আকিজ ম্যাচের ভ্যাট ফাঁকি

রহমত রহমান: আকিজ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আকিজ ম্যাচ ফ্যাক্টরি লিমিটেডের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ রেয়াত গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর অবৈধ রেয়াত গ্রহণ ও ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিরীক্ষায় এ ফাঁকি উদ্ঘাটন ও মামলা করা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে আকিজ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ বশির উদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমি মামলার বিষয়ে অভিহিত না। আমি পুরোপুরি বলতে পারব না। তবে অতিরিক্ত রেয়াত যে কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বাভাবিক বিষয়। ভ্যাট অফিসের সঙ্গে আমাদের সবারই এ রকম একটা সমস্যা চলছে।’

মামলা পুনঃতদন্তের দাবি জানানো হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে আমরা তা করেছি।’

সূত্র জানায়, আকিজ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আকিজ ম্যাচ ফ্যাক্টরি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি এনবিআরের আওতাধীন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ) এর একটি ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান। পশ্চিম মুক্তারপুর মুন্সীগঞ্জ এলাকার আকিজ ম্যাচ ফ্যাক্টরির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ম্যাচ উৎপাদনের কাঁচামাল অবৈধভাবে অতিরিক্ত রেয়াত নেওয়া ও ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ পায়। এরই প্রেক্ষিতে একটি নিরীক্ষা দল গঠন করা হয়। ম্যাচ উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে পেপার অ্যান্ড পেপার বোর্ড, প্যারাফিন ওয়াক্স, ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইজ, কোবাল্ট, ট্যালকম পাউডার, জিংক অক্সাইড, রেড ফসফরাস, পটাশিয়াম ক্লোরেট, পলিভিনাইল, ফিল্টার এইড পাউডার।

মূল্য ঘোষণা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি ২০১১-১২ ও ২০১২-১৩ অর্থবছর এসব কাঁচামালের বিপরীতে প্রায় চার কোটি ৮৫ লাখ টাকা রেয়াত নিয়েছে। যদিও এ দুই অর্থবছর প্রতিষ্ঠানটির প্রাপ্য রেয়াত প্রায় তিন কোটি ৭৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি মাত্র দুই বছর এসব কাঁচামালের বিপরীতে অবৈধভাবে অতিরিক্ত প্রায় এক কোটি আট লাখ টাকা রেয়াত নিয়েছে। তবে অন্যান্য অর্থবছর একই কায়দায় অতিরিক্ত রেয়াত নিয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সূত্র আরও জানায়, আকিজ ম্যাচ ফ্যাক্টরি লিমিটেড বিভিন্ন কেনাকাটা ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে উৎসে ভ্যাট কর্তন করে না। অথচ এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী লিমিটেড হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির ব্যয়ের ক্ষেত্রে উৎসে ভ্যাট কর্তন করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। নিরীক্ষা মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির সিএ ফার্মের অডিট রিপোর্টে উৎসে ভ্যাট কর্তন ও জমা দেওয়া হয়নি বলে নিরীক্ষায় উঠে এসেছে।

সিএ ফার্মের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০১১ সালে রিপেয়ার ও মেইনটেন্যান্স, ফুয়েল, অয়েল ও গ্যাস, বিনোদন ও খাওয়া, স্টেশনারি, অডিট ফি, বিজ্ঞাপনসহ ১৩টি খাতে প্রায় দুই কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এসব ব্যয়ের বিপরীতে প্রযোজ্য উৎসে ভ্যাট প্রায় ২২ লাখ টাকা; যা প্রতিষ্ঠানটি পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। এ ভ্যাট পরিশোধ না করায় দুই শতাংশ হারে প্রযোজ্য ভ্যাটের ওপর সুদ প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ টাকা। সুদসহ ২০১১ সালে আকিজ ম্যাচ প্রায় ৪০ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে।

একইভাবে ২০১২ সালে ১২ খাতে প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এসব ব্যয়ের বিপরীতে প্রযোজ্য উৎসে ভ্যাট প্রায় ১৫ লাখ টাকা; যা প্রতিষ্ঠানটি পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। এ ভ্যাট পরিশোধ না করায় দুই শতাংশ হারে প্রযোজ্য ভ্যাটের ওপর সুদ প্রায় ৯ লাখ টাকা। সুদসহ ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২৪ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সূত্র জানায়, আকিজ ম্যাচ ফ্যাক্টরি লিমিটেড দুই বছর প্রায় এক কোটি আট লাখ টাকার অতিরিক্ত রেয়াত গ্রহণ ও ব্যয়ের ওপর প্রায় সাড়ে ৬০ লাখ টাকার উৎসে ভ্যাটসহ প্রায় এক কোটি ৬৯ লাখ টাকা ফাঁকি দিয়েছে। যা সুদসহ প্রায় দুই কোটি ২৪ লাখ টাকা। অবৈধ রেয়াত ও ভ্যাট পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর ভ্যাট দক্ষিণ কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান সই করা দাবিনামা সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়।

পরে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে নির্বাহী পরিচালক (করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) এমএ রাজ্জাক সই করা নোটিসের জবাব দেওয়া হয়। নোটিসের জবাব অতিরিক্ত রেয়াত গ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। বলা হয়, ভ্যাট আইনে অতিরিক্ত মূল্যের ওপর রেয়াত বিষয়টি উল্লেখ নেই। এছাড়া ব্যয়ের বিপরীতে উৎসে ভ্যাট কর্তন ও জমার বিষয়টি সঠিক যাচাই করা হয়নি বলে দাবি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অবৈধ রেয়াত গ্রহণ ও উৎসে ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি পুনঃতদন্তের আহ্বান জানানো হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে শুনানির সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়।

এ বিষয়ে ভ্যাট দক্ষিণ কমিশনারেটের একজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, আকিজ ম্যাচ ফ্যাক্টরির বিরুদ্ধে সুর্নিদিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে নিরীক্ষা করে অবৈধ রেয়াত গ্রহণ ও ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দুই অর্থবছর অবৈধ রেয়াত ও ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটনের পর অন্যান্য বছর প্রতিষ্ঠানটি একই কায়দায় ফাঁকি দিয়েছে কি নাÑতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

শেয়ার বিজ

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.