বিলের শাপলায় অভাব মোচন

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান ও শ্রীনগর উপজেলার খালবিলগুলোয় এখন শুধু শাপলা আর শাপলা। দেখলেই দু’চোখ জুড়িয়ে যায়। এই জাতীয় ফুল শুধু চোখ জুড়াচ্ছে না, মেটাচ্ছে পেটের ক্ষুধা, দূর করছে অভাবও। প্রতিদিন শাপলা সংগ্রহ ও বিক্রি করে ভালো টাকা আয় করছেন দুই উপজেলার শতাধিক বেকার কৃষক, জেলে ও তাদের পরিবারের সদস্যরা।

জাতীয় ফুল শাপলা। এটি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি তরকারি হিসেবে খেতেও বেশ সুস্বাদু। শাপলা কেউ খান শখ করে, আবার কেউ খান অভাবে পড়ে। অভাবগ্রস্ত বা নিতান্ত গরিব লোকজন বর্ষা মৌসুমে খালবিল থেকে শাপলা তুলে তা দিয়ে ভাজি বা ভর্তা তৈরি করে আহার করে থাকেন। আর শহরের লোকজন শখের বশে এ মৌসুমে শাপলা তরকারি বা ভাজি খেয়ে থাকেন।

শাপলা সংগ্রহকারী একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শাপলা নানান কাজে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে তরকারি হিসেবে এটি বেশ জনপ্রিয়। আর এ শাপলা সংগ্রহ বা বিক্রির জন্য কোনো পুঁজিরও প্রয়োজন হয় না। আষাঢ় থেকে শুরু করে ভাদ্র মাস পর্যন্ত সিরাজদিখান ও শ্রীনগরের খালবিল ও নিম্নাঞ্চলের জমিগুলো পানিতে ডুবে থাকে। এ সময় সেখানে প্রাকৃতিকভাবেই শাপলা ফোটে। খালবিল ছাড়াও বর্ষায় ডুবে যাওয়া ধান, পাট ও ধঞ্চে খেতে দেখা মেলে শাপলার। তাই এলাকার অনেক কৃষক বর্তমানে এ পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন।

এ পেশায় কোনো পুঁজির প্রয়োজন না হওয়ায় বিভিন্ন বয়সের লোক এ পেশায় অংশ নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এবারের বর্ষায় সিরাজদিখান উপজেলার ডুবে যাওয়া বিভিন্ন ইরি, আমন ধান ও পাটক্ষেতে ব্যাপকভাবে শাপলা জন্মেছে। এছাড়া এলাকার ইছামতি খালবিলের পানিতেও শাপলা ফুল ফুটেছে সৌন্দর্য আর নয়নাভিরাম দৃশ্য নিয়ে। শাপলা ফুল সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে শুরু করে কার্তিক মাস পর্যন্ত পাওয়া যায়।

তবে মৌসুমের শেষ, অর্থাৎ কার্তিক মাসে তেমন বেশি পাওয়া যায় না। সরেজমিন দেখা যায়, এলাকার শাপলা সংগ্রহকারীরা ভোর থেকে নৌকা নিয়ে ডুবে যাওয়া চরনিমতলা রামানন্দ এলাকার জমি ও বিলে ঘুরে ঘুরে শাপলা সংগ্রহ করেন। দুপুরের দিকে শাপলা তোলা শেষ করে তা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। শাপলা সংগ্রহকারী মো. নুরুজ্জামান জানান, এ সময়ে একেকজনে কমপক্ষে ৩০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০ মুঠা (৬০ পিস শাপলায় এক মুঠা ধরা হয়) সংগ্রহ করতে পারেন।

পাইকাররা সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে এসব শাপলা সংগ্রহ করেন। সিরাজদিখানের রসুনিয়া, ইমামগঞ্জ ও তালতলায় শাপলার পাইকারি ক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। পাইকাররা এখান থেকে শাপলা কিনে রাতে ঢাকার যাত্রাবাড়ী পাইকারি বাজারে বিক্রি করেন।

পাইকারি ব্যবসায়ী জাকির হোসেন জানান, শাপলা সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে এক মুঠা শাপলা ২০ টাকা দরে কেনেন তারা। তারপর গাড়ি ভাড়া গড়ে ১ টাকা, শ্রমিক মজুরি ১ টাকা, আড়ত খরচ ২ টাকাসহ এক মুঠা শাপলার জন্য মোট ২৭ থেকে ২৮ টাকা খরচ পড়ে। যাত্রাবাড়ী আড়তে তা বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৬০ টাকা মুঠা।

মুন্সীগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মিয়া মামুন জানান, শাপলা আসলে কোনো কৃষিপণ্যের আওতাভুক্ত নয়। এটি প্রাকৃতিকভাবে কৃষি জমি, পুকুর, খালবিল বা ডোবায় জন্মে। তাই এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কোনো পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ হয়ে ওঠে না। শাপলা তরকারি হিসেবে খুবই মজাদার একটি খাদ্য। কয়েক বছর ধরে এ ব্যবসা এলাকায় বেশ প্রসার লাভ করেছে। এ থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে এখন অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করে সংসারের অভাব মোচন করছেন।

আলোকিত বাংলাদেশ

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.