শক্তিমান শিনজো আবে -রাহমান মনি

রাহমান মনি: তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন (২৪ ডিসেম্বর ২০১৪ থেকে বর্তমান) জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের জনপ্রিয়তা ক্রমাগত হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও এক মাসের ব্যবধানে উত্তর কোরিয়া কর্তৃক পরপর দুটি মিসাইল ছোড়া এবং এক মাসের মধ্যে জাপানকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়ার হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে কট্টর জাতীয়তাবাদী শিনজো আবের কঠোর অবস্থান ভোটারদের মধ্যে আবের প্রতি আস্থা তৈরি হয়েছে। ভোটাররা আবেকেই পুনরায় ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছে।

জাপানে ব্যবসা বিষয়ক প্রভাবশালী জাতীয় দৈনিক ‘নিক্কোই’-এর এক জরিপে ৪৪% ভোটার আবের পক্ষে তাদের ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত, টোকিওর প্রথম নারী গভর্নর ইউরিকো কোইকের রাজনৈতিক উত্থান এবং বিরোধী দলের বেসামাল অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই সংসদের নিম্নকক্ষ ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন শিনজো আবে।

উল্লেখ্য, দুই কক্ষবিশিষ্ট জাপানের (নিম্নকক্ষ এবং উচ্চকক্ষ) সংসদের নিম্নকক্ষের বিজয়ী দল সরকার গঠন করে এবং দেশ পরিচালনা করে।

আবের সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিল না তা নির্বাচনের ফলাফলেই বোঝা যায়। নিন্দুকের সমালোচনার জবাবও দেয়া হয় নির্বাচনের ফলাফলের মধ্য দিয়ে।

২২ অক্টোবর ’১৭ জাতীয় নির্বাচনে আবের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং জোটের শরিক কোমেইতো অর্থাৎ ক্ষমতাসীন জোট ৪৬৫টি আসনের মধ্যে ৩১৩টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের রায় পায়। এর মধ্যে এলডিপি এককভাবে ২৮৪টি আসন এবং শরিক দল কোমেইতো ২৯টি আসন পেতে সক্ষম হয়। ফলে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিশ্চিত করে। আর এই দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিশ্চিত করার ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর ১৯৪৭ সালের সংবিধান পরিবর্তন করার সুযোগ পাবেন ক্ষমতাসীন জোট।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর ১৯৪৭ সালে জাপান অধিগ্রহণকারী আমেরিকানদের হাতে দেশটির ‘শান্তিবাদী সংবিধান’ তৈরি হয়েছিল। যার ৯ নং অনুচ্ছেদে যে কোনো ধরনের যুদ্ধে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

কিন্তু উত্তর কোরিয়া কর্তৃক ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবেলায় সংবিধান পরিবর্তন করে জাপানকে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেয়ায় অন্তরায় ছিল সংবিধান।
আর এই সংবিধান সংশোধন করতে দুই-তৃতীয়াংশ আসন অর্থাৎ ৩১০টি আসনে জয়ী হওয়া আবের ক্ষমতাসীন দলের জন্য জরুরি ছিল। ৩১৩টি আসন পেয়ে ক্ষমতাসীন জোট সহজেই তা উতরাতে পেরেছে।

এই সংবিধান সংশোধন করে উত্তর কোরিয়াকে মোকাবেলা করার জন্য জাপানের সামরিক বাহিনী (সেলফ ডিফেন্স অব জাপান বা এসডিজে) শুধু আত্মরক্ষায়ই নয়, প্রয়োজনে যুদ্ধ করতে পারবে এমন সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নেন আবে তার তৃতীয় মেয়াদে।

আর সেই জন্যই নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে বিরোধীদলের দুর্বলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এবং কোইকের রাজনৈতিক উত্থানের পূর্বে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রমাণ দেন রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা আবে।

জাপানের সামুদ্রিক ঝড় সুপার ‘টাইফুন ২১’ যার নাম দেয়া হয় ল্যান। অত্যন্ত বড় মাপের এবং শক্তিশালী এই টাইফুন যার বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৫২ কিলোমিটার। প্রচণ্ড বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও ভোটাররা ভোট দিতে গিয়েছেন। অনেকেই আবার পূর্বেই যথাযথ নিয়ম মেনে তাদের ভোট খানা পাঠিয়ে দিয়েছেন। এদিন মোট ৫৩.৬৯% ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।

২২ অক্টোবর ২০১৭ রোববার সকাল ৭টা থেকে একটানা রাত ৮টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলে। ঝড়ো হাওয়া এবং মুষলধারে বৃষ্টিপাত উপেক্ষা করে ভোটাররা কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোট প্রদান করেন।

বিকেল ৪টা পর্যন্ত কেন্দ্রে ভোট প্রদানের পরিমাণ ছিল ২৬.৩%। যা ২০১৪ সালের নির্বাচনে একই সময়ে ভোট প্রদানের চেয়ে ২.৮১% কম। কিন্তু পূর্বে পাঠিয়ে দেয়া এবং বাকি ৪ ঘণ্টার ভোট গ্রহণে সর্বশেষ ৫৩.৬৯%-এ উন্নীত হয়।

এবার সর্বোচ্চসংখ্যক নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। যা মোট প্রার্থীর ১৭% ছিল এবং মোট ৪৭ জন প্রার্থী নির্বাচনে জয়লাভ করতে সক্ষম হন। অর্থাৎ নারী প্রার্থীদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি প্রার্থী জয়ী হতে সক্ষম হয়েছেন এবং এই নির্বাচিত নারীদের হার ১০.১%। গত নির্বাচনে যা ৯.৭% ছিল।

এবারের নির্বাচনের বিশেষত্ব হলো জোটবদ্ধ নির্বাচনের সংখ্যা অন্যান্য জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে বেশি। তিনটি বড় জোট নির্বাচনে অংশ নেয়।

বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব জাপান বা ডিপিজে থেকে বেরিয়ে প্রাক্তন মুখপাত্র ইউকিও এদানো কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব জাপান (সিডিপিজে) নামে নতুন জোট গঠন করে নির্বাচনে অংশ নেন এবং ৫৫টি আসনে জয়ী হয়ে সংসদের নিম্নকক্ষের বিরোধী নেতার আসনে অধিষ্ঠিত হতে সক্ষম হন। এদানো সম্মিলিত বিরোধী দলের নেতৃত্ব দেবেন।

ক্ষমতাসীন জোটের তুলনায় সম্মিলিত বিরোধী দলের আসন কম হলেও বিরোধী দলের নেতা হিসেবে এদানো জোরালো এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কারণ, তিনজন প্রধানমন্ত্রীর কেবিনেটের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এদানোর ভাণ্ডারে। এর পরেই রয়েছে টোকিও মেট্রোপলিটান গভর্নর ইউরিকো কোইকের কিবো নো তো বা পার্টি অব হোপ। জোটবদ্ধ এই দলটি পেয়েছে ৫০টি আসন। তৃতীয় শক্তি হিসেবে দলটির অবস্থান। যদিও কোইকে প্রধানমন্ত্রী আবের নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন জোটের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে ছিলেন।

২৫ সেপ্টেম্বর আবে সংসদ ভেঙে দেয়ার ইঙ্গিত দেয়ায় মাত্র কিছুক্ষণ আগে কোইকে নতুন দল প্রতিষ্ঠা করে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ৪ সপ্তাহ পূর্বে প্রতিষ্ঠা পাওয়া একটি দল কীভাবে এলডিসি’র মতো দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের একটি দলকে চ্যালেঞ্জ দিতে পারেন এটা ছিল বিলিয়ন প্রশ্ন।

অনেকে মনে করেন প্রথম নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়ে কোইকের আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়। কে জানে তার এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস না জানি তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায় বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন। বাস্তবে হয়েছেও তাই। ৪৬৫টি আসনের মধ্যে কোইকের কিবো নো তো ২৩৩টি আসনে প্রার্থী দিতে সক্ষম হন। যদিও কোইকে পূর্বেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তিনি কেবল বেশিসংখ্যক প্রার্থী দিয়েই নির্বাচন করতে ইচ্ছুক নন। কোয়ালিটিসম্পন্ন এবং বিতর্কিত নন এমন প্রার্থীদেরই কেবল তিনি মনোনয়ন দিতে আগ্রহী।

জাপান সংসদের নিম্নকক্ষ ৪৮০ আসনবিশিষ্ট হলেও বিভিন্ন কারণেই তা কমে গত ২০১৪ জাতীয় নির্বাচনে ৪৭৫টিতে দাঁড়ায়। এবারের নির্বাচনে তা ৪৬৫টিতেই সম্পন্ন করতে হয়। ২০১১ ভয়াবহ বিপর্যয়, জনসংখ্যা হ্রাস আসন কমার অন্যতম কারণ।

৪৬৫টি আসনের জন্য মোট ১১৮০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এরমধ্যে ২৮৯টিতে আইনপ্রণেতা একক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন এবং বাকি ১৭৬টিতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচিত হন। নির্বাচনে জাপানিজ কমিউনিস্ট পার্টি মাত্র ১২টি আসন পেতে সক্ষম হয়। আবের সামনে রয়েছে ইতিহাস গড়ার হাতছানি। স্বাভাবিকতা বজায় থাকলে আবে জাপানিজ প্রধানমন্ত্রীদের তালিকায় ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস গড়বেন।

আবের নেতৃত্বে এবারের নির্বাচনে অভাবনীয় সাফল্যে আগামী বছর সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য দলের কনভেনশনে তৃতীয়বারের মতো সভাপতির পদ পেতে যাচ্ছেন আবেÑ এটা প্রায় নিশ্চিত। আর এ পদ যদি তিনি পেয়ে যান তা হলে সংসদে বর্তমান মেয়াদে ৫ বছর শাসন করলে তিনি হবেন ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী। বর্তমানে আবে তৃতীয় বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

আগামী ১ নভেম্বর ’১৭ চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার আগ পর্যন্ত আবের শাসনের মেয়াদ হবে ২১৩৭ দিন। এর আগে মেইজি এবং তাইশো যুগে মোট তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তারো কাৎসুরা। তিনবারে সব মিলিয়ে ২৮৬৬ দিন দায়িত্ব পালন করে এ পর্যন্ত সর্বাধিক দীর্ঘস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। এর পরই রয়েছেন এই সাকু সাতো, তিনি এক নাগাড়ে তিনবার (৯ নভেম্বর ১৯৬৪-৭ জুলাই ১৯৭২) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোট ২৭৯৮ দিন দায়িত্ব পালন করেন। সংখ্যার দিক থেকে ইতিহাসে দ্বিতীয় স্থান হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর আধুনিক জাপান এবং বর্তমান সংবিধানে তিনিই সর্বোচ্চ স্থায়ী দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন। সেই হিসেবে আবের অবস্থান বর্তমানে তৃতীয়।

আবে যদি ৪৮তম জাতীয় সংসদের ৫ বছর মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেন তাহলে তার ঝুড়িতে ৩৫০০ দিন দায়িত্ব পালন করার রেকর্ডটি রাখবেন এবং জাপান ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্থায়ী আসন গেড়ে নেবেন।

আগামী ১ নভেম্বর থেকে আবের নতুন মন্ত্রিসভার যাত্রা শুরু হবে। মন্ত্রিসভার যাত্রার শুরুতেই পরাক্রমশালী শক্তি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাপান সফরের মুখোমুখি হতে হবে। সব কিছু ঠিক থাকলে ট্রাম্প সস্ত্রীক ৫ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর জাপান সফর করবেন।

জাপান প্রবাসীরাও আবের জয়ে উৎফুল্ল। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের জন্য আবে সরকার বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছেন যা অন্য কোনো সকারের সময় ছিল না। বড় বড় রেল স্টেশন, বিমানবন্দরে নামাজের জন্য স্থান নির্ধারণ, পশ্চিম দিক উল্লেখ করে দিকনির্দেশনা, বড় বড় ফুড স্টোরগুলোতে হালাল কর্ণার ইত্যাদির সব কিছুই আবে সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সুফল।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.