সামনে জেএমবি, নেপথ্যে এবিটি

লেখক, প্রকাশক, কবি ও মুক্তমনা ব্লগার শাহজাহান বাচ্চু হত্যার তদন্তে একটি নতুন বিষয় সামনে এসেছে। এরই মধ্যে কিছু আলামত মিলেছে। যার ভিত্তিতে গোয়েন্দারা ধারণা করছেন- এ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনায় ছিল আনসার আল ইসলাম (সাবেক আনসারুল্লাহ বাংলা টিম-এবিটি)। হত্যা মিশন সম্পন্ন করতে একাধিবার ঘটনাস্থল রেকিও করেছিল ওই সংগঠনের সদস্যরা। পরে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) আবার রেকি করে। সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার পর বাচ্চু হত্যা মিশনে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল জেএমবির সদস্যরা। মূলত এবিটির জ্ঞাতসারেই হত্যা মিশন বাস্তবায়ন করে তারা। সংশ্নিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র সমকালকে এসব তথ্য জানায়। এই প্রথম দুটি বড় জঙ্গি সংগঠন একত্র হয়ে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে কোনো প্রকাশক হত্যায় সম্পৃক্ত হলো।

মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম বলেন, বাচ্চু হত্যা মিশনে সম্পৃক্ত ছিল পুরনো জেএমবির ৬ জনের একটি দল। তাদের মধ্যে চারজন মোটরসাইকেলে কিলিং মিশনে যায়। অন্য দু’জন ঘটনার দিন আশপাশ এলাকায় রেকি করছিল। এর বাইরে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি-না তা নিয়ে তদন্ত চলছে।

গত ১১ জুন সন্ধ্যায় মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানের পূর্ব কাকালদী এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন শাহজাহান বাচ্চু। পরে বেরিয়ে আসে হত্যার সঙ্গে জড়িতরা উগ্রপন্থি সংগঠনের সদস্য। ২৪ জুন গাজীপুরে অভিযান চালিয়ে আবদুর রহমান ওরফে লালু নামে এক জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে লালু জানিয়েছে, বাচ্চু হত্যাকাণ্ডে সরাসরি চারজনসহ মোট ছয়জন জড়িত ছিল। ২৮ জুন অস্ত্র উদ্ধার করে ফেরার পথে সিরাজদীখানের বালুরচরে জঙ্গিরা হামলা চালালে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ লালু নিহত হয়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের কেসি রোড এলাকায় গভীর রাতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ কাকা ওরফে শামীম এবং এখলাছ নামের দুই জঙ্গি নিহত হয়। তারা দু’জন বাচ্চু হত্যায় সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল। এ নিয়ে বাচ্চু হত্যার ঘটনায় তিন জঙ্গি নিহত হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত আরও তিনজন পলাতক।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, প্রকাশক বাচ্চু হত্যার পর প্রথমে আলামত দেখে ধারণা করা হচ্ছিল- এ ঘটনায় এবিটি একাই জড়িত। পরে তথ্য বিশ্নেষণ করে গোয়েন্দারা বলেন, জেএমবি তাকে হত্যা করেছে। এরপর বেরিয়ে আসে- পরিকল্পনা থেকে শুরু করে হত্যা মিশন সম্পন্ন করতে এবিটি ও জেএমবি দুই সংগঠনই সম্পৃক্ত। বাচ্চুকে হত্যার পরিকল্পনা করে এবিটির শীর্ষ নেতা মেজর (বরখাস্ত) জিয়া। তবে এবিটি হত্যা মিশনে সরাসরি জড়ালে ধরা পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকবে, এ বিবেচনায় তারা পুরনো জেএমবির সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের অপারেশনটি করার দায়িত্ব দেয়। এবিটি মনে করেছে, তাদের সদস্যদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বেশি। পুরনো জেএমবির সদস্যরা হত্যা মিশন সম্পন্ন করলে তাদের ধরা পড়ার ঝুঁকি কম থাকবে। যাদের কিলিং মিশনে দায়িত্ব দেওয়া হয় তারা সংগঠনের হয়ে ফান্ড সংগ্রহ করতে অনেক দিন ধরে ডাকাতি করে আসছিল। তাই তারা ‘পেশাদার ডাকাত দলের’ সদস্য হিসেবে পরিচিত। তাই শেষ পর্যন্ত বাচ্চু হত্যা মিশন সফল করতে তাদের ওপর দায়িত্ব বর্তায়।

জঙ্গিদের কর্মকাণ্ডের ওপর ১০ বছর ধরে তথ্য রাখছেন এমন একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, পুরনো জেএমবি ও এবিটির মধ্যে কোনো একটি বিশেষ ব্যাপারে আদর্শিকভাবে সমন্বয় হতে পারে না- এটা ধরে নেওয়া ভুল হবে। প্রথমত দুটি সংগঠন আল কায়দার আদর্শকে সমর্থন করে। তাই যে কোনো ব্যাপারে একত্র হয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে পুরনো জেএমবির সঙ্গে এবিটির ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জেএমবির হাতে রয়েছে বোমা তৈরির মতো অনেক কারিগর। এবিটির রয়েছে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত অনেক সদস্য। যদিও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় এবিটির শক্তি অনেক খর্ব হয়েছে। তবে তথ্য রয়েছে- নতুনভাবে সদস্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে তারা।

দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, পুরনো জেএমবির একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু ডাকাতিতে জড়িত ছিল। প্রথমে পেশাদার ডাকাত গ্রুপের কাজ বলে মনে করা হলেও পরে তদন্তে দেখা যায়, এসব ঘটনায় জেএমবির ডাকাত গ্রুপ জড়িত। সম্প্রতি জেএমবির কয়েকজন নেতাকর্মী জামিনে রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকে জেএমবির ডাকাত গ্রুপে জড়িয়েছে।

এদিকে এবিটির তিন সদস্যের একটি অপারেশনাল ‘কোর কমিটি’ রয়েছে। তার প্রধান হিসেবে আছে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনায় চাকরিচ্যুত পলাতক মেজর জিয়া। অনেক দিন ধরেই তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ব্লগার রাজীব, অভিজিৎ, প্রকাশক দীপন, ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান, নীলাদ্রি, জবি ছাত্র নাজিমুদ্দিন, কলাবাগানে জোড়া খুন ও মিরপুরে স্কুলশিক্ষক হত্যাচেষ্টাসহ বেশ কিছু ঘটনায় জড়িত ছিল এবিটি। বিভিন্ন সময় রাজধানীর সাতারকুল, মোহাম্মদপুরসহ এবিটির বেশ কিছু আস্তানায় অভিযান চালানো হলে গ্রেফতার করা যায়নি সংগঠনটির শীর্ষ এই নেতাকে। তবে তাদের আস্তানা থেকে কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ অন্যান্য আলামত জব্দ করা হয়। এখন জিয়াকে গ্রেফতারই পুলিশ-র‌্যাবের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এদিকে পুরনো জেএমবির একটি অংশের নেতৃত্বে রয়েছে জঙ্গি সালাউদ্দিন সালেহীন ওরফে সানি। বর্তমানে ভারতে রয়েছে সে। এছাড়া কারাবন্দি মাওলানা সাইদুর রহমান জেএমবির আরেকটি অংশের নেতা। পুরনো জেএমবির বিশ্বাস, তামিম চৌধুরীর নেতৃত্বে নব্য জেএমবি যে আদর্শ নিয়ে পরিচালিত হচ্ছিল, ভুল ছিল তা। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে নব্য জেএমবির পতন হয়। বাচ্চু হত্যার ঘটনায় পুরনো জেএমবি জড়িত থাকায় এটা প্রমাণ করে- ‘অপারেশন’ করার মতো সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

সমকাল

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.