পদ্মা সেতুতে পানির নিচে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ দেশের প্রথম

পদ্মা সেতুর মতো বিশাল স্থাপনার নির্মাণ কাজ প্রভাব ফেলে জীবন ও প্রাকৃতিক পরিবেশে, যারমধ্যে অন্যতম শব্দ দূষণ। সেতু নির্মাণে ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রাংশ ও পাইলিংয়ের ফলে সৃষ্ট কম্পন বয়ে আনতে পারে বিপদ। এসব বিষয় মাথায় রেখে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে বাংলাদেশে এবারই প্রথম পানির নিচে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

মাছের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত এ নদীটি। তাছাড়া পদ্মা নদীর ইলিশের খ্যাতি দেশব্যাপী। তাই নির্মাণ এলাকায় মাত্রাতিরিক্ত উচ্চ শব্দ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে সেতুর পবিবেশ রক্ষা বিভাগ। আর ইলিশ মৌসুমকে সামনে রেখে নেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।

পদ্মা সেতু প্রকল্পে কর্মরত পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আশরাফুল আলম বাংলানিউজকে বলেন, পিলারে কংক্রিটিং, ঝালাই, পাইল ড্রাইভিংসহ প্রত্যেকটি ধাপেই অতিরিক্ত শব্দ সৃষ্টি হয়। পাইল ড্রাইভের সময় নদীর নিচে অতিরিক্ত মাত্রায় শব্দ হয়। তবে পাইলিং কাজে সেতুতে যেসব হ্যামার ব্যবহৃত হচ্ছে, এসব খুবই আধুনিক। যদি হ্যামার থেকে বেশি শব্দ সৃষ্টি হয় সেক্ষেত্রে কভার ড্রামের ভেতর হ্যামারিং করা হয়। তাছাড়া অতিরিক্ত শব্দযুক্ত এলাকায় যারা কাজ করেন তাদের জন্য এয়ার প্লাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক। ভারী মেশিনারি থেকে অতিরিক্ত শব্দ নির্গমন রোধে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পাইল ড্রাইভের কাজ যখন শুরু হয় তখন পানির নিচে ‘স্পেকট্রা ডিএকিউ ২০০’ নামের ডিভাইসটি শব্দ পরিমাপ করে। এরসঙ্গে একটি লম্বা তারের মাথায় হাইড্রোফোন যুক্ত করে দেওয়া হয়। হাইড্রোফোন ল্যাপটপে সিগন্যাল পাঠায় এবং তা অ্যানালাইসিস করে।

‘প্রতিটি পাইল ড্রাইভের জন্য আলাদা আলাদা ডাটা নেওয়া হয়। আবাসিক এলাকায় অতিরিক্ত শব্দ হয় এমন কাজ গুলো রাতে না করার সাজেশন দেওয়া হয়। যেসব কাজে পানির নিচে কম্পনে জলজ প্রাণীদের ক্ষতি হয় সেগুলো হয়না। প্রকল্প এলাকার বিভিন্ন মসজিদ-মন্দিরের আশেপাশে যাতে অতিরিক্ত শব্দ না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখা হয়। এছাড়া ইলিশ মৌসুমে নদীর ভেতর মাত্রাতিরিক্ত শব্দ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পদ্মা ব্রিজের জন্য পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (ইআইএ) রিপোর্টে এই গাইড লাইন উল্লেখ করা আছে’।

জানা যায়, প্রতিদিন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তত্ত্বাবধান করা হয়। প্রকল্পের সাইটগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়। সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বিভিন্ন পরামর্শমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়। এছাড়া পরিবেশ সচেতনতামূলক বিভিন্ন ট্রেনিং দেওয়া হয়। সাপ্তাহিক ও মাসিক পর্যবেক্ষণে পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্যের ওপর হুমকিজনক রিপোর্ট আসেনি এখনও পর্যন্ত।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, পদ্মা বাংলাদেশের মাছের বড় উৎস। ইলিশ আমাদের বড় সম্পদ। এ পথে বঙ্গোপসাগরে যাতায়াত এদের। সেতু নির্মাণের সময় ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার, হ্যামারিংয়ের শব্দ এবং কম্পনের কারণে মাছ যাতে এ এলাকা ছেড়ে না চলে যায় এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ঠিকাদারকে শর্ত দেওয়া হয়েছে। তিন মাস ইলিশ চলাচলের পথে কোনো কাজ করা যাবে না। বর্ষাপরবর্তী অক্টোবরের দিকে নদীতে কম্পন সৃষ্টি পাইলিং বন্ধ রাখতে হবে, যাতে মাছেরা নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়তে পারে।

সাজ্জাদ হোসেন
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.