মুন্সীগঞ্জে যাত্রীছাউনিগুলো দোকানদারদের দখলে!

শেখ মোহাম্মদ রতন: মুন্সীগঞ্জে যানবাহন যাত্রীর জন্য তৈরি যাত্রীছাউনিগুলো দোকানদাররা দখল করে রেখেছেন। যাত্রীদের বসার যায়গা না থাকায় রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে সড়ক-মহাসড়কের মোড়ে দাঁড়িয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন তারা।

জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জে যানবাহনের জন্য যাত্রীদের তৈরি করা ২২টি যাত্রীছাউনির মধ্যে ৯টি ভেঙে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে ১৩টি ছাউনি আছে। যার ছয়টি দোকানদারদের দখলে চলে গেছে। দু-তিনটি কোনোমতে চলছে; বাকি ছাউনিগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বসার জায়গা না থাকায় যাত্রীরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে সড়কে বা সড়ক মোড়ে যানবাহনের জন্য দাঁড়িয়ে থাকেন। যানবাহনগুলোও দাঁড়াচ্ছে যত্রতত্র স্থানে। ফলে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে রাস্তাজুড়ে।

জেলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ২২টি যাত্রীছাউনি ছিল। এর মধ্যে বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলায় তিনটি, সিরাজদিখানে দুটি, শ্রীনগরে দুটি, লৌহজংয়ে দুটি, টঙ্গিবাড়িতে দুটি এবং গজারিয়া উপজেলায় দুটিসহ ১৩টি যাত্রীছাউনি আছে। পদ্মার ভাঙনে ২০১৪ সালে লৌহজংয়ের ছাউনিটি বিলীন ও ২০০০ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে সড়ক প্রশস্ত করার জন্য সড়ক ও জনপথ অধিদফতর আটটি যাত্রীছাউনি ভেঙে ফেলে।

টঙ্গিবাড়ির আলদি বাজার যাত্রীছাউনিতে দেখা যায়, ছাউনির ভেতরে মিতালী ইলেকট্রনিকসের সাউন্ড বক্স, টেলিভিশন, নষ্ট ইলেকট্রিক পণ্য বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। ভেতরে জীবন বিশ্বাস নামে এক নরসুন্দর সেলুন ব্যবসা করছেন। ছাউনিটির ঠিক মাঝামাঝি ছিল একটি চা দোকান। মিতালী ইলেকট্রনিকসের স্বত্বাধিকারী ইকবাল হোসেন জানান, দোকানে পণ্য রাখার জায়গা হয় না, তাই কিছু পণ্য এখানে রেখেছি।

শ্রীনগর উপজেলার কেসি ও বালাশুর যাত্রীছাউনিতে গিয়ে দেখা যায়, ভাগ্যকুল পরিবহন ও নগর পরিবহনের ঢাকাগামী দুটি বাস কাউন্টার। ভাঙা একটি বেঞ্চে দু-একজন যাত্রী কোনোরকম ভেতরে বসে আছেন। পণ্যসহ সড়কে দাঁড়িয়ে কয়েক যাত্রী অপেক্ষা করছেন। ছাউনির ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, কাউন্টার ও দোকানের পণ্য দিয়ে যাত্রীদের বসার জায়গা দখল করে রাখা হয়েছে।

বালাশুর ছাউনিতে নিলুফা বেগম নামে এক যাত্রী জানান, ছাউনির ভেতরে কোনো টয়লেট নেই। বসার জন্য বেঞ্চ নেই। ভেতরে দুটি বাস কাউন্টার। ভেতরে দাঁড়ানোরও কোনো সুযোগ নেই।

সদর উপজেলার সিপাহিপাড়ায় ছাউনির ভেতর ফুল, সেরোয়ানি, মোবাইল ফোন লোডের দোকান। যাত্রীদের বসার জন্য মাত্র দুটি ভাঙা আসন ছিল। সেগুলোও দোকানের পণ্য দিয়ে দখল করে রেখেছে।

সিপাহিপাড়ার যাত্রীছাউনি দখল করা দোকানদার নজরুল ইসলাম জানান, যাত্রীদের কোনো কষ্ট দেন না তারা। তাদের মন চাইলে এখানে বসেন। দোকানদার আল-আমিন জানান, এ দোকান জেলা পরিষদের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছেন। যাত্রীদের অসুবিধা হয়Ñএমন কাজ করেন না তিনি।

সিরাজদিখান উপজেলার যাত্রীছাউনিতে দেখা যায়, এর ভেতরে গাড়ির ভাঙা যন্ত্রপাতি, কাঠ, ময়লার স্ত‚প। ছাউনিটির বিভিন্ন স্থানের পলেস্তারা খসে পড়েছে। শৌচাগারটিও নষ্ট হয়ে আছে। এ ছাউনিটি দোকানদারের কব্জায় না থাকলেও তা যাত্রীদের অপেক্ষার জন্য সম্পূর্ণ অনুপযোগী।

লৌহজংয়ের খেতেরপাড়া ছাউনিতে দেখা যায়, ছাউনিটির ভেতরে দুটি ভ্যানগাড়ি, তেলের ড্রাম ও গাড়ির ভাঙা যন্ত্রাংশ পড়ে আছে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে যাত্রীরা ছাউনির বিপরীত পাশের

চা দোকান ও সড়কের মোড়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

মাসুদ শেখ নামে এক যাত্রী জানান, ছাউনিতে এসে কখনও বসার জায়গা পান না তারা। এসে দেখি তেলের ড্রাম। কখনও ভ্যানগাড়ি, ব্যাটারিচালিত রিকশা, গাড়ির যন্ত্রাংশ অথবা হকাররা দখল করে রেখেছে। তারা হয় রাস্তায়, নয়তো চা দোকানে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করেন।

জেলা পরিষদের এক কর্মকর্তা জানান, তারা শুনেছেন জেলার ১৩টি ছাউনি দখল করে দোকান করা হচ্ছে। তদন্ত করতে যাওয়ার খবর পেলেই দখলদাররা দোকানের পণ্য সরিয়ে রাখেন। লিজ নেওয়া দোকানদারদের সাবধান ও দখলমুক্ত করে দিতে বলা হয়েছে।

জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, যারা অবৈধভাবে যাত্রীছাউনিগুলো দখলে রেখেছেন, তাদের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি নিজেও কয়েকটি ছাউনির দুরবস্থা দেখেছেন। জেলা পরিষদের সভায় ছাউনির সব অবস্থা তুলে ধরবেন। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের মাধ্যমে দখলমুক্ত করে সব যাত্রীছাউনি মেরামতের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

শেয়ার বিজ

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.