জাপানে তান্ত্রিকগুরু আসাহারা শোকো এবং ছয় শিষ্যের মৃত্যুদ- কার্যকর

রাহমান মনি: প্রায় দুই যুগ পর অবশেষে জাপানে সারিন গ্যাস হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত মূল হোতা চিযুও মাতসুমোতো (যিনি আসাহারা শোকো নামে আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে সমধিক পরিচিত) এবং তার ছয় শিষ্যের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে।

১৯৯৫ সালের ২০ মার্চ টোকিওর রেলস্টেশনের আন্ডারগ্রাউন্ডে এক ভয়াবহ রাসায়নিক হামলার জন্য তাদের এই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- দেয়া হয়। ‘দ্যা সারিন অ্যাটাক’ খ্যাত ওই ভয়াবহতম হামলায় ১৩ জন মারা যান এবং ছয় শতাধিকেরও বেশি আহত হন। এছাড়া ১৯৯৪ সালে উত্তর জাপানের একটি শহরে হামলার ঘটনায় ৮ জন মারা যান ও ৬০০ জন আহত হন। সে হামলারও মূল পরিকল্পনাকারী ছিল শোকো আসাহারা।

তারই পরিপ্রেক্ষিতে ৬ জুলাই ২০১৮ শুক্রবার প্রত্যুষে প্রথমে শোকো আসাহারা (৬৩) এবং খানিকটা পরে তার ৬ অনুসারীদের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। এই ৬ জন শিষ্য হচ্ছেন নিইমি তোমোমিতসুঅ (৫৪), ইনোউএ ইয়শিহিরো (৪৮), তোমোমাসা নাকাগাওয়া (৫৫), কিয়োহিদে হায়াকাওয়া (৬৮), মাসামি সুচিয়া (৫৩) এবং সেইইচি এনদো (৫৮)।

অউম শিনরিকিও বা সর্বোচ্চ সত্য ধর্মে বিশ্বাসী তান্ত্রিকগোষ্ঠীর নেতা শোকো আসাহারা (৬৩) সহ ৭ জন বন্দীর মৃত্যুদ- শুক্রবার গোপনে কার্যকর করেছে বলে জাপান পুলিশ ও মিডিয়া সূত্রে জানা যায়। পরে জাপানের মুখ্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব ইয়োশিহিদে সুগা আসাহারার মৃত্যুদ- কার্যকরের খবর নিশ্চিত করেছেন। পরে দেশটির বিচার মন্ত্রণালয় একই দিনে আরও ৬ বন্দীর মৃত্যুদ- কার্যকরের তথ্য নিশ্চিত করে। এছাড়া ওই গোষ্ঠীর আরও ৬ সদস্যের মৃত্যুদ- কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছে বলে বিচার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানানো হয়। সংঘটিত অপরাধের অভিযোগে ১৩ জনকে মৃত্যুদ- দিয়েছিল টোকিও ডিসট্রিক্ট কোর্ট। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এ রায় দেয়া হয়।
১৯৯৫ সালের মে মাসে শোকো আসাহারা আটক হন। এছাড়াও একই অভিযোগে বিভিন্ন সময় আরও ১৭ জনকে আটক করে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো অভিযোগ গঠন করা হয় তাদের উপস্থিতিতে।

আসাহারা ছিলেন এক চোখ কানা। পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে প্রতিবন্ধী এবং মানসিক রোগী হিসেবে আখ্যায়িত করে ক্ষমা করার আবেদন করা হয়। কিন্তু পরিবারের দাবি অনুযায়ী কোনো কিছুরই সত্যতা মিলেনি।

টোকিও ডিসট্রিক্ট কোর্ট ২০০৪ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে শোকো আসাহারাসহ ১৩ জনকে মৃত্যুদ-ে দ-িত করেন। দ-প্রাপ্তরা উচ্চ আদালতে আপিল করলে ২০০৬ সালের মার্চ মাসে ইনোউএ ইয়োশিহিরোর পুনর্বিচারের আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট শুনানি করে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ডিসট্রিক্ট কোর্টের রায় বহাল রাখে। এরপর বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদ- বহাল রেখে চূড়ান্ত রায় দেন।

তাদের বিরুদ্ধে আনা ১৩টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলে এছর জানুয়ারি মাসে ১৩ জনের মৃত্যুদ- বহাল রেখে রায় কার্যকরে বিচারমন্ত্রীর অনুমতি স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হয়।

বিচারমন্ত্রী ইয়োকো কামিকাওয়া শোকো আসাহারা এবং অপর ছয় অনুসারীর মৃত্যু পরোয়ানায় স্বাক্ষর করলে ৬ জুলাই ২০১৮ সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রেখে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। প্রত্যুষে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হলেও শুক্রবার সন্ধ্যার পর সর্বোচ্চ গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বজায় রেখে লাশ বাহির এবং হস্তান্তর করা হয়। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সাংবাদিকদের পর্যন্ত জানতে বা বুঝতে দেয়া হয়নি।

রায় কার্যকর করার কয়েক ঘণ্টা পর বিচারমন্ত্রী ইয়োকো কামিকাওয়া সংবাদ সম্মেলনে জানান, বেশ সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করার পর আদেশটিতে তিনি স্বাক্ষর দিয়েছেন। কারণ, মৃত্যুদ- এমনি একটি শাস্তি, যা একটি জীবনের অবসান ঘটে এবং পুনর্বিবেচনার কোনো সুযোগ থাকে না।

তিনি আরও বলেন, মৃত্যুদ- কার্যকরের আগে সব বন্দীই নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের শেষ সুযোগ পেয়েছে। বন্দীদের চূড়ান্ত আপিল নিষ্পত্তি হয় জানুয়ারি মাসে। এরপরই আসামিদের মৃত্যুদ- কার্যকর হলো।

মৃত্যুদ- কার্যকরের খবরে স্বস্তি প্রকাশ করেছে হামলায় নিহত ও আহত জাপানিদের স্বজনেরা। তবে, বড্ড সময় ক্ষেপণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ভিকটিম এবং স্বজনদের অনেকেই পরপারে চলে গেছেন। মৃত্যুদ- কার্যকরের খবরটা নিজ কানে না শুনে যাওয়ার জন্য তাদের আক্ষেপ থেকে গেছে। তারপরও ভালো যে তাদের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে।

রায় কার্যকরে জাপানি সমাজে স্বস্তি নেমে এসেছে। জাপানি সমাজ মনে করে সঠিক কাজটিই করা হয়েছে। মৃত্যুদ-ই তাদের একমাত্র শাস্তি হওয়া উচিত। তবে, আরও আগেই এদের ফাঁসিতে ঝুলানো উচিত ছিল। হাই সিকিউরিটি এবং আয়েশী জীবনের পেছনে সরকার তথা জনগণের অনেক অর্থ অপচয় করা হয়ে গেছে।

উল্লেখ্য, অউম শিনরি কিওউ মানে ‘সর্বোচ্চ সত্য’ ধর্মে বিশ্বাসী বা অনুসারী। ১৯৮০ সালে হিন্দু ও বুদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসীদের একটি আধ্যাত্মিক দলের হাতে এই গোষ্ঠী যাত্রা শুরু করে। শোকো আসাহারা গোষ্ঠীটির প্রতিষ্ঠাতা। তাকে চিজুও মাতসুমোতো নামেও ডাকা হয়। ১৯৮৯ সালে সরকারিভাবে তাদের ‘ধর্মীয়’ গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় জাপান। সে সঙ্গে বিশ্বব্যাপী এই গোষ্ঠীর অনুসারীও বাড়তে থাকে। একসময় জাপানে ১০ হাজার মানুষ এই ধর্মের মতাদর্শী ছিল। রাশিয়াতে ছিল কমপক্ষে ৩০ হাজার অনুসারী।

১৯৯৫ সালের হামলার পর তারা গোপন কার্যক্রমে চলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ায় এই মতাদর্শীরা নিষিদ্ধ।

আসাহারার মতাদর্শ তিনটি ধর্মের সমন্বয়ে তৈরি। বৌদ্ধ ধর্ম, হিন্দু ধর্মের নানা হিতোােদশ ও খ্রিষ্ট ধর্মের ভবিষ্যৎ বাণীর মিশেলে তিনি তাদের মতবাদ তৈরি করেছিলেন। হিন্দু ধর্মের শিব ছিল তার আদর্শ এবং তিনি নিজেকে শিব মনে করতেন। এই মতাদর্শের অনুগামীর সংখ্যা ১০ হাজার যার মধ্যে জাপানি ছাড়াও রুশরা ছিল। অউম মতাদর্শীরা প্রথম গ্যাস ছোড়ে ১৯৯৪ সালে- জাপানের কেন্দ্রস্থলে। কিন্তু তখন তাদের টার্গেট ছিলেন তিন বিচারক। কিন্তু বিচারকরা বেঁচে গেলেও মারা যায় ৮ জন। বিচারকরা টার্গেট হওয়ার কারণ ছিল তারা আলোচ্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের চাহিদামতো আইন প্রণয়নে রাজি ছিলেন না।

সূত্র : জাপান পুলিশ
মিডিয়া এবং সংবাদ সম্মেলন

সাপ্তাহিক

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.