লৌহজংয়ের মানচিত্রে পদ্মার আঘাত : ২০ পরিবার ফের আশ্রয়হীন

মো. মাসুদ খান: মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মানচিত্রে আবার আঘাত হেনেছে পদ্মা নদী। বারবার ভাঙনের ফলে নিজেদের বসতভিটা হারিয়ে যে মানুষগুলো সরকারি পাইকারা আশ্রয়ণ প্রকল্পে আশ্রয় নিয়েছিল, এবার পদ্মা সেখানে আঘাত হেনেছে। প্রকল্পের ২০টি পরিবার আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। ২৪টি পরিবারের লোকজন ভয়ে প্রায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। প্রকল্পের আটটি ব্যারাকের মধ্যে তিনটি যেকোনো সময় নদীতে চলে যেতে পারে। একটি ব্যারাকের অর্ধেক বুধবার ধসে গেছে। পাইকারা আশ্রয়ণ প্রকল্প পরিদর্শন শেষে এমনটিই জানিয়েছেন লৌহজং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিনাত ফৌজিয়া।

মঙ্গলবার গিয়ে দেখা যায়, সরকারি আশ্রয়ণ পরিবারের লোকজনের মুখে হতাশার ছাপ। সব কিছু হারিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পে আশ্রয় পেয়ে বেশ ভালোই কাটছিল তাদের সংসার। কিন্তু বর্ষার শুরু থেকেই নদীভাঙনের আশঙ্কা তাদের মাঝে ছিল। কিন্তু সে আশঙ্কাই সত্যি হলো। মঙ্গলবার ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। পদ্মা গ্রাস করেছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বড় বড় গাছ। খাবার পানির একমাত্র গভীর নলকূপটি পদ্মার মুখে। প্রকল্পের একটি ব্যারাকের অর্ধেক বুধবার পদ্মায় ধসে গেছে। আরো তিনটি যেকোনো সময় ধসে যেতে পারে। ভাঙনের কারণে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৪৪টি পরিবারের মধ্যে ২০টি তাদের ঘর, আসবাব, হাঁড়ি-পাতিল সরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু তারা কোথায় যাবে, জানে না।

১১০ বছরের বরুনি বিবি বলেন, ‘বাবা রে, অনেক কষ্টে এখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছিলাম। রাক্ষসী পদ্মা তো তাও কাইড়া নিতেছে। অহন কই যামু কইতে পারতাছি না।’ ৫৫ বছরের বাসিন্দা এনায়েত উদ্দিন বলেন, ‘মাথায় এখন অনেক চিন্তা। সরকার ঠাঁই দিয়েছিল এই আশ্রয়ণ কেন্দ্রে। কিন্তু পদ্মা আবার রাস্তায় নামিয়ে দিতাছে। সরকার কি আমাগো আবারও থাকার ব্যবস্থা করব?’

লৌহজং-তেউতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) রুহুল আমিন জানান, শুধু আশ্রয়ণ প্রকল্পই নয়, পদ্মায় ভাঙছে এ ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। পাইকারা আশ্রয়ণ প্রকল্পে আটটি ব্যারাক রয়েছে। প্রতি ব্যারাকে ১০টি করে পরিবারের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। ২২টি পরিবার তাদের ছেলে-মেয়ে নিয়ে বসবাস করছে। চারটি ব্যারাক ভেঙে পদ্মায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। এসব পরিবারকে কিভাবে আবার আশ্রয় দেওয়া যায় তা দেখে গেছেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের লোকজন।

এদিকে ভাঙন শুধু পাইকারা আশ্রয়ণ প্রকল্পেই নয়, ছড়িয়ে পড়েছে লৌহজং উপজেলার বিস্তীর্ণ পদ্মার পারজুড়ে। কোথাও দ্রুত, কোথাও ধীরে ভাঙছে। বসতবাড়ির পাশাপাশি ভাঙছে পদ্মাচরের ফসলি জমি, খড়িয়া গ্রামটি। গ্রামবাসীর অভিযোগ, তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। বছরে বর্ষায় এক-দুইবার কিছু ত্রাণ দিয়েই সব দায়িত্ব বুঝি শেষ প্রশাসন, সরকার ও সুধীসমাজের। কিন্তু তারা যেন নিজ বাড়িতে বাস করতে পারে—এইটুকু চাওয়া ভাঙনকবলিতদের।

একই গ্রামের হেনা বেগম (৬০) বলেন, ‘মাত্র আধাকিলোমিটার দূরের পদ্মা সেতুর নদীশাসনের কাজের সঙ্গে আর দুই-এক কিলোমিটার নদীশাসনের কাজ বাড়িয়ে দিলে আমাদের বাড়িঘর রক্ষা হতো। আশা করছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের ভিটেবাড়ি রক্ষায় পদ্মা সেতুর নদীশাসনের কাজ আরো বাড়িয়ে দেবেন।’

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সাজেদা সরকার জানিয়েছেন, পাইকারা আশ্রয়ণ প্রকল্পের লোকদের জন্য উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কাছে সরকারি খাস জায়গা চাওয়া হয়েছে। জায়গা পেলে তাদের জন্য নতুন আশ্রয়ণের ব্যবস্থা করা হবে।

লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ভাঙনকবলিতদের পাশের একটি বৃদ্ধাশ্রমে সরিয়ে নেওয়া হবে। তাদের গবাদি পশুও সেখানে রাখার ব্যবস্থা করা হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাদের নিরাপত্তা দিতে বলা হয়েছে।

কালের অন্ঠ

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.