অযত্নে মুন্সীগঞ্জের পুরাকীর্তি

মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুরের ইতিহাস ঐতিহ্য বহন করে এই অঞ্চলের অসংখ্য মঠ। এসব মঠের মাধ্যমে বিক্রমপুরের ইতিহাস হয়েছে সমৃদ্ধ। তবে সংস্কারের অভাব, অব্যবস্থাপনা এবং প্রভাবশালীদের দখলে হারিয়ে যাচ্ছে এই মঠগুলো। এসব মঠ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শত শত বছর ধরে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর জেলার স্বল্প কিছু মঠ নিজেদের অধীনে নিলেও বেশির ভাগই অবহেলায় অযত্নে পড়ে আছে। ছোট বড় মিলিয়ে ২৬টি মঠ মুন্সীগঞ্জ জেলাতে রয়েছে। বেশ কয়েকটি হারিয়েও গিয়েছে। কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের কাছে এসব মঠের কোন তথ্য নেই জানিয়েছেন বিক্রমপুর গবেষকগণ। যদি দ্রুত সংস্কার করা না হয় তাহলে মঠগুলোর নাম বিক্রমপুর তথা মুন্সীগঞ্জের ইতিহাস থেকে মুছে যাবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুরের ইতিহাস ঐতিহ্য করেছে সমৃদ্ধ। অতীশ দীপঙ্কর, নাটেশ্বর, রঘুরামপুর, বজ্রযোগিনীতে সংস্কার কাজ চলছে। এসবের কারণে এই অঞ্চলটি একটি বিশাল পর্যটননগরী হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে। এগুলোর সঙ্গে সঙ্গে যেই মঠগুলো ইতিহাসে সুপরিচিতি লাভ করেছে সেগুলো সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরী। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর দ্রত এসব মঠের সংস্কার কাজ করতে পারে। এছাড়া যেসব মঠ স্থানীয়রা আধুনিকায়ন করে তার সৌন্দর্য নষ্ট করেছে, এ ব্যাপারে শীঘ্রই একটি পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে জানান তিনি।

অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের সভাপতি নূহ উল আলম লেলিন জানান, বিক্রমপুরের মঠগুলো আমাদের ঐতিহ্যের ধারক এবং বাহক হিসেবে ঐতিহ্য বহন করে আছে। বিক্রমপুরের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি। জেলাতে যে সকল মঠ আছে এগুলো সংস্কার না করলে কালের বিবর্তনে তা হারিয়ে যাবে। আমাদের সংগঠনটির আর্থিক কোন ফান্ড নেই। এছাড়া স্থানীয়রা শ্যামসিদ্ধির মঠে টাইলস লাগিয়েছে, তারা হয়ত অবগত নয় যে পুরনো ঐতিহ্য সংস্কারে কিছু নীতিমালা রয়েছে। আমরা সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরকে বিষয়টি জানিয়ে একটি ব্যবস্থা নিতে বলব বলে জানান তিনি।

সরকারী হরগঙ্গা কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ মোঃ শাহজাহান মিয়া জানান, আমাদের বিক্রমপুর ও উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় মঠ হচ্ছে শ্যামসিদ্ধির মঠ। ভারতের দিল্লীতে অবস্থিত কুতুব মিনারের উচ্চতা ২৩৬ ফুট আর শ্যামসিদ্ধির মঠটির উচ্চতা ২৪১ ফুট। এই মঠটি যদি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর পুরনো ঐতিহ্য বজায় রেখে সংস্কার করে তাহলে এর ঐতিহ্য পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসত। কিন্তু মন্দির কর্তৃপক্ষ এর পাদদেশে টাইলস স্থাপন করে এর ঐতিহ্য নষ্ট করে ফেলেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিয়ম না মেনে এটি করার ফলে আমাদের ঐতিহ্যের উপর অবহেলা করা হলো। প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদফতরের উচিত অতি দ্রুত টাইলস খুলের পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা। আউটশাহী মঠ, ফেগুনাসার মঠ, রায়েরবাগের মঠ, মাইজপাড়ার মঠ, সোনারং জোড়া মঠ- এসবের যদি অতি শীঘ্রই কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয় তাহলে বিক্রমপুরের ঐতিহ্য আর থাকবে না। এছাড়া মঠগুলো যদি প্রত্নতাত্ত্বিক নিয়ম না মেনে আশপাশের লোকজন সংস্কার কাজ করে তাহলে এটি আমাদের জন্য সুফল বয়ে নিয়ে আসবে না। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর যদি জেলার সব মঠ নিজেদের অধীনে নিয়ে কাজ শুরু করে তাহলে বিক্রমপুরবাসীর পুরনো ঐতিহ্য রক্ষা পাবে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) গাজী মোঃ ওয়ালি-উল-হক জানান, বর্তমানে অধিদফতরের আওতায় ৪৫৫টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি রয়েছে সারা বাংলাদেশে। মুন্সীগঞ্জে জেলাতে যেসব মঠ রয়েছে সেগুলো আমরা সরেজমিন পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেব। যদি এসব মঠ প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের নীতিমালায় পড়ে তাহলে এগুলো আমাদের আওতায় নিয়ে সংস্কার করব।

সোনারং জোড়া মঠ বাংলাদেশের অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রতœতত্ত্ব নিদর্শন। এটি জেলার টঙ্গীবাড়ি উপজেলার সোনারং গ্রামে অবস্থিত। কথিত ইতিহাসে জোড়া মঠ হিসেবে পরিচিত লাভ করলেও মূলত এটি জোড়া মন্দির। প্রায় ২৪১ ফুট উঁচু এই মঠ দিল্লীর কুতুব মিনারের চেয়েও পাঁচ ফুট উঁচু। তাই এটিও ভারত উপমহাদেশের সর্বোচ্চ মঠ। এছাড়া মন্দিরের সামনের অংশে বেশ বড় আকারের একটি পুকুর রয়েছে। বড় মন্দিরটি তৈরির সমসাময়িক সময়ে ওই পুকুরটি তৈরি করা হয়। মূল মন্দিরের ছাদ নিচু গোলাকার গম্বুজ আকৃতির।

এদিকে শ্রীনগর উপজেলার শ্যামসিদ্ধি গ্রামে অবস্থিত শ্যামসিদ্ধির মঠ। আনুমানিক ২৪৭ বছরের পুরনো এই মঠটি ভারত উপমহাদেশের সর্বোচ্চ মঠ এবং সর্বোচ্চ স্মৃতিস্তম্ভ বলে বিবেচিত। ভারতের দিল্লীতে অবস্থিত কুতুব মিনারের উচ্চতা ২৩৬ ফুট। আর শ্যামসিদ্ধির মঠটির উচ্চতা ২৪১ ফুট। তবে কুতুব মিনারের মতো এটি সংরক্ষিত নয়, শ্যামসিদ্ধির মঠের এখন কেবল ধ্বংসাবশেষই অবশিষ্ট রয়েছে। মঠের গায়ের মূল্যবান পাথর এবং পিতলের কলসির এখন আর অস্তিত্ব নেই, এর মূল কাঠামোয় নক্সা করা দরজা জানালা অনেক আগেই চুরি হয়ে গেছে।

মঠের ভেতরে ৩ ফুট উচ্চতার কষ্টিপাথরের একটি শিবলিঙ্গ স্থাপিত ছিল। যা ১৯৯৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে চুরি হয়ে যায়। বিক্রমপুরের ধনাঢ্য ব্যক্তি সম্ভুনাথ মজুমদার এই মঠটি নির্মাণ করেন।

টঙ্গীবাড়ি উপজেলার আউটশাহী গ্রামে আউটশাহী মঠটির অবস্থান। সিরাজদিখান উপজেলার তাজপুর গ্রামে পাশাপাশি তিনটি মঠ দাঁড়িয়ে আছে যা তাজপুর মঠ নামে পরিচিত। বাংলা ১৩০৫ সালে শ্রী রমেন্দ্র চন্দ্র সেনের স্মৃতি রক্ষার্থে মঠ তিনটি নির্মাণ করা হয়। সিরাজদিখান উপজেলার মালখানগর গ্রামে বোস জমিদারের বাড়ির পাশে এই মঠটি দেখা যায়। তবে অনুমান করা হয় বোস জমিদারের কেউ এই মঠটি নির্মাণ করেছিলেন। এর বয়স আনুমানিক ১০০-১৫০ বছর হবে।

রামপাল ইউনিয়নের কালীর আটপাড়া এলাকায় মুন্সীগঞ্জ-টঙ্গীবাড়ি রাস্তার পাশে একটি পঞ্চচূড়ার মন্দির দেখা যায় যা কালীর আটপাড়া মঠ। এর বয়স ১০০ বছর। সদর উপজেলার মহাকালির কেওয়ার এলাকায় চৌধুরী বাজার মঠ। মহাকালি ইউনিয়ন পরিষদের পূর্ব দিকে এটি অবস্থিত। সিরাজদিখান উপজেলার তালতলা খালের পূর্বদিকে ফেগুনাসার গ্রামে সুউচ্চ মঠটি অবস্থিত। রায় পরিবারের কেউ এর প্রতিষ্ঠাতা। তাই এটি রায়ের মঠ নামে পরিচিত। টঙ্গীবাড়ির আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের পূর্বদিকে আব্দুল্লাহপুর মঠ যা শতবর্ষেরও পুরনো। টঙ্গীবাড়ি বাজার থেকে দক্ষিণে কামারখাড়ার দিকে যাওয়ার সময় রাস্তার পূর্বদিকে রাউৎভোগ এলাকায় রাউৎভোগ মঠ। স্থানীয়দের কাছে বোস বাড়ির মঠ নামে পরিচিত। হিন্দু ধর্মের প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীকেও সহমরণে বাধ্য করা হতো। একে সতীদাহ প্রথা বলা হয়। বিক্রমপুরে যে সতীদাহ প্রথা চালু ছিল তার একটি নির্দশন সতী ঠাকুরণের মঠ। এলাকায় মঠটি সতী ঠাকুরণের মঠ নামে পরিচিত।

এদিকে শ্রীনগরের মাইজপাড়ার মঠটি মাইজপাড়া রায় বাড়ির মঠ নামে পরিচিত। ইংরেজী ২০১৪ সালে মঠের ওপরের অংশটি সংস্কারের অভাবে ভেঙে যায়। বর্তমানে মধ্যাংশ ভেঙে রয়েছে। কেয়টখালি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে কেয়টখালি মঠটি অবস্থিত। হাসাড়ার কুলুরটেক গ্রামে খালের উত্তর পাশে একটি মঠ দেখা যায়। এর বয়স আনুমানিকভাবে ১৫০ বছর। মঠে কোন শিলালিপি পাওয়া যায়নি। স্থানীয় প্রভাবশালী হিন্দু বোস পরিবারের মঠ নাটেশ্বর মঠ নামে পরিচিত, আনুমানিকভাবে এর বয়স ১০০ বছর।

নাটেশ্বর বৌদ্ধবিহারের পশ্চিম দিকে এর অবস্থান। সিরাজদিখান থেকে শ্রীনগর যাওয়ার পথে রাস্তার উত্তর পাশে খালের পাড়ে কোলা মঠ। স্থানীয় শ্রী ঈশ্বর চন্দ্র বসুর স্মৃতি রক্ষার্থে তার পুত্ররা এই মঠটি নির্মাণ করেন।

জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা জানান, মুন্সীগঞ্জে যেসব মঠগুলো আছে তা সংস্কার করে এর পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরকে নিদর্শনগুলোকে সংস্কার করার জন্য জানানো হবে। এছাড়া প্রশাসন থেকে এসব ঐতিহ্য রক্ষার্থে জনগণকে সবাইকে সচেতন করা হবে।

-নাসির উদ্দিন উজ্জ্বল, মুন্সীগঞ্জ থেকে
জনকন্ঠ

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.