ইলিশ প্রজনন সময়ে বন্ধ থাকবে পাইলিং

কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু: সর্ববৃহৎ প্রকল্প পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে ভারী যন্ত্রাংশ ব্যবহারে জীবনযাপন ও প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকায় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দেশে এই প্রথম এ ব্যবস্থা নেওয়া হলো। এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে সেতুর পরিবেশ রক্ষা বিভাগ। এ ছাড়া ইলিশ প্রজনন সময়ে পাইলিং বন্ধ থাকবে। যাতে ডিম ছাড়তে মাছ বাধা না পায়।

প্রকল্পের পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আশরাফুল আলম জানিয়েছেন, খুঁটির ঢালাই, পাইলিংয়ে ব্যবহার হচ্ছে একাধিক শক্তিশালী হামার। এতে সৃষ্ট বিকট শব্দ নদীর উভয়পাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া নির্মাণ কাজের প্রতিটি ধাপেই ব্যবহার হচ্ছে ভারী যন্ত্রাংশ। বিশেষ করে পাইলিংয়ের সময় নদীর নিচে অতিরিক্ত মাত্রায় শব্দ হয়। পাইলিং করার সময় শব্দ নিয়ন্ত্রণে কভার ড্রামের ভেতর হ্যামারিং করা হলেও পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না।

তিনি আরও বলেন, পাশাপাশি শব্দযুক্ত এলাকায় যেসব প্রকৌশলী ও শ্রমিক কাজ করছেন, তাদের এয়ার প্লাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক এবং ভারী মেশিনারি থেকে অতিরিক্ত শব্দ নির্গমনরোধে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তার পরও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ব্যবহারে অতিরিক্ত শব্দে প্রকল্প এলাকার আশপাশে বসবাসরত মানুষের জীবনযাপন ও প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়। তাই অতিরিক্ত উচ্চ শব্দ নিয়ন্ত্রণে সেতুর পরিবেশ রক্ষা বিভাগের উদ্যোগে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্মাণ প্রকল্প এলাকায় এবং পানির নিচে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাংলাদেশে এই প্রথম বলেও জানান তিনি।

প্রকল্পের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, প্রকল্প এলাকায় পাইলিংয়ের কাজ শুরুর পর পানির নিচে ‘স্পেকট্রা ডিএকিউ ২০০’ নামের একটি ডিভাইস দিয়ে শব্দ পরিমাপ করা হয়। এর সঙ্গে লম্বা একটি তারে মাথায় হাইড্রোফোন যুক্ত করে দেওয়া হয়। হাইড্রোফোনটি ল্যাপটপে সিগন্যাল পাঠায় এবং তা শব্দ বিশ্নেষণ করে। প্রতিটি পাইলিংয়ের জন্য পৃথক ডাটা সংগ্রহ করা হয়। এভাবে শব্দ নিয়ন্ত্রণের কাজ করা হয়।

সেতুর পরিবেশ রক্ষা বিভাগের সূত্রটি আরও জানায়, প্রকল্প এলাকায় মসজিদ, বাসস্থানসহ আশপাশে অতিরিক্ত শব্দ না হওয়ার বিষয়টি দেখভাল করছে পরিবেশ রক্ষা বিভাগ। অতিরিক্ত শব্দ হয়, এমন কাজ রাতে আবাসিক এলাকায় না করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সংশ্নিষ্টদের মতে, পানির নিচে কম্পন তৈরি হওয়ার মতো কাজে জলজ প্রাণীর ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা থাকে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, পদ্মা সেতুর পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ প্রতিবেদনে উল্লিখিত গাইড লাইন অনুযায়ী প্রতিদিন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তত্ত্বাবধান করা হচ্ছে। অন্যদিকে, সংশ্নিষ্ট প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের নিয়ে বিভিন্ন পরামর্শমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং পরিবেশ সচেতনতামূলক বিভিন্ন ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। সাপ্তাহিক ও মাসিক পর্যবেক্ষণে এখনও পর্যন্ত পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর হুমকিজনক কোনো চিত্র পাওয়া যায়নি।

দায়িত্বশীল এক নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর বরাত দিয়ে জানান, পদ্মা নদী বাংলাদেশের মাছের বড় একটি উৎস এবং ইলিশ দেশের একটি বড় সম্পদ। তাই সেতু নির্মাণের সময় ভারী যন্ত্রাংশ ব্যবহার, হামারিংয়ের শব্দ এবং কম্পনের কারণে মাছের বিচরণ যাতে বন্ধ না হয়, সেই বিবেচনায় ঠিকাদারকে শর্ত দেওয়া হয়েছে। সেই শর্তের আলোকেই বর্ষা-পরবর্তী অক্টোবরের দিকে পাইলিং কাজ বন্ধ রাখতে হবে। যাতে মাছগুলো নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়তে পারে। তিন মাস ইলিশ চলাচলের পথে কোনো কাজ করা যাবে না বলেও শর্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

সমকাল

One thought on “ইলিশ প্রজনন সময়ে বন্ধ থাকবে পাইলিং

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.