দলপ্রেম, দেশপ্রেম-এর বীজটা জাপানি শিশুদের মনে বাল্যবেলাতেই রোপণ করা হয়

রাহমান মনি:
নিজ থেকে দল বড়
দল থেকে দেশ,
কেবলি তা মুখের কথা
মুখেই বলে শেষ।

উপরের পঙক্তিগুলো বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য হলেও জাপানের জন্য যে নয়, তার প্রমাণ জাপান আসার পরপরই বুঝতে পেরেছি। বিশেষ করে নিজ সন্তানরা যখন প্রাক-বিদ্যালয়ে (ডে-কেয়ার নামের কিন্ডারগার্টেন) যাওয়া শুরু করে।
তাই বলতে হয়-
মুখের কথা কাজে নয়,
এমন নেতা কোথায় হয়?
চলে এসো পাবে বেশ,
সব সম্ভবের বাংলাদেশ।।

জাপানে শিশুদের দলকে ভালোবাসা, দেশকে ভালোবাসা ওই প্রাক-বিদ্যালয় থেকেই শিক্ষা দেয়া সূচনা করা হয়। আর পরিপূর্ণ রূপ দিতে শুরু করে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে।

জাপানে শিশুদের কাছে প্রাথমিক বিদ্যালয় মানে খেলাধুলা করে আনন্দে হৈ-হুল্লোড় মধ্য দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা। আর জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থাটা-ই শিশুবান্ধব।
বাংলাদেশের মতো জাপানেও বিদ্যালয়গুলোতে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। তবে, বাংলাদেশে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বলা হলেও জাপানের বেলায় তা সমীচীন হবে কি না সে ব্যাপারে আমি যথেষ্ট সন্দিহান। বরং ক্রীড়া উৎসব বলাটা শ্রেয়।

এই উৎসবটা সাধারণত মে কিংবা জুন মাসে অথবা অক্টোবর কিংবা নভেম্বর মাসে হয়ে থাকে।

জাপানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা রীতিমতো একটি উৎসব। এই উৎসব কেবল বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের জন্য-ই নয়। এই উৎসব শিক্ষার্থী, অভিভাবক, আত্মীয়স্বজন, পড়শী সকলের জন্য। পুরো এলাকা-ই উৎসবমুখর হয়ে উঠে দিনটিতে।

নির্দিষ্ট দিনটিকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের একদিকে যেমন কসরত চালিয়ে যেতে হতে, তেমনি যোগাযোগ চালিয়ে যেতে হয় দাদা, দাদি, নানা, নানিসহ নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে। খেলার দিনটিতে উৎসাহ দেওয়ার নামে তার আনন্দে শরিক হওয়ার জন্য। পরিচিতজনদেরও জানান দেওয়া হয়।

আর, জাপানে প্রাথমিক বিদ্যালয় তো বটেই, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে বার্ষিক ক্রীড়া উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এরফলে অভিভাবকসহ অন্য সকলের অংশগ্রহণ সুযোগ থাকে। তার পরিবর্তে সাপ্তাহিক দিনগুলোতে একদিন ছুটি রাখা হয়।

নির্দিষ্ট দিনটিকে ঘিরে একমাস পূর্ব থেকে সব শিক্ষার্থীকে দু’টি ভাগে ভাগ করে (জুনিয়র হাইস্কুল বা সিনিয়র হাই স্কুলগুলোতে অবশ্য শিক্ষার্থীদের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে তিন বা চারটি ভাগও হয়ে থাকে) চর্চা শুরু করা হয়। এই ভাগ করার সময় উভয় দলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার দিকে নজর দেয়া হয় এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। এমন কি শারীরিক ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষার্থীরও প্রতিটি বিষয়ে অংশগ্রহণ নিশ্চিত থাকে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দল দু’টি সাধারণত লাল দল এবং সাদা দল নামে অভিহিত করা হয়। আর এর পেছনের অন্তর্নিহিত কারণ হচ্ছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষারত প্রতিটি শিক্ষার্থীর মাথায় একটি টুপি থাকে যার একপিঠ সাদা এবং অন্যপিঠ লাল থাকে। টুপিটির উভয় পিঠ-ই ব্যবহার যোগ্য। আবার জাপানের জাতীয় পতাকার রঙ ও লাল-সাদা’র সংমিশ্রণে। যাকে জাপানে, উদীয়মান সূর্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য একটি চেয়ার এবং একটি ডেস্ক থাকে। মুন্সীগঞ্জ-এর কে, কে, স্কুল-এ পড়াকালীন আমাদেরও একটি চেয়ার এবং একটি করে ডেস্ক বরাদ্দ ছিল।

প্রতিটি শিক্ষার্থী খেলাধুলার দিন সকালে নিজ দায়িত্বে তার চেয়ারটি খেলার মাঠে নির্দিষ্ট স্থানে নেয়া-আনার কাজটি করে থাকে।

খেলা শুরুর প্রাক্কালে দুই দলে ভাগ হওয়া সকলে নিজ নিজ দলের সমর্থনে সকলকে অনুপ্রাণিত করার জন্য গঠনমূলক বিভিন্ন সেøাগান যেমন, সাদা দল হিসেবে, শান্তির প্রতীক-সাদা, জাপানের পতাকার বেশিটা জুড়েই-সাদা, এবার জিতবে কে-সাদা, আবার লাল দল হিসেবে, উদীয়মান সূর্য-লাল, জাপানের পতাকার মধ্যভাগেই-লাল, এবার জিতবে কে-লাল, এই জাতীয় সেøাগান দিয়ে নিজ নিজ দলের সদস্যদের মনোবল চাঙ্গা করে থাকে। আবার একদল অপরদলকে একই পন্থায় অনুপ্রাণিত করে থাকে।

ক্রীড়া দিবসটি কেবল ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বিভিন্ন শরীরচর্চা ও প্রদর্শন করতে হয়। তা, প্রতিটি শিক্ষার্থী যেমন করে থাকে, তেমনি শিক্ষকদেরও তা করতে হয়।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা জাপানে ছয় বছরের জন্য। ক্রীড়া দিবসে ১ম ও ২য় একসঙ্গে, ৩য় ও ৪র্থ একসঙ্গে এবং ৫ম ও ৬ষ্ঠ বর্ষের শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে অংশ নিতে হয় সব প্রতিযোগিতায়। প্রতিটি ভাগে ৪ চারজন করে প্রতিযোগী অংশ নিয়ে থাকে। তার দধ্যে ২ জন লাল দলের এবং ২ জন সাদা দলের। ১ম-৪, ২য়-৩, ৩য়-২ এবং ৪র্থ-১ নাম্বার হিসেবে সবাইকে নাম্বার দিয়ে মোট পয়েন্ট গণনা করা হয়। প্রতিটি প্রতিযোগিতা শেষে নাম্বার ঝুলিয়ে দেয়া।

তবে, শরীরচর্চা প্রদর্শন-এ কোনো নাম্বার দেয়া হয় না। শরীরচর্চার মাধ্যমে জাপানের ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়। সমবেত শরীরচর্চার মধ্য দিয়ে দিবসটি যেমন শুরু করা হয়, তেমনি শেষটাতেও সমবেত শরীরচর্চা পর্ব রাখা হয়। মাঝখানে কেবল শ্রেণি অনুযায়ী শরীরচর্চা প্রদর্শন পর্ব রাখা হয়।

সব শেষে সার্বিক ফলাফল প্রকাশের আগে সারিবদ্ধভাবে সকল শিক্ষার্থী ফলাফল বোর্ডের দিকে মুখ করানো হয়। কি যে এক টেনশন কাজ করে শিক্ষার্থীদের না দেখলে ভাষায় বুঝানো সম্ভব না। টেনশন কাজ করে অভিভাবক এবং আগত সকলের মধ্যেই। সবাই তখন সৃষ্টিকর্তার নাম জপতে থাকে।

ফলাফল ঘোষণার পর বিজয়ীদের মধ্যে যেমন আনন্দের বন্যা বয়ে যায়, তেমনি বিজিতদের মন খারাপের সীমা পরিসীমা থাকে না। অনেকেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।
ফলাফল ঘোষণার পর প্রধান শিক্ষক বিজয়ী এবং বিজিত উভয় দলের প্রধানদের হাতে চ্যাম্পিয়ন এবং রানারআপ ট্রপি তুলে দেন। যা বিদ্যালয়েই রক্ষিত থাকে। তবে বিজয়ী এবং বিজিতদের মধ্যে কোনো ধরনের বিভাজন তৈরি হয় না। সবাই একসঙ্গে নিজ নিজ আসন বহন করে যার যার শ্রেণি কক্ষে চলে যায়।

ব্যক্তিগতভাবে কাউকে কোনো পুরস্কার দেয়ার রেওয়াজ এখানে নেই। এতে করে একদিকে বিদ্যালয়ের যেমন অর্থ খরচ কমানো সম্ভব হয়, তেমনি শিক্ষার্থীদের মাঝেও ব্যক্তিগত লাভবান প্রবণতার সৃষ্টি না হয়ে দলীয় প্রীতি বা সমষ্টিগত ভাবে দলের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। অন্যকে ল্যাং মেরে কিংবা অসাধু উপায় খোঁজার প্রবণতা থাকে না শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

পুরো প্রক্রিয়াটাই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় শ্রেণি শিক্ষকের সার্বিক তত্ত্বাবধানে। কাজগুলো বাস্তবায়ন করে শিক্ষার্থীরা। নেতৃত্ব তৈরিও হয় এখান থেকেই।
দলপ্রেম থেকেই দেশপ্রেম তৈরি হয়। দেশপ্রেম এর বীজটা সেখান থেকেই রোপণ করা হয়ে থাকে।.

সাপ্তাহিক

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.