জাপানে ছাত্র ভিসা নিয়ে হা-হুতাশ বন্ধ করাটা জরুরি

রাহমান মনি: অন্তর্জালের যুগে নিজেকে জাহির করা অনেকটাই সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই কাজটি সহজ থেকে সহজতর করেছে অনলাইন পত্রিকা আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক।

অনলাইন পত্রিকায় প্রচার পেতে কিছুটা লবিংয়ের প্রয়োজন হলেও ফেসবুকের প্রচারে কোনো কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না যদি না স্বীয় বিবেক বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। তবে, সরকার নামের সর্বশক্তিমান বাহাদুর মাঝে মধ্যেই নিজেদের ক্ষমতা জাহির করেন বৈ কি! সব কিছুই ভালো একটা দিক।

তবে, সব ভালোই যে ভালো নয় তা ফেসবুকে বিভিন্ন জনের স্ট্যাটাস এবং মন্তব্য দেখলেই অনুমেয়।

ফেসবুকের যেমন হাজারটা ভালো দিক আছে তেমনি হাজারটা মন্দও। কে কিভাবে তা ব্যবহার করবে সেটা তার নিজের ওপর নির্ভর করে।

অতি সম্প্রতি অনেকেই জাপানে ছাত্র ভিসা নিয়ে আসার আগ্রহীদের বিভিন্ন সলাপরামর্শ, উৎসাহ দিয়ে কিংবা অনুৎসাহিত করে বিভিন্ন স্ট্যাটাস, মন্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। কেউবা আবার লাইভে এসে নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছেন নিজ কাঁধে।

মনের মাধুরী মিশিয়ে আংশিক সত্য বা অনুমাননির্ভর তথ্য দিয়ে যারা ফেসবুকভিত্তিক নায়ক বনে যেতে চাচ্ছেন, তারা একটিবারের মতো ভেবে দেখেছেন কি, এতে করে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ থেকে জাপানে আসতে আগ্রহীদের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

জাপান পুলিশের সম্পর্কে যাদের ন্যূনতম ধারণা আছে তারা জানেন যে জাপান পুলিশ জাপানে অবস্থানরত প্রতিটি নাগরিকের নাড়ি-নক্ষত্রের খবর তাদের নখদর্পণে রাখে।
তারা যদি ভেবে থাকেন যে লিখালিখি তো বাংলায় হচ্ছে জাপান পুলিশ তা জানবে কেমন করে? তাহলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। জাপানের মতো অর্থনৈতিক পরাক্রমশালী দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত জাপান পুলিশ বিশ্বের অন্যতম কৃতিত্ব সম্পন্ন শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী একটি বাহিনী। যারা জনগণের বন্ধু হয়ে কাজ করে জাপানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছে। ফেসবুক, টুইটারে কোন ভাষায় জাপানকে নিয়ে কি লিখছে না লিখছে তা জাপান পুলিশের নখদর্পণে।

জাপান ইমিগ্রেশন নিয়ে যে যেসব মন্তব্য করে চলেছে তা কেবলি অন্ধের হাতি ছুঁয়ে দেখার অনুভূতি প্রকাশের মতো। হাতি কারোর কাছে কুলার মতো, কারোর কাছে দেয়ালের মতো, আবার কারোর কাছে খামের মতো। অর্থাৎ হাতির যে অংশটি যে যেভাবে ছুঁয়ে অনুভব করেছেন তা, তার তার অনুভূতির মতো। অন্ধদের হাতি দেখার মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিতে বাংলাদেশিরা যে যার ইচ্ছে মতো লিখে যাচ্ছেন। আর এর সবগুলোই জাপান পুলিশের মাধ্যমে ইমিগ্রেশন ঝুলিতে জমা হচ্ছে।
আর আদম ব্যাপারিরা এই সুযোগে নিজেদের ব্যর্থতা (যা নিজেরা তৈরি করে ইমিগ্রেশনে জমা তারা দিয়েছিলেন) ঢাকার জন্য ফেসবুকের মাধ্যমে অপপ্রচার করে ভবিষ্যতে জাপানে আসতে আগ্রহীদের পথ কণ্টকময় করে তুলছেন।

এ কথা সত্যি যে, বাংলাদেশ থেকে জাপানে আসার জন্য অনেকেই আগ্রহী। এই ব্যপারে তারা লাখ লাখ টাকা খরচ করতেও দ্বিধা করবেন না। আর এই সুযোগ কাজে লাগাতে চান কিছু সংখ্যক বাংলাদেশি। তারা নামেমাত্র (আমি ঢালাও সবার কথা বলছি না) জাপানি ভাষা শিখানোর নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন। কেউ কেউ আবার তাদের প্রতিষ্ঠানে খ-কালীন বা স্থায়ীভাবে জাপানি শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে থাকেন। তারা যোগসাজশে জাপানে বিভিন্ন সেশনে একাধিক পেপারস জমা দিয়ে থাকেন।

জমা দেয়া ওইসব পেপারসের অনেকাংশজুড়ে দেয়া হয় নিজেদের তৈরি বিভিন্ন ডকুমেন্টস। এমন কি ব্যাংক স্টেটমেন্টও। বিষয়টি জাপান ইমিগ্রেশনের অজানা নয়। তাই প্রথম বাছাইয়ে বেশ কিছু পেপারস এমনিতেই বাদ হয়ে যায়। এরপর রয়েছে কোটা পদ্ধতি। যে কোটার জন্য বাংলাদেশে এত কিছু, সেই কোটার গ্যাঁড়াকলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সুযোগ এমনিতেই কম থাকে তাই বাংলাদেশি পেপারসের অনুমোদন কমই দেয়া।

সর্বশেষ শিক্ষাবর্ষে এযাবৎকালের সর্ব নিম্নসংখ্যক পেপারস অনুমোদন পায়। মাত্র শতাংশের মতো। পেপারস জমাদানকারী একজন জানালেন তিনি গত সেশনে ৮২টি পেপারস জমা দিয়েছিলেন, মাত্র ২টি অনুমোদন পেয়েছে এখান থেকে। বললেন, ভাই একেবারেই শেষ হয়ে গেছি, পথে বসার অবস্থা। জানতে চাইলাম, এতগুলা পেপারস আপনি জমা দিলেন কিভাবে? কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

আবার, এখান থেকে এলিজিবিলিটি বের হলেই যে বাংলাদেশ থেকে জাপান দূতাবাস ভিসা দিবে এমনটি নয়। তবে, সেই ক্ষেত্রে দায়টা শিক্ষার্থীর ওপর বর্তায় বেশি। কারণ, দূতাবাস যেসব জিনিস একজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে আশা করে থাকেন যেমন স্মার্টনেস, জাপানি ভাষার ওপর দক্ষতা ইত্যাদি বিষয়গুলো যদি আবেদনকারীর মধ্যে না পান তাহলে তা প্রত্যাখ্যান করবে এইটাই তো স্বাভাবিক। মনে রাখতে হবে, জাপানে আসতে চাইলে জাপানি ভাষার ওপর ন্যূনতম দক্ষতা এবং জাপানিজ সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ এবং ধারণা থাকতে হবে।

আর বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা যে দেশে জাপানি ভাষা শিখায় মনোনিবেশ করার চেয়ে জাপান আসার জন্য ব্যাকুল বেশি থাকেন একথা অপ্রিয় সত্য। কোনো রকম বা দায়সারাগোছের জাপানি শিখে দূতাবাসে ভিসার জন্য দাঁড়ান। অপরদিকে চীন, ভিয়েতনাম বা অন্যান্য দেশ থেকে যে সব শিক্ষার্থী জাপানে ভাষা শিক্ষা কোর্সে আসেন তারা প্রাথমিক শিক্ষাটা নিজ নিজ দেশ থেকে নিয়ে তবেই জাপানে আসেন। তাই তাদের ভিসা পাওয়ার শতকরা হারটাও বেশি।

তবে, ভাষা শিক্ষা কোর্সে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের শতকরা হার কম হলেও জাপানে মোনবুশো বা স্কলারশিপে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা কিন্তু সবচেয়ে বেশি। গত এক বছরে ১৫০ জন শিক্ষার্থী জাপানে স্কলারশিপ নিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছেন। বিগত কয়েক বছরে ৩ হাজার ৮০০ জন জাপানের স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। তারা সবাই নিজ যোগ্যতায় জাপানে আসার সৌভাগ্য অর্জন করেন।

জাপানে ছাত্র ভিসা নিয়ে আসতে হলে জাপানি সংস্কৃতি, জাপানি ভাষার ওপর দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি একইসঙ্গে জনসচেনতা বাড়ানোটা অতীব জরুরি। সাবধান থাকতে হবে দালালদের লোভনীয় প্রলোভন থেকে। হা-হুতাশ বন্ধ করতে হবে। হা-হুতাশ বন্ধ করে দোষারোপ না করে নিজেদের প্রস্তুত করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
জাপানে কর্মসংস্থানের জন্য যারা আগ্রহী তারা ‘সাপ্তাহিক’-এর সিনিয়র প্রতিবেদক আনিস রায়হানের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনটি পড়ে দেখতে পারেন। উপকৃত হতে পারেন।

জাপানে কর্মসংস্থান : বড় সুযোগ হারাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ? -আনিস রায়হান (http://shaptahik.com/ v2dev/details.php?id=13288)
ছবি : জুয়াব (Japanese Universities Alumni Association in Bangladesh, JUAAB) এর সৌজন্যে
rahmanmoni@kym.biglobe.ne.jp

সাপ্তাহিক

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.