ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে ল-ভ- জাপান

রাহমান মনি: মওসুমের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় জেবি (ঔবনর, এটি কোরিয়ান একটি শব্দ, যার অর্থ গ্রাস) যা স্থানীয় ভাষায় ‘টাইফুন ২১ গো’র আঘাতে ল-ভ- হয়েছে শিল্পাঞ্চল হিসেবে খ্যাত জাপানের পশ্চিমাঞ্চল ওসাকা প্রদেশ এবং আশপাশের শহরগুলো।

কয়েক ঘণ্টা আগেও যে শহরগুলো সাজানো গোছানো ছিমছাম ছিল কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তা যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। চারদিকে কেবলই ছড়িয়ে রয়েছে ধ্বংসাবশেষ।

৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ মধ্যরাত থেকে শুরু হয় ক্যাটাগরি ৩ মাত্রার সুপার টাইফুন জেবি। ১৯৯৩ সালের পর জেবি সবচেয়ে শক্তিশালী টাইফুন ছিল এটি। সে সময় মওসুমের ৬ নাম্বার টাইফুন (ইয়ানকি) কিয়োশুর রিউকিউ দ্বীপপুঞ্জে ৬ সেপ্টেম্বর আঘাত হানলে ৪৮ জন নিহত এবং ৪৯৬ জন আহত হন (সূত্র-উইকিপিডিয়া)।
১৯৯৩ সালের পর এমন শক্তিশালী টাইফুন দেখেনি জাপানের মানুষ। ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ এই রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত টাইফুন জেবির আঘাতে এই পর্যন্ত ১১ জন নিহত এবং ৫০৭ জন আহত হবার কথা নিশ্চিত করেছে জাপান পুলিশ বিভাগ। নিহতদের মধ্যে ওসাকাতে ৮ জন এবং শিগা, মিএ এবং আইইচি প্রদেশে ১ জন করে।

জাপান পুলিশ, আবহাওয়া এবং মিডিয়া সূত্রে জানা যায়, টাইফুন ২১-এর আঘাত হানার আগেই জাপানের পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চল থেকে ১০ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে কয়েকশ বিমানের ফ্লাইট। মঙ্গলবার সকালে পশ্চিম উপকূলে আঘাত হানে টাইফুন জেবি। এ সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২১৬ কিলোমিটার।

জাপানের অন্যতম প্রধান একটি বিমানবন্দর ‘কানসাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ প্লাবিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তার সমস্ত কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৯৪ সালে বিমানবন্দরটি চালু করা হয়েছিল। কানসাই বিমানবন্দরকে ওসাকা শহরের সঙ্গে সংযোগ করা একটি সেতু প্রবল বাতাস ও জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়া জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রবল বাতাস এবং ঢেউয়ের ধাক্কায় ওসাকার উপকূলে নোঙ্গর করা জাহাজটি সংযোগ সেতুটির ওপর আছড়ে পড়ে।
বিমানবন্দরে অবস্থানরত বেশ কয়েকটি বিমানের ইঞ্জিন পানিতে ডুবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিমানবন্দরের রানওয়ে এবং টার্মিনাল ভবনের ভূগর্ভস্থ তলা প্লাবিত হয়েছে। বিমানবন্দরের একটি হোটেলের বলরুম অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে খুলে দেয়া হয়েছে। কারণ, অভ্যন্তরীণ রুটের শত শত বিমান চলাচল বাতিল করায় ৩ হাজারেরও বেশি যাত্রী বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন। বোটে করে তাদের সরানো হচ্ছে।

প্রায় ৮০০ বিমান উঠানামা স্থগিত করাসহ জাপান শিনকানসেন বা বুলেট ট্রেনের বেশকিছু লাইন বন্ধ, সাধারণ ট্রেন সাময়িক বন্ধ কিংবা ধীরগতিতে বিলম্বে চলাচল করতে হয়েছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে যাওয়ায় বেশকিছু শিল্পকারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়। বন্ধ রাখা হয় এসময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় থিম পার্ক ‘ইউনিভার্সাল স্টুডিওস জাপান’। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে। বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে যায় প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার গ্রাহকের। প্রায় ২০ লাখ লোককে সাময়িক অন্ধকারে ডুবে থাকতে হয়।

বারবার সতর্ক বার্তা জারি করায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ঘর থেকে বের না হওয়ার পরামর্শও দেয়া হয়েছে। পূর্বনির্ধারিত সফর বাতিল করেছেন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে।

টাইফুন জেবির আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওসাকা এবং কিয়োতো শহর। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাপ এখনো হিসাব সম্পন্ন না হলেও টাকার অঙ্কে যে কয়েক ট্রিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

চলতি গ্রীষ্মে ব্যাপক বৃষ্টিপাত, ভূমিধস, বন্যা ও অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়া দাবদাহে শতাধিক লোক মারা যাওয়া এবং সপ্তাহ দুয়েক পর ফের শক্তিশালী টাইফুন জেবির কবলে পড়ল জাপান।

ছবি : ইন্টারনেট থেকে

rahmanmoni@kym.biglobe.ne.jp

সাপ্তাহিক

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.