বর্ষার স্নানে স্নিগ্ধ প্রকৃতি

কাঠফাটা গ্রীষ্মের পর বর্ষা সবার কাছেই সমাদরের। এখন সেই বর্ষা কৈশোরে পড়েছে। আষাঢ়ের ১৮ দিন পেরিয়ে গেছে। এই সময়টা প্রকৃতি যেন সারাবেলা জীবনানন্দের পঙ্‌ক্তি মেনে এগোয়, ‘কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়’। সকাল কিংবা ক্লান্ত দুপুর, বিকেল কিংবা সন্ধ্যাবেলা। প্রহরে প্রহরে পাল্টে যায় দৃশ্য।

শহর কিংবা গ্রামে, বনজঙ্গল বা নদীর পাড় বর্ষার চোখজুড়ানো রূপ মুগ্ধ করে। ভালো লাগে বর্ষার সদ্য স্নাত স্নিগ্ধ প্রকৃতি। ভালো লাগে আকাশ, অবারিত মাঠ, টলমলে জলের পুকুর, ভেজা সবুজ পাতা, ঘাস।

বর্ষায় রূপসী পদ্মা। ভাগ্যকূল, মুন্সিগঞ্জ। ছবি: মাসুম আলী

গ্রামে গেলে এখন সোঁদা গন্ধ আমেজ মিলবে, মিলবে বৃষ্টি ধারাপাত। বৃষ্টিধোয়া প্রকৃতির রূপে বিমোহিত হয় মানবসন্তানেরা। এই সময় প্রকৃতিকে বেশি ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। মনের গতিপ্রকৃতিও কেমন কাব্যময় হয়ে ওঠে। একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেলে, ভূমি ভিজে উঠলে, মাটির সোঁদা গন্ধে আমরাও কেমন ভিজে উঠি। এই সময়টায় গ্রামের পথ ধরে হাঁটতে থাকলে যত দূর চোখ যায়, নিবিড় সহজ সবুজ দেখা যায়।

বর্ষণ শেষে শান্ত পুকুর। শ্রীনগর, মুন্সিগঞ্জ। ছবি: মাসুম আলী

এখন শহর থেকে গ্রামে কেউ কাউকে ফোন করলে প্রথমেই জানতে চান, তোমার ওখানে বৃষ্টি কেমন হচ্ছে। বৃষ্টি যে হচ্ছে সেখানেও, সেটা শুনেও মন ভালো হয় কারও কারও। ভিজতে ইচ্ছে করে। ইট-পাথরের নগরী ছাড়তে ইচ্ছে করে।

কাদা-মাঠে ফুটবল। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু ইনস্টিটিউশন ও কলেজের মাঠ। শ্রীনগর, মুন্সিগঞ্জ। ছবি: মাসুম আলী

বর্ষায় প্রকৃতিকে বেশ কাছ থেকে নাগাল পেতে কার না ইচ্ছে করে। দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার ছুটি নেই। সাপ্তাহিক ছুটিতেই বেরিয়ে পড়তে পারেন বর্ষার এই রূপ দেখতে। শহর থেকে একটু দূরে। যদি ঢাকায় থাকেন, তাহলে যেতে পারেন পদ্মার পাড়ে। মাওয়া, শ্রীনগর, মুন্সিগঞ্জ কিংবা উত্তরে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়ায়। যেতে পারেন মেঘনা, গোমতী, ইছামতী কিংবা ধলেশ্বরীর পাড়ে। সাভার ও ধামরাই উপজেলার মাঝামাঝি দিয়ে বয়ে যাওয়া বংশী নদীর কাছে। ইচ্ছা থাকলে যাওয়ার অনেক জায়গা আছে।

শুকনো বিল ভরেছে জলে। এ বিল পার হতে এখন বাহন নৌকা। ছবি: মাসুম আলী

এই যেমন আমরা সেদিন গিয়েছিলাম পদ্মার পাড়ে; বিক্রমপুরে শ্রীনগরের বেজগাঁও, রাঢ়িখাল এবং ভাগ্যকুল ইউনিয়নের বালাশুর গ্রামে। কী সুন্দর! ঘুরে মনে হয়েছে, এই গ্রামগুলো পুকুর আর গাছের গ্রাম। চারদিকে শুধু গাছ আর পুকুর। গ্রামের যে প্রান্তেই যাওয়া হোক না কেন, টলমল জলের পুকুর পড়বেই। ঘন সবুজ কচুরিপানা দেখা মিলেছে। বেশির ভাগ পুকুর ঘাটবাঁধানো। পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর সবুজ পাতার ফাঁক গলে টলমল পুকুরে জল যেন আকাশ দেখে হাসছে আর বলছে, আসো, স্নান করো। এ বর্ষার প্রথমভাগেই এ জলাশয়গুলো যেন ভরা যৌবন পেয়েছে। রাঢ়িখালের উত্তরে মিলল বিশাল আড়িয়ল বিলের সৌন্দর্য। ছোট্ট ছোট্ট নৌকা এদিক-ওদিক।

নীল আকাশের নিচে পাখিদের ওড়াউড়ি। ছবি: মাসুম আলী

ভাগ্যকুলের পাশেই পদ্মা নদী। বৃষ্টির পর আকাশ পরিষ্কার হয়ে মিতালি করে পদ্মার সঙ্গে। মাঝনদী থেকে মাছ ধরে ফিরছে জেলে, ওপারের কোনো গ্রামের হাঁট থেকে গরু-ছাগল কিনে বড় নৌকায় করে ফিরে এসেছে ব্যাপারীরা। সব দৃশ্য আলাদা করে ভালো লাগায়। চোখ জুড়ায়। মন ভরে যায়। প্রাণভরে নিশ্বাস নেওয়া যায়। কী শান্তি!

আসলে, এখন বাংলাদেশের যেকোনো গ্রামে গেলে প্রকৃতির নেশায় জড়িয়ে যেতে পারেন আপনিও। একেক দিকে একেক রূপ। যেন একেকজন দক্ষ শিল্পী অ্যাক্রিলিক কিংবা জলরঙে এঁকেছেন নিজের সেরা ল্যান্ডস্কেপটি! কোনো ছবিতে বৃষ্টির ছিটেফোঁটা জল আছে অথবা অথই বর্ষা।

মাথার ওপরে যে আকাশ দেখি, যে মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকি, আর চারদিক—সবখানে মাটির সোঁদা গন্ধ সুষমা। দেখতে দেখতে মনে পড়ে কত সব পুরোনো গান। বর্ষার গানগুলো মনে গুনগুন করতে থাকে। আসলেই, টাপুরটুপুর বর্ষার দিনে বর্ষার গান শোনার একটা অন্য রকম মোহমায়া আছে। বর্ষার সঙ্গে বাঙালির অন্যতম যোগসূত্র রবীন্দ্রনাথ। ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবস’ পার হয়ে গেছে তবে মাস ফুরোয়নি। এখনো কারও ‘পুরাতন হৃদয়’ ‘পুলকে দুলিয়া’ আবার বেজে উঠছে বৃষ্টির মধুরতায়। ক্ষণ গুনছে সেই মুহূর্তের যখন ‘শ্রাবণের আমন্ত্রণে দুয়ার’ কাঁপবে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই বেদনামাখা গানটা ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে’ গানটা শুনলে বিরহী হৃদয় আনচান করবেই। হারানো দিনের অনেক বাংলা গানে বর্ষার ছোঁয়া পাওয়া যায়। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে হৈমন্তী শুক্লার গাওয়া ভারী মিষ্টি গানটা ‘ওগো বৃষ্টি আমার চোখের পাতা ছুঁয়ো না,’ হেমন্তর ‘এই মেঘলা দিনে একলা,’ সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘এল যে বরষা মনে তাই,’। একালের নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে মনে পড়ল,’ সুবীর নন্দীর ‘আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি’, সেলিম চৌধুরীর ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুরটুপুর’, জলের গানের ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুরটুপুর নদে এলো বান’—বর্ষায় এসব গানও

বুক চিতিয়ে আছে সবুজ গাছগুলো। ছবি: মাসুম আলী

আচ্ছা, বৃষ্টিমুখরিত ছুটির দিনে বাসা থেকে বের হতে দিল না। কী আর করা। সুযোগ থাকলে খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজায় মেতে উঠতে কি আর নিষেধ আছে? কিংবা সন্ধ্যায় চানাচুর-মুড়ি আর আদা-চা সহযোগে আড্ডায় মেতে উঠলে মন্দ কী?

মাসুম আলী
প্রথম আলো

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.