মুন্সীগঞ্জ ১: সমর্থকরা টেনশনে কে হচ্ছেন প্রার্থী

মোজাম্মেল হোসেন সজল: শ্রীনগর ও সিরাজদিখান উপজেলা নিয়ে ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত মুন্সীগঞ্জ-১ আসন। এই আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষের দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতিতে প্রার্থীর সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। আবার বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীও কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় কর্মসূচি পালন করে দলকে সুসংগঠিত করে রেখেছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন রাজনীতিতে অনুপস্থিত। এই আসনে সাবেক প্রেসিডেন্ট বি. চৌধুরী ও তার দল বিকল্পধারা রয়েছে অস্তিত্ব সংকটে।

বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও তার ছেলে সাবেক সংসদ সদস্য মাহী বি. চৌধুরীরও এলাকায় কোনো পদচারণা নেই। বি. চৌধুরী বিএনপি ছাড়ার পর অভিভাবকহীন শ্রীনগর উপজেলা বিএনপিকে শক্তহাতে সুসংগঠিত করে রেখেছেন শ্রীনগর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আলহাজ মমিন আলী ও সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন। তবে আগামী নির্বাচনে এই আসনে কার ভাগ্যে জুটছে ধান ও নৌকার টিকিট এই নিয়ে কর্মী-সমর্থকদের উৎসাহের কমতি নেই।

নানা সময়ে নানা জরিপে ভিন্ন ভিন্ন নাম আসায় দলীয় নমিনেশন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গ্রুপে গ্রুপে বিভক্ত সমর্থকদের টেনশন আর উত্তেজনা যেন থামছেই না।

শ্রীনগর উপজেলার ১৪টি ও সিরাজদিখান উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মুন্সীগঞ্জ-১ নির্বাচনী এলাকা। ওই উপজেলাতেই রয়েছে বিএনপিতে বিরোধ।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন গ্রুপের সঙ্গে শ্রীনগর উপজেলা কমিটি গঠন নিয়ে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আলহাজ মো. মমিন আলী গ্রুপের কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়েছে। একই কারণে বিরোধ সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপিতেও।

বিএনপি থেকে প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন, সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, শ্রীনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ মমিন আলী, স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু এবং জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. আব্দুল্লাহ।

তবে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে শেষ মুহূর্তে মূল আলোচনায় রয়েছেন, আলহাজ মমিন আলী ও শেখ মো. আব্দুল্লাহ। এদের মধ্যে আলহাজ মমিন আলী এলাকায় বেশ জনপ্রিয় ও দলের বাইরেও তার বেশ ভোট ব্যাংক রয়েছে। গত উপজেলা নির্বাচনে জেলার ছয়টি উপজেলার মধ্যে একমাত্র শ্রীনগর উপজেলাতেই চেয়ারম্যান ও দুটি ভাইস চেয়ারম্যান পদে জয়লাভ করে আলহাজ মমিন আলীর নেতৃত্বের কারণে।

নির্বাচন ও প্রার্থিতা প্রসঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আমার শরীর স্বাস্থ্য ভালো নয়। এ বিষয়ে এখন কিছু বলতে পারছি না।

শ্রীনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ মমিন আলী বলেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সুখ দুঃখের সঙ্গী হয়ে দলকে সংগঠিত করে রেখেছি। বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনসহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সব কর্মসূচি পালন করে আসছি নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে। দলীয় নমিনেশন পেলে আল্লাহর হুকুম ও জনগণের দোয়া থাকলে এই আসনটি পুনরুদ্ধার করতে পারবো বলে আশাবাদী।

শেখ মো. আব্দুল্লাহ বলেন, জনগণের সেবা করার জন্য তিনি প্রার্থী হতে চাইছেন। সরকার ছাড়াও তিনি ব্যক্তিগতভাবে সিরাজদিখানে স্কুল-কলেজ, মাদরাসা ও রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক আছে। সরকারে থাকলে ভালোভাবে জনগণের সেবাটা করা যায়। আর দলীয় নমিনেশন বা সরকারে না থাকলেও এলাকার মানুষের জন্য কাজ করে যাবেন বলে তিনি জানান।

এই আসনে এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়নে চমক আসতে পারে। আগামী নির্বাচনে বর্তমান সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষ নমিনেশন পাচ্ছেন না, এমন আলোচনা এলাকার সর্বত্র। গত বছরের ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসে সুকুমার রঞ্জন ঘোষ ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা গোলাম সারোয়ার কবির গ্রুপের মধ্যে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী চলা সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শতাধিক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে। সংঘর্ষে দুই গ্রুপের অন্তত ১০ জন আহত হয়। দুই গ্রুপই পাল্টাপাল্টি মামলা করে। সংঘর্ষের দুই দিন পর উপজেলার ঝুমুর সিনেমা হলের সামনে প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য দেয়ার সময় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে এমপি সুকুমার রঞ্জন ঘোষকে দ্রুত ঢাকায় পাঠানো হয়। এরপর থেকে অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি আর এলাকায় আসেননি। দীর্ঘ ১০ মাস পর মুন্সীগঞ্জ শহরে জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সভায় যোগ দেন।

তার সমর্থকদের দাবি, সুকুমার রঞ্জন ঘোষ আওয়ামী লীগের টিকিট নিয়েই এলাকায় ফিরবেন।

এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় আলোচনায় আছেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও একই কলেজের ছাত্রসংসদের ভিপি, ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. বদিউজ্জামান ভূঁইয়া ডাবলু, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, শেখ রা?সেল ক্রীড়া চ?ক্র লি.-এর প্রেসি?ডেন্ট ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্রীড়া সংগঠক নুরুল আলম চৌধুরী, সিরাজদিখান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ, ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, ঢাকা দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক গোলাম সারোয়ার কবীর, ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক অর্থ বিষয়ক সম্পাদক, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক, মেট্রো বাংলা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান গ্যাস ফিল্ড লিমিটেডের পরিচালক মাকসুদ আলম ডাবলু এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার মালিক সমিতির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার সুব্রত সরকার।

সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষ বলেছেন, আগামী নির্বাচনে নমিনেশন প্রাপ্তিতে তিনি শতভাগ আশাবাদী। তিনি এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। জয়ের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

অধ্যাপক ডা. বদিউজ্জামান ভূঁইয়া ডাবলু ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ছিলেন। তিনি নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

অধ্যাপক ডা. বদিউজ্জামান ভূঁইয়া ডাবলু বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের ধারা অব্যাহত ও জ্ঞানের বিক্রমপুর গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন এবং শতভাগ নিশ্চিত নৌকার বিজয় এনে আসনটি শেখ হাসিনাকে উপহার দেবেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, শেখ রা?সেল ক্রীড়া চক্র লি.র প্রেসি?ডেন্ট ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্রীড়া সংগঠক নুরুল আলম চৌধুরী ১৯৯৬ সাল থেকে নৌকার টিকিট চেয়ে আসছেন। তিনি ব্যতিক্রমি নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই আসনের বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক?য়েক?টি উল্লেখ?যোগ্য উন্নয়ন প্রক?ল্পের স?চিত্র লিফ?লেট বিতরণ করে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং নৌকার জন্য ভোট ও প্রধানমন্ত্রীর জন্য দোয়া চাচ্ছেন।

নুরুল আলম চৌধুরী বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৮ সালের দুঃসময়ের এলাকার দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করেছি। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি ছিলাম, সেবামূলক সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃত্ত। সাধারণ মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে নিজেকে মানুষ হিসেবে মনে হয়। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, এটি একটি বড় সাংবিধানিক প্লাটফর্ম। এখান থেকে সাধারণ মানুষের জন্য বৃহৎ আকারে সেবামূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি গোলাম সারোয়ার কবীরও দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এই আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষকে চ্যালেঞ্জ করে শ্রীনগর ও সিরাজদিখান উপজেলা এবং কলেজ শাখার একাংশে ছাত্রলীগের কমিটি উপহার দেয়ার পর আলোচনায় আসেন। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় গণসংযোগ, সামাজিক ও জনকল্যাণমুখী কাজে সম্পৃত্ত হয়ে তরুণদের বিশাল একটি অংশ নিয়ে নির্বাচনী এলাকায় জোয়ার সৃষ্টি করেছেন। তিনি স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ দিয়ে ভোট কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠন এবং তিনি নিজেই সেসব কেন্দ্র ভিত্তিক এলাকায় গণসংযোগ করছেন। শোডাউন, গণসংযোগ এবং নৌকার পক্ষে নানামুখী কর্মকাণ্ডে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলেছেন।

গোলাম সারোয়ার কবীর বলেন, আমার এমপি হওয়ার চেয়ে দেশের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রধানমন্ত্রী হওয়া খুবই জরুরি। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, তৃণমূলে যে বেশি জনপ্রিয়, যার সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা রয়েছে এবং যিনি ত্যাগী, যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য তাকেই মনোনয়ন দেয়া হবে। সে যোগ্যতাই শ্রীনগর-সিরাজদিখানের ভোটাররা মনে করে গোলাম সারোয়ার কবীরই এক নম্বরে আছেন।

এছাড়া শেষ মুহূর্তে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় এসেছেন বাংলাদেশ কম্পিউটার মালিক সমিতির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার সুব্রত সরকার। তিনি ১৯৮০-১৯৮৪ সাল পর্যন্ত মুন্সীগঞ্জ জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে তার কাকা শম্ভুনাথ সরকার শহীদ হন। ইঞ্জিনিয়ার সুব্রত সরকার আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা লীগের বর্তমান কমিটির সহসভাপতি।

ইঞ্জিনিয়ার সুব্রত সরকার বলেন, নির্বাচনে নমিনেশনের ব্যাপারে অনেকেই শতভাগ আশাবাদী হন। আমি ৯০ শতাংশ আশাবাদী। বাকিটা নেত্রীর হাতে, তিনি কোন সময় কাকে দেবেন। নেত্রী যাকে দেবেন আমরা তার সঙ্গে কাজ করবো।

এদিকে, বিএনপির ব্যানারে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া সাবেক প্রেসিডেন্ট বর্তমান বিকল্প ধারা বাংলাদেশের একাংশের সভাপতি ডা. অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি প্রার্থী না হলে আসনটিতে তার ছেলে সাবেক সংসদ সদস্য মাহী বি. চৌধুরী নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। জাতীয় পার্টির হয়ে এই আসনে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ব্যক্তিগত আইনজীবী ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ মো. সিরাজুল ইসলাম।

মানবজমিন

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.