দাবদাহে নাকাল জনজীবন

রাহমান মনি: অনবরত দাবদাহ প্রবাহে হাঁসফাঁস অবস্থা এখন জাপানজুড়ে। দীর্ঘদিন একনাগাড়ে এমন তীব্র গরম মনে করতে পারছেন না অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিগণও। ইতোমধ্যে জাপানের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড সংগৃহীত হয় টোকিওর নিকটবর্তী সাইতামা প্রদেশের কুমাগাইয়া নামক শহরে।

এদিন দুপুর ২টা ১৬ মিনিটে ৪১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করে। এটি এযাবৎকালের ধারণকৃত সর্বোচ্চ রেকর্ড। ইতিপূর্বে যা ৪০.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল। আর এটি ছিল কোচি প্রদেশের শিমানতো নামক শহরে।

১৮ জুলাই ২০১৮ গিফু প্রদেশের তাজিমিতে ৪০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড ধারণ করা হয়। মাত্র পাঁচদিনের ব্যবধানে একই স্থানে ২৩ জুলাই ৪০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে। এছাড়া টোকিওর ওমে শহরে ৪০.৮ (এযাবৎকালের টোকিওর রেকর্ড), পার্শ্ববর্তী ইয়ামানাশি প্রদেশের কোফু শহরের তাপমাত্রা ৪০.৩ অতিক্রম করে।
প্রায় মাসখানেক ধরে চলা প্রচ- দাবদাহে এই পর্যন্ত ৮০ (২৬ জুলাই ২০১৮) জনের প্রাণহানি এবং প্রায় ২৫ হাজার লোককে হাসপাতালে নিতে হয়েছে হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার কারণে। অ্যাম্বুলেন্স কর্মীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিস্থিতি সামাল দিতে। অনেকের নির্ধারিত ছুটি বাতিল করা হয়েছে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য।
স্থানীয় ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াগুলো আবহাওয়া বিভাগের বরাত দিয়ে জনগণকে দাবদাহ থেকে সতর্ক থাকার উপদেশ দেয়া হচ্ছে থেমে থেমে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বয়স্কদের ঘরের বাইর না হওয়া, শিশুদের নিরাপদ স্থানে খেলাধুলা করা, পর্যাপ্ত পরিমাণে পানীয় পান করাসহ হিটস্ট্রোক প্রতিরোধে যথেষ্ট পরিমাণ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয় এই সব সতর্ক বার্তায়।

অতিরিক্ত দাবদাহে শুধু গত এক সপ্তাহে (১৮ জুলাই-২৪ জুলাই ২০১৮) হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে ২২,৬৪৭ জন হাসপাতালের শরণাপন্ন হয়েছেন এবং তাদের মধ্যে ৬৫ জন মারা গেছেন। যার মধ্যে শিশুও রয়েছে। বয়স্করা অবশ্য আক্রান্ত বেশি হয়েছেন।

গত সপ্তাহে টোকিওতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা না হলেও টোকিওবাসী আক্রান্ত হয়েছেন সবচেয়ে বেশি। এর সংখ্যা ছিল ১,৯৭৯ জন। সংখ্যার দিক থেকে ১,৯৫৪ জন হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসনে ছিল আইচি প্রদেশ। গত এক দশকে যা ছিল সর্বোচ্চ।

প্রচ- গরমের কারণে অনেক স্থানেই বহিরাঙ্গন আয়োজন বাতিল বা স্থগিত করতে হয়েছে। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে চলে আশা উৎসব (কিয়োতো গিয়োন উৎসব) প্রথমবারের মতো বাতিল করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। প্রচ- গরমে পুলের পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে সাঁতার শিখার ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠানে।

টোকিওর দাবদাহের এই ধারা আগামী বছরগুলোতে অব্যাহত থাকলে ২০২০ সালে অনুষ্ঠিতব্য টোকিও অলিম্পিক এবং প্যারা অলিম্পিক গেমস আয়োজনে বিভিন্ন সংশয় দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে বিদেশি গণমাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ‘দ্যা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ টোকিও অলিম্পিক এবং প্যারা অলিম্পিক গেমস এর সময় তাপপ্রবাহ ক্রীড়াবিদ এবং দর্শক উভয়েই স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগবে বলে পত্রিকাটির নিবন্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। উল্লেখ্য, আসন্ন টোকিও অলিম্পিক এবং প্যারা অলিম্পিক গেমস ৪ জুলাইয়ে শুরু হয়ে ৯ আগস্টে শেষ হবে।

এদিকে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে এলোমেলো এশিয়ার দেশ জাপান। দেশটিতে রেকর্ড বর্ষণে বন্যা ও টানা কয়েকদিনের দাবদাহে প্রাণহানি ঘটার পর এখন টাইফুন আতঙ্কে ভুগছে জাপান। সপ্তাহান্তে দেশটির মূল ভূখ-ে আঘাত হানতে যাওয়া টাইফুন ১২ (যার নাম দেয়া হয়েছে ‘জংদারি’) র প্রভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছে সাগর।

জাপান আবহাওয়া অফিস জানায়, এখন পর্যন্ত টাইফুন ১২ ক্যাটাগরি-২ টাইফুনে রূপান্তরিত হয়েছে। আঘাত হানার সময় এটি ক্যাটাগরি-৩ পর্যন্ত পরিবর্তন হতে পারে। শনিবার রাত নাগাদ টাইফুনটি জাপান উপকূল অতিক্রম করে রোববার বেলা ৩টায় টোকিও অতিক্রম করে যাবে। রেখে যাবে ধ্বংসলীলা। ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার বেগে বাতাসের সঙ্গে টানা ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা বৃষ্টিপাতের ফলে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এই মাসের গোড়ার দিকে জাপানের পশ্চিমাঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত এবং ভূমিধসে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ডুবে যাওয়ায় এসব লোকের প্রাণহানি ঘটে।

জাপান পুলিশ ও রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএইচকে সূত্রে জানা যায়, দুর্যোগে ২০০ জন নিহত এবং ২১ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে নিখোঁজদের অনেকেই স্রোতের টানে ভেসে গেছেন অথবা নির্জন স্থানে নিঃসঙ্গ জীবন কিংবা মৃত অবস্থায় কোথাও পড়ে রয়েছেন। প্রতিকূলতার জন্য যোগাযোগ বা অনুসন্ধান করা সম্ভব হচ্ছে না। গত ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে আবহাওয়া সংক্রান্ত সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল এটাই।

তারও কিছুদিন আগে জাপানের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগরী, শিল্পাঞ্চল ও বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত দেশটির পশ্চিমাঞ্চল ওসাকা তে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে।

১৮ জুন ২০১৮ সাপ্তাহিক কর্মদিবসের শুরুতে সোমবার সকাল ৮টায় আঘাত হানা এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৬.১। জাপানিজ স্কেলে যা, শিন্দো (ঝযরহফড়) ৭ ছিল।

ছবি- ইন্টারনেট
তথ্য সূত্র- জাপান আবহাওয়া বিভাগ, জাতীয় সংবাদ সংস্থা এবং মিডিয়া, সংবাদ সম্মেলন।

সাপ্তাহিক

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.