নিয়ম ভাঙিবার মাশুল আদায় করা হউক

বেইলি ব্রিজ ভাঙিয়া পড়িবার তালিকায় নূতন করিয়া যুক্ত হইল মুন্সীগঞ্জ জেলার একটি সেতু। বালিগাঁও-লৌহজং-মাওয়া-ঢাকা সড়কের লৌহজং উপজেলার দক্ষিণ হলদিয়া ছাতা মসজিদ বেইলি ব্রিজ ধসিয়া পড়িয়াছে অতিরিক্ত ভারবাহী সিমেন্টভর্তি একটি লরির কারণে। বেইলি ব্রিজের ভারবহন ক্ষমতা যে সীমিত, তাহা কাহারো অজানা থাকিবার কথা নহে। কিন্তু তাহার পরও গত বৃহস্পতিবার ভোরবেলা সবার অজ্ঞাতে একটি ১০ চাকার সিমেন্টভর্তি লরি ওই ব্রিজের উপর উঠিলে তাহা বিকট শব্দে ধসিয়া পড়ে। ইহার ফলে বন্ধ হইয়া পড়ে লৌহজং উপজেলা সদর এবং আশপাশের এলাকার সহিত ঢাকার সহজপথের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ।

বেইলি ব্রিজ ভাঙিয়া পড়ার বিষয়টি কোনো নূতন ঘটনা নহে। বেইলি ব্রিজের এই সমস্যা লইয়া আমরা গত দুই বত্সরে বেশ কিছু সম্পাদকীয় প্রকাশ করিয়াছি। বেইলি ব্রিজ হইল একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা, যাহা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে অস্থায়ীভাবে চালু হয়। আমাদের দেশে ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যার সময় বহু স্থানে ভাঙিয়া যাওয়া সেতু-কালভার্টের স্থলে বেইলি ব্রিজ স্থাপন করিয়া সাময়িক যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হইয়াছিল। পরে এই ধরনের অনেক ব্রিজ স্থাপন করা হইয়াছে। স্টিলের তৈরি এইসকল সেতু হালকা হইয়া থাকে। ভারী যানবাহন চলিবার জন্য এই ধরনের সেতু উপযুক্ত না হওয়া সত্ত্বেও প্রায়শই এইসকল সেতুর উপর দিয়া মাত্রাতিরিক্ত মালবোঝাই ট্রাক, বাস ও লরির মতো ভারী যানবাহন চলাচল করিয়া থাকে। তাহা ছাড়া, এই ধরনের ব্রিজ তিন থেকে পাঁচ বত্সর পর পর সংস্কারের কথা থাকিলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই নিয়ম মানা হয় না। আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়িয়া গিয়াছে বিধায় সড়ক-মহাসড়কে যানবাহনের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাইয়াছে। এই চাপ ও ধকল বেইলি ব্রিজের মতো অস্থায়ী ব্রিজের পক্ষে সামলানো সম্ভব নহে। এই কারণে অস্থায়ী বেইলি ব্রিজ এখন বাংলাদেশের জন্য অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রত্যাশিত। সড়ক ও জনপথ অধিদফতরসূত্রে জানা যায়, দেশের সড়ক-মহাসড়কে মোট ৮৫৬টি বেইলি ব্রিজ রহিয়াছে, যাহা সকল ধরনের ব্রিজের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ। ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি ব্রিজ সংস্কার কিংবা নূতন নির্মাণ যাহাই হউক না কেন—মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ না থাকিলে জনপ্রতিনিধিরা ইচ্ছা করিলেই সেই বরাদ্দ পাস করাইয়া আনিতে পারেন। গত বত্সর ডিসেম্বরের শেষার্ধে একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলিয়াছেন যে, দেশে আর কোনো বেইলি ব্রিজ থাকিবে না। এই সময়ে তিনি দেশে যত জায়গায় এই ধরনের ব্রিজ রহিয়াছে তাহা ভাঙিয়া কংক্রিটের ব্রিজ নির্মাণের নির্দেশ দেন। এইজন্য ১৪৭ কোটি ৮২ লক্ষ টাকার একটি প্রকল্পও অনুমোদন দেওয়া হইয়াছে।

অতএব, বেইলি ব্রিজসহ সকল অস্থায়ী ব্রিজের অবসান হওয়া জরুরি। তবে বিদ্যমান ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজগুলির নিয়মিত সংস্কার ও নজরদারির আওতায় আনাটাও গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু পাঁচ টনের বেশি ওজনের যানবাহন বেইলি ব্রিজের উপর দিয়া চলাচল নিষিদ্ধ, সেই হেতু যেই সকল ট্রাকে অতিরিক্ত মাল বোঝাইয়ের কারণে বেইলি ব্রিজ ভাঙিয়া পড়ে, ওইসকল ট্রাকচালক ও মালিকের নিকট হইতে ইহার মাশুল আদায় করা সমীচীন।

ইত্তেফাক

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.