টঙ্গিবাড়ী উপজেলা বিএনপির নতুন কমিটি : দুইগ্রুপ মুখোমুখি

মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলা বিএনপির নতুন কমিটি গঠন নিয়ে বাদপড়া একটি অংশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। অংশটির কিছু নেতাকর্মী বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। পাশাপাশি নতুন কমিটির নেতারা বলেছেন, বিগত দশ বছরেও টঙ্গিবাড়ী উপজেলা সদরে বাদপড়া অংশটি দলীয় কোন কর্মসূচি পালন করেনি। তারা আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের সহায়তায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতে এই কর্মসূচির আয়োজন করে।

বিক্ষুব্ধ অংশের বাদ পড়া এক নেতা বলেছেন, নতুন কমিটি বিলুপ্ত না করা পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

জানা গেছে, গত ১৮ জুলাই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শ নিয়ে টঙ্গিবাড়ী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও আড়িয়ল-বালিগাঁও ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আমির হোসেন দোলনকে সভাপতি এবং ধীপুর ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান ও বিটি কলেজের সাবেক এজিএস আখতার হোসেন মোল্লাকে সাধারণ সম্পাদক করে ১০১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির অনুমোদন দেন।

এই কমিটি অনুমোদন দেয়ার পর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক থেকে বাদ পড়া বর্তমান জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আলী আজগর মল্লিক রিপন ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি থেকে বাদ পড়া খান মনিরুল মনি পল্টনের নেতৃত্বে টঙ্গিবাড়ী বাজারে এই বিক্ষোভ মিছিল ও মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহার কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। তবে, দুই বছর মেয়াদী আগের কমিটির মেয়াদ গত বছরের নভেম্বর মাসে শেষ হওয়ায় গঠনতন্ত্র মতেই নতুন কমিটি হয়েছে বলে মিজানুর রহমান সিনহা সমর্থকদের দাবি।

বিরোধের নেপথ্যে মিজানুর রহমান সিনহার সমর্থকরা জানিয়েছেন, গত ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে কেন্দ্রীয় বিএনপির কোষাধ্যক্ষ ও দি একমি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান সিনহা এবং জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আলী আজগর মল্লিক রিপনের মধ্যে। মিজানুর রহমান সিহনা ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সংসদ সদস্য ছিলেন এবং ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তার হাত ধরেই রিপন মল্লিক টঙ্গিবাড়ীতে বিএনপির রাজনীতির অধিপতি হন।

রিপন মল্লিক টঙ্গিবাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। এরপর মিজানুর রহমান সিনহার হস্তক্ষেপে রিপন মল্লিক ২০০৯ সালে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। শেষে ২০১০ সালে রিপন মল্লিক টঙ্গিবাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি পদ ছেড়ে প্রবাসী খান মনিরুল মনি পল্টনকে সভাপতির পদটি দেয়া হয়। এরপর ২০১৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে রিপন মল্লিক তার নিজ ইউনিয়ন টঙ্গিবাড়ী-সোনারং এবং উপজেলা বিএনপির তখনকার সভাপতি খান মনিরুল মনি পল্টন তার নিজ ইউনিয়ন বেতকায় চেয়ারম্যান পদে ধানের শীষ প্রতীকে কোন চেয়ারম্যান প্রার্থী না দিলে মিজানুর রহমান সিনহা তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ হন। এতে টঙ্গিবাড়ী-সোনারং ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়।

অভিযোগ আছে বেতকায় ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করার পর বিএনপির খান বংশের প্রার্থী মুক্তার খানের নৌকার প্রতীকের জন্য কেউ কেউ কাজ করে। নির্বাচনে বেতকা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী বাচ্চু সিকদার জয়লাভ করেন। এরপর ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে টঙ্গিবাড়ী উপজেলা বিএনপির সম্মেলনে ওই সময়কার কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেন দোলনকে মিজানুর রহমান সিনহা সভাপতি করতে চান। কিন্তু রিপন মল্লিক তখন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক থাকায় খান মনিরুল মনি পল্টনকে পুনরায় সভাপতি বানান।

নানা কারণে মুন্সীগঞ্জ-২ সংসদীয় আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী মিজানুর রহমান সিনহা রিপন মল্লিকের উপর প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হন। এসব ঘটনায় গত বছরের (২০০১৭) এপ্রিল মাসে জেলা বিএনপির নতুন কমিটিতে আলী আজগর মল্লিক রিপনকে সরিয়ে দেন মিজানুর রহমান সিনহা। নতুন কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক করে আনেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক সাবেক ছাত্রনেতা কামরুজ্জামান রতনকে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রিপন মল্লিক জেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ আব্দুল হাইয়ের শিবিরে চলে যায় এবং প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেয়।

টঙ্গিবাড়ী উপজেলা বিএনপির নতুন কমিটির সহসভাপতি ও সোনারং-টঙ্গিবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল কাদির মল্লিক জানান, গত ইউনি নির্বাচনে দলীয় মনোয়ন ফরম মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ মুহুর্তে তার হাতে দেয়া হয়। নানা দেনদরবার ও চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পত্র দাখিল করতে পারিনি।
তিনি বলেন, মিজানুর রহমান সিনহা ও রিপন মল্লিক মিলেমিশে থাকলে কর্মীরাও স্বস্তি পায়।

টঙ্গিবাড়ী উপজেলা বিএনপির নতুন কমিটির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান আমির হোসেন দোলন বলেন, মিজানুর রহমান সিনহা ও নতুন কমিটির বিরুদ্ধে বাদপড়া গুটি কয়েকজন আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের সহায়তায় বিক্ষোভ করেছে। বিগত দশ বছরেও টঙ্গিবাড়ী উপজেলা সদরে আলী আজগর মল্লিক রিপন ও পল্টন দলীয় সরকার বিরোধী কোন কর্মসূচি পালন করেননি। আমাকে কখনও ডাকেনি। বারবার বলার পরও কোন কর্মসূচি পালন করেনি। এখন কিভাবে একই জায়গায় দলের বিরুদ্ধে কর্মসূচি পালন করে-সেটা কারও অজানা নয়।

রিপন মল্লিক ও পল্টন দুইজনই দলের মধ্যে বিতর্কিত। কমিটির মেয়াদও শেষ হয়েছে গত ৮ মাস আগেই। এখন নতুন কমিটির বিরোধীতা করার কোন প্রশ্নই আসেনা। যোগ্যদের দেখে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শে পার্টির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কমিটির অনুমোদন দিয়েছেন।

টঙ্গিবাড়ী উপজেলা বিএনপির বাদপড়া সভাপতি খান মনিরুল মনি পল্টন বলেন, মিজানুর রহমান সিনহা ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি করতে চান, আমরা সেটা করতে চাইনা বলে আমাদের অপরাধ। আমরা কারও ব্যক্তি রাজনীতি করিনা, ধানের শীষ, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের রাজনীতি করি। আখতার হোসেন মোল্লা আওয়ামী লীগের লোক, তাকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। আমির হোসেন দোলনকেও বিগত আন্দোলনে পাওয়া যায়নি। তখন তার চেয়ারম্যান পদ টিকিয়ে রাখার জন্য আন্দোলন কর্মসূচিতে আসেননি।

তিনি আরও বলেন, একটি উপজেলার প্যাডে পার্টির মহাসচিব কমিটির অনুমোদন দিতে পারেন না। কমিটি বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।

জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আলী আজগর মল্লিক তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অসত্য ও মনগড়া দাবি করে বলেন, আমাকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক থেকে বাদ দেয়ার পরও দলের স্বার্থে চুপ থেকেছি। এখন অগণতান্ত্রিকভাবে উপজেলা কমিটি গঠন করবে, চুপ থাকতে পারি না। এমন কোন ঘটনা ঘটেনি যে, কেন্দ্র থেকে কমিটি আনতে হবে। যদি কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, তাহলে আগে ইউনিয়ন ও অন্যান্য উপজেলা এবং পৌরসভার কমিটিও ভেঙ্গে দিতে হয়। একটি উপজেলা কমিটি কেনো কেন্দ্র থেকে আনতে হবে। মহাসচিবের দৃষ্টি আকর্ষন এবং কমিটি বিলুপ্ত করার দাবি নিয়ে কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সমাজকল্যাণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রতন বলেন, মিজানুর রহমান সিনহা ওই আসনের অভিভাবক। উনি কাউকে ডিস্টার্ব ফিল করলে সেখানে তার মতো করেই কমিটি হবে। মুন্সীগঞ্জ থেকে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে টেনে এনে তিনি বলেন, বিএনপিতে মুন্সীগঞ্জ থেকে বি.চৌধুরীর মতো বড় কোন নেতা হয়নি, আর হবেও না। বিএনপি থেকে ছিটকে পড়লে বি.চৌধুরীর মতো অনেকের যে করুণ পরিণতি হবে সেদিকে ফলো করার পরামর্শ দেন তিনি।

কামরুজ্জামান রতন আরও বলেন, বড় কোন সমস্যার সৃষ্টি হলে সিদ্ধান্তটা বড় জায়গা থেকেই আসে। টঙ্গিবাড়ী উপজেলা বিএনপির নতুন কমিটি গঠনতন্ত্র মতেই হয়েছে।

কেন্দ্রীয় বিএনপির কোষাধ্যক্ষ ও সাবেক সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান সিনহা বলেন, খুব শীঘ্রই সব শান্ত হয়ে যাবে। কারও পদ চলে গেলেতো রাজনীতি শেষ হয়ে যায়না। সদস্যপদতো আছে, সেটাই নিয়েতো রাজনীতি করা যায়।

তিনি আরও বলেন, আমি স্বচ্ছলোক, স্বচ্ছভাবেই রাজনীতিটা করতে চাই। তাদের কিছু কিছু কর্মকান্ড দলের বিরুদ্ধে। সক্রিয়ভাবে রাজনীতিটা করতে চাই বলে ডিস্টার্বগুলোকে বাদ দিতে হচ্ছে।

অবজারভার

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.