নবীন এক চারুশিল্পীর কথা

‘লঞ্চ যাচ্ছি ঢাকার সদরঘাট। সারি সারি ইটের ভাটার চিমনির ধোয়া উড়ে উড়ে যাচ্ছে, চিমনিগুলো কেমন ঠায় দাড়িয়ে। ছবির মতো সবুজ মাঠ, পানি আর ছোট ছোট গ্রাম। এই চিত্র আমার চোখে নতুন না। আগেও কয়েকবার লঞ্চে ঢাকায় গেছি, এবারে লঞ্চে উঠার কাহিনী ভিন্ন।’- বলছিলেন চিত্রশিল্পী সাগর চক্রবর্তী। যিনি শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত ২০১৮ সালের নবীন শিল্পী পুরস্কার পেয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, ‘১৯৯৮ সালের কথা, যাচ্ছি বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে ভর্তি হতে। গভীর পুলকে শেষ হলো বুড়িগঙ্গার লঞ্চ যাত্রা। তার পর সদরঘাটে নামলাম। কি এক অশরীরী টানে মনে নাচন ধরেছে, বুলবুলে ভর্তি হলাম। প্রতি বৃহস্পতিবার বিকাল ও শুক্রবার সকালে ক্লাস। বৃহস্পতিবার ঢাকায় এসে ক্লাস করে বোনের বাসায় থেকে শুক্রবার সকালের ক্লাস করে মুন্সীগঞ্জ চলে যেতাম।’

স্মৃতিচারন করেন এভাবে, ‘বুলবুল এ পড়াকালীন এ্কদিনের ঘটনা মনে পরে, আমরা বরিশালের লঞ্চে কাটপট্টি যেতাম। যে লঞ্চ সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য কাটপট্টি থামতো। এমন এক লঞ্চে আমি ঘুমিয়ে পরেছি। ঘুম ভেঙ্গে দেখি পেসেঞ্জার নামিয়ে লঞ্চ মধ্য নদীতে। ঘুম থেকে উঠে খুব তরা করে নীচে নেমে আসলাম। লঞ্চের সামনে গিয়ে বোকার মতো ফেল ফেল করে দেখছি আমার বাড়ি ছেড়ে সরে যাচ্ছি। ভয়ে কি করব না করব বুঝতে পারছি না। এখনকার আমি হলে খুব সানন্দেই চলে যেতাম বরিশালে। তখন বয়স কম, ভয়ে কাচু মাচু করছি। লঞ্চে যারা অস্থায়ী ভাবে রুটি কলা বিক্রি করেন, তারা ইতোমধ্যে তাদেও নৌকা লঞ্চ থেকে রশ্বি ছাড়িয়ে দূরত্বে চলে গেছেন। তারা সকলেই আমাকে চেনেন। তারা চেচিয়ে বলছেন পানিতে নেমে পর আমরা নৌকায় উঠিয়ে নিব। শেষে আমি বই-পত্র, ব্যগসহ ঝাপ দিলাম পানিতে।’

শিল্পের তাড়না পেয়েছেন দাদা সতীশ চক্রবতীর কাছ থেকে। দাদা ছিলেন পুরোহিত ও যাজক। শখ এবং কর্ম ছিল প্রতিমা তৈরি। মূলত দাদুর কাছেই শিল্পের হাতেখড়ি। তৃতীয় শ্রেনীতে পড়াকালীন সময়ে দাদুর সঙ্গে বসে প্রতিমার কাজে হাত মিলাতেন। দাদুর ব্যবহৃত ছাচ গুলো নিয়ে আমি খেলতাম। নাক, মুখ আর হাত পা বানানোর চেষ্টা করতাম। অনেক সময় প্রতিমা তৈরির ছাচে নাক বানাতে গিয়ে মাটি আটকে গেলে দাদুর কানমলা খেয়ে সে যাত্রায় ক্ষান্ত দিতে হতো। তবে একটু বড় হলে দাদুর কাজে বরং সহায়তাই করেছেন সাগর। প্রথম দিকে তো দাদু কান মলা দিয়ে আমাকে উঠিয়ে দিতেন। পরে অবশ্য দাদুর অনেক কাজ সাগর ছারা হতো না যেমন চক্ষুদান, শর্পের পদ্ম। শিল্পের প্রতি যে প্রেম আর সাধনা তা সাগর শিখেছে তার দাদুর কাছে। শিল্পের জাদু-মন্তরের সঙ্গে পুরোহিতের দীক্ষাটাও নিয়ে নিয়েছেন। তাই তার কাজে শিল্পের নন্দনের সঙ্গে যোগ হয় দেবি বন্ধনার দ্যুতি দুয়ে মিলে নতুন ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে।

২০১৮ সালের শিল্পকলা একাডেমি নবীন পুরস্কার প্রাপ্ত তার ছবির নাম ‘রেড সিটি’ ৩০৫*৩৬৬ ইঞ্চির বিশাল ক্যানভাসে শহুরে নির্মমতার চাপে চিড়ে চ্যাপ্টা এক রমনী অবয়ব এঁকেছেন। যে নারী পন্য, তার পন্য পসারীর প্রধাণ অনুসঙ্গ লিপস্টিক। প্রতিনিয়ত লিপস্টিক তার পরিচয় বিতরণ করে। লিপস্টিক ছারা তাকে ভাবা যায় না। পাশে বিবর্ণ শহর। রমনী মূর্তির অবশ চোখ ঠোটের রং ছাড়া সে চোখ পাথর। রমনী রঙের কাছে বিক্রি হয়ে গেছেন, বোঝাতে সারা ক্যানভাসে জুড়ে দিয়েছেন ৮০টির অধিক লিপস্টিক।

১৯৯৭ সালে যখন অষ্টম শ্রেণীতে পরেন তখন চারুশিল্পী হওয়ার প্রত্যয়ে মুন্সীগঞ্জ চিত্রাঙ্গকন বিদ্যালয় ভর্তি হন। তিন হতে চার মাসে সেখানে পাঠ নিয়েছিলেন। অল্প সময়ের জন্য হলেও সেন্টু দাসের কথা মনে পরে খুব। সেখান থেকেই বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে পড়াশুনার ইচ্ছে জাগে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু চিত্রকলা প্রদশর্নীর মধ্য দিয়ে শুরু। ছোট-বড় ২০টির মতো যৌথ প্রদর্শণীতে অংশগ্রহণ করেছেন। উলেলখ্য করার মতো প্রাপ্ত পুরস্কার, বুলবুল ললিকলা একাডেমির ১ম বর্ষ, ২য় বর্ষ, তৃতীয় বর্ষ ও চতুর্থ বর্ষে প্রতিবারের প্রদর্শণীতে প্রথম পুরস্কার ছিনিয়ে নিয়েছেন। এছারা শিল্পী রাশেদ স্মৃতি পর্ষদ আয়োজিত প্রদশর্ণীতে প্রথম, ২০১০ সালের বার্জার নবীন শিল্পী পুরস্কার। মুন্সীগঞ্জের আঞ্চলিক সংগঠন কালের ছবির একটি প্রতিযোগিতায় পুরস্কার। ২০১০ সালে নবীন চিত্র প্রদর্শণীতে সম্মানসূচক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি আর এবার চ্যাম্পিয়ন। হারাধন চক্রবর্তী আর শান্তিরানী চক্রবর্তীর জন্মজাত সাগর। তবে তার এই শিল্পী হয়ে ওঠার শক্তি টোকানি প্রসাদ পালের স্মৃতি বিজরিত বিক্রমপুরের পৌরানিক ও ঐতিহাসিক শহর রিকাবীবাজারের গোপালনগর। ব্যপক অনুসঙ্গ নিয়ে ঋদ্ধ করেছে ধলেশ্বরী। আর জীবনের পরতে পরতে কাটপট্টির সিদুর মাখা কাঠের সমারোহ। জীবনে শিল্পের ধারক হয়ে থাকতে চান। এই তার অভিব্যক্তি।

ঢাকাটাইমস
ইমরান উজ-জামান

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.