও বর্তমান শিমুলিয়া স্পিড বোট ঘাটের ইজারা আদায় করে আসছিলেন ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামীলীগ নেতা আশরাফ খান। নৌ-পরিবহন মন্ত্রীর টোল বিহীন স্পিড বোট ঘাটের এক ঘোষণাকে কাজে লাগিয়ে বিনা টেন্ডারে যাত্রীদের কাছ থেকে বছরের পর বছর ইজারা আদায় করে আসছিলেন তিনি।

এদিকে, চলতি বছর মাত্র ৭০ লাখ টাকায় শিমুলিয়া স্পিডবোট ঘাটের ইজারা নিতে আশরাফ খান দ্বারস্ত হন আদালতের। নিন্ম আদালত তাকে ৭০ লাখ টাকায় স্পিডবোট ঘাট পরিচালনার দায়িত্বও দিয়ে দেয়।

পরবর্তীতে সরকারের পক্ষে অ্যাটর্নী জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম হাইকোর্টে মামলা করলে আদালত তা বাতিল করে দেয়।

অন্যদিকে, বিআইডব্লিউটিএ শিমুলিয়া স্পিডবোট ঘাটের টেন্ডার আহবান করে সম্প্রতি। এতে গত ১০ ই জুন টেন্ডারের দরপত্র খোলা হয়। এতে ২৬ জন ইজারা পেতে দরপত্র ক্রয় করেন। এরমধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ৮ কোটি টাকার উপরে দরপত্র দাখিল করে শিমুলিয়া স্পিডবোট ঘাটের ইজারা পায় এই আশরাফ খান। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলাম মর্তুজা দরপত্র দাখিল করে ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকায়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে বছরের পর বছর বিনা টেন্ডারে স্পিডবোট ঘাট খেয়ে আসছিলেন আশরাফ। আবার মাত্র ৭০ লাখ টাকার বেশি ইজারা নিলে লোকসান দিতে হয়-এমন নানা অজুহাত দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে নামে মাত্র দামে স্পিডবোট ঘাটের ইজারা নিতে চেয়েছিলেন তিনি। অথচ গত ১০ ই জুন ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ ট্যাক্সসহ টেন্ডারের মাধ্যমে সেই আশরাফ খান প্রায় ৮ কোটি টাকার বেশি টাকায় দরপত্র দাখিল

করেন। প্রায় ৮ কোটি টাকার দরপত্র দাখিল করেই ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের উপর অতিরিক্ত ভাড়া ও ইজারার খড়গ নেমে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে- নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ও ও বিআইডব্লিউটিএ’র কতিপয় লোকদের ম্যানেজ করে শিমুলিয়া স্পিডবোট ঘাটের নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন আশরাফ হোসেন খান। কেবল স্পিডবোট ঘাটই নয়, পুরনো মাওয়া ঘাট ও বর্তমান শিমুলিয়া ঘাটের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে। আর পুরনো মাওয়া ঘাট ও বর্তমান শিমুলিয়া ঘাট থেকে অগাধ টাকা কামিয়ে চলেছেন তিনি। তার এই অবৈধ অর্থের জৌলুসে শিমুলিয়া ঘাট ছাপিয়ে মেদেনীমন্ডল ইউনিয়ন জুড়ে যত অপরাধ কর্মকান্ড হয়ে আসছে।

শিমুলিয়া ও পুরনো মাওয়া ঘাট নিয়ন্ত্রণ করতে তিনি গড়ে তুলেছেন ক্যাডার বাহিনী। আর এই বাহিনীর সদস্যদের হাতে রয়েছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। শিমুলিয়া ও মাওয়া ঘাট এবং মেদেনীমন্ডল ইউনিয়ন জুড়ে মাদক বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসারেও রয়েছে তার হাত। এক কথায় মাওয়া ও শিমুলিয়া ঘাটের গডফাদার হচ্ছেন আশরাফ খান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৮ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরেই আলাদিনের চেরাগ হাতে পান আশরাফ। ঘাট দিয়ে পারাপার হওয়া মানুষের আনন্দ যাত্রা সুখকর না হলেও ফুলে ফেঁপে উঠছে আশরাফ হোসেন খানের অর্থ সম্পদ।

এক সময় জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও হর্তাকর্তা বনে যান তিনি আওয়ামী লীগের। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তার। সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন মেদিনীমন্ডল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও। দায়িত্ব পান স্থানীয় মেদিনীমন্ডল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের।

আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর কাউকেই তোয়াক্কা করেন না আশরাফ খান। শিমুলিয়া স্পিডবোট ঘাটের ইজারার পাশাপাশি তার সিন্ডিকেটের লোকজনের মাধ্যমেই পরিচালনা করেন লঞ্চঘাটের সব কার্যক্রমও। একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হলেও তারা চলাফেরা আর বেশভূষা হার মানাবে অনেক মন্ত্রী ও এমপিদেরও। মোটর সাইকেল বহর সব সময় থাকে তার পেছনে। নিজে চলেন দামি গাড়িতে।

কয়েক বছর ধরে শিমুলিয়া ঘাটে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম চলছে। স্পিডবোট ঘাটের পাশাপাশি পুরো ঘাটেই চলে তার ত্রাসের রাজত্ব। এক সময় চুরি করা তার গলিয়ে ব্যবসা করতেন। বিভিন্ন জনের জমি দখল, ঘাটে দালালিসহ নানা কাজে যুক্ত ছিলেন। আটক হন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও।

তবে সময়ের পালাবদলে শিমুলিয়ার স্পিডবোটের ঘাটটি তিনি তার পারিবারিক সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছেন। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে রাতের বেলায়ও এ বোট চালানো হয়। ফলে মাঝে মধ্যেই ঘটে দুর্ঘটনা। মাঝে মধ্যেই স্পিডবোট উল্টে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি স্পিডবোট চালকরা এক নারী যাত্রীকে রাতে চরে নিয়ে ধর্ষণ করে। ওই মামলার আসামিরাও এখন অনেকে প্রকাশ্যে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললে ব্রেকিং২৪.নিউজকে তারা জানান, স্পিডবোটের চালকরা আশরাফ চেয়ারম্যানের কথার বাইরে কোনো কাজ করেন না। ধর্ষণে অভিযুক্তরা অনেকেই আশরাফ চেয়ারম্যানের খুব কাছের লোক। শিমুলিয়া ঘাটে ২৩০টি এবং কাঁঠালবাড়ি ঘাটে ২২০টিসহ শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌ পথে প্রায় ৪৫০টি স্পিডবোট (সিবোট) চলাচল করে।

শিমুলিয়াঘাটের অধিকাংশ সিবোটই আশরাফের আত্মীয় স্বজনের। এর মধ্যে স্বয়ং আশরাফেরই রয়েছে ১০-১৫ টির মতো সিবোট। জানা যায়, শিমুলিয়া ঘাটের সব অনিয়মের টাকার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পায় আশরাফ চেয়ারম্যান। এ ছাড়া ঘাটের বিভিন্ন দোকান, বাস কাউন্টারসহ নানা মাধ্যম থেকে আয় করেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। মেদিনীমন্ডলের যশলদিয়ায় এক সময় টিনের বাড়ি থাকলেও এখন গড়ে উঠেছে আলিশান ভবন। নিজ গ্রামে যেমন বিপুল পরিমাণ জমি কিনেছেন, তেমনই বাড়ি নির্মাণ করেছেন ঢাকার মিরপুরেও। আশরাফ খান কিভাবে শূণ্য থেকে সম্পদ ও কোটি কোটি টাকার মালিক হলেন-এই বিষয়ে দুদকের তদন্ত হওয়া দরকার বলে সচেতনরা মনে করছেন।

নিয়ম অনুযায়ী স্পিডবোটের ভাড়ার তালিকা টানিয়ে দেওয়ার বিধান রয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে স্পিডবোটের পারাপারের নিয়ম নেই। অথচ প্রতিনিয়ত রাতে স্পিডবোট চলাচল করতে দেখা যায়। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যেই যাত্রীদের ডেকে তোলা হয় পারাপারের জন্য।

আবার স্পিডবোটের ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ইচ্ছে মাফিক। যাত্রীর পরিমাণ বেশি হলে ১৮০ থেকে ২২০ টাকাও ভাড়া আদায় করছে। ঈদকে সামনে রেখে ভাড়ায় এই নৈরাজ্য বেড়ে গেছে। অথচ বিআইডব্লিউটিএ’র নির্ধারিত ভাড়া ১৩০ টাকা।

এ ব্যাপারে শিমুলিয়া স্পিডবোট ঘাটের ইজারাদার ও আওয়ামী লীগ নেতা আশরাফ খান জানান, আগামী নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে নমিনেশন প্রাপ্তি নিয়ে অ্যাটর্নী জেনারেল মাহবুবে আলম ও বর্তমান সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলির মধ্যে লড়াই চলছে।

আর অ্যাটর্নী জেনারেল হাইকোর্টে মামলা করলে আদালত তা বাতিল করে দেয়। গ্রুপিংয়ের কারণে এবং অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এই ঘাট নেয়া হয়েছে। কয়েকদিন আগে আইনশৃঙ্খলার মিটিংয়ে সিবোটে যাত্রী প্রতি ১৮০ টাকা করে নেয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন। সিবোটে অতিরিক্ত কোন যাত্রী নেয়া হয় না। আর নির্ধারিত যাত্রীর বেশি যাত্রী উঠালে সিবোট সচল থাকে না। তিনি সরকার নির্ধারণ করে দেয়া ১৩০টাকা ভাড়া নেয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ঈদ ও বিশেষ দিন ছাড়া অধিকাংশ সময় সিবোটগুলো যাত্রী শূণ্যতায় ঘাটে বসে থাকে। লোকসানের কথা চিন্তা করে ঈদে যাত্রী বেশি হওয়ায় এবার স্থানীয় প্রশাসন ১৮০ টাকা করে যাত্রী প্রতি ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মাঝে মধ্যে কোন কোন যাত্রী ভাংতি টাকা না থাকায় ২০০ টাকা দিয়ে চলে যায়। কিন্তু প্রশাসনের নির্ধারিত টাকার চেয়ে বেশি ভাড়া নেয়া হয় না।

তিনি বলেন, বিআইডব্লিউটিএ ও ঘাট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টদের টাকা দিয়েই তিনি ঘাট পরিচালনা করছেন। এতে তার তেমন কিছুই থাকছে না। তিনি আরও জানান, তার কোন বাহিনী নেই এবং মাদকের সঙ্গেও তিনি যুক্ত নন।

ব্রেকিং নিউজ

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.